শনিবার, ৫ নভেম্বর, ২০২২

ঋষি অরবিন্দ, কবি অরবিন্দ, বিবেকানন্দ ও রবীন্দ্রনাথের অরবিন্দ




(উত্তর বঙ্গের দুটি জনপ্রিয় পত্রিকায় প্রকাশিত আমার  নিবন্ধ। একটি ঋষি অরবিন্দ, অন্যটি রবীন্দ্রনাথের  বর্ষার গান বিষয়ক। আমার blog য়ের পাঠকদের  উদ্দেশে অর্ঘ্য রূপে নিবেদিত হোল। লেখাগুলি বেশ  বড়,  তাই অংশ ভেঙে পাঠানো যাবে।) 


                                 এক

 ঋষি অরবিন্দ সম্পর্কে আমাদের জানা ও ধারণা  অত্যন্ত সীমিত। কি জানি আমরা ? 

অরবিন্দ ঘোষ, পিতা কৃষ্ণধন ঘোষ, মাতা স্বর্ণলতা  দেবী,  জন্ম ১৫ই আগষ্ট১৮৭২, মৃত্যু ৫ই ডিসেম্বর১৯৫০।   আবাল্য তিনি ইংল্যান্ডে, পড়াশোনা সেন্ট পলস্ স্কুল,  কিংস্ কলেজ, কেমব্রিজ। অনন‌্যসাধারণ মেধা।  ইংরেজি ( যা তাঁর মাতৃভাষাই) ছাড়াও তিনি  অনেকগুলি ধ্রুপদী ভাষায় সুপণ্ডিত, যেমন গ্রীক, হিব্রু,  ল্যাটিন, ফ্রেঞ্চ, ইতালিয়, জার্মানি সংস্কৃত এবং  পরবর্তীতে বাঙলা। 

তিনি দেশে ফিরে আসেন তখন তার বয়স একুশ। তিনি  ১৯০৬সাল থেকে ১৯১০সাল জাতীয় মুক্তি আন্দোলনে  যোগ দিয়েছিলেন। স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্নিযুগের  তিনি  বিপ্লবী। রাজরোষে কারাবরণ করেন, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের অসামান্য আইন-যুদ্ধে মুক্তি লাভ  করেন এবং রাজনৈতিক কর্মজীবন পরিত্যাগ করে  পণ্ডীচেরী চলে যান এবং আধ্যত্মিক 'যোগ' সাধনায়  নিমগ্ন হন।

এবার বিশ্বসাহিত্যের মহাপণ্ডিত, লেখক, কবি, দার্শনিক,  কে বি সেঠনা (অমল কিরণ)--র লেখা থেকে, ----- "Sri Aurobindo's spiritual and philosophical height is  now universally acknowledged. His stature as  either poet or literary critic is still insufficiently  seen. But the few, who have plunged sensitively  into his prolific poetry with a mind trained on all  the elevations of English verse, have been  moved to speak of his more than 50,000 lines  of  lyrics, narrative, drama and epic in the same  breath with the works of the greatest." 


তাঁর গ্রন্থগুলি হোল, 
Prose works:
The Life Divine, The Synthesis of Yoga, The  Foundation of Indian Culture, The Human  Cycle, The Ideal of Human Unity, The Future  Poetry. Essays on The Geeta, The secret of  The  Veda, The Upanishads, The Renaissance  in India, War and self determination etc. 


Poetic Works: 
'Ilion' and 'Savitri' , the epics. 


'Savitri' is the longest blank verse epic in  English, running to nearly 24000 lines, 
And Poems, (sonnet in Shakespearean style). 


এই মহাকবি, দার্শনিক ও সাহিত্যিক-কে আমরা কতটুকু  জানি, কতটুকু চিনি, কতখানি পেয়েছি ? এই প্রশ্ন কি  আজ সমীচীন নয় ? বিচার্য নয় ? রবীন্দ্রনাথকে যতটুকু  কাছের মানুষ করে নিতে পেরেছি, অরবিন্দকে কেন  জীবনাচরণে, জীবনছন্দে ততটুকু তো দূরের কথা,  সামান্য হলেও নিতে পারিনি ? কেন ? 


অনেক কারণেই তা হয়েছে। তাদের মধ্যে মূল যে দুটি কারণ তা হোল রচনাগুলি ইংরেজিতে লেখা এবং ভাব  ও ভাবনা সুগভীর, দুরূহ, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দুরধিগম্য।  The Life Divine (দিব্য জীবন) বা অমর্ত্য জীবনে তিনি যে  অতিন্দ্রিয় জগতের কথা বলেছেন তার উপলব্ধি সহজ  লভ্য নয়। বহির্জগতে যেমন Nature ( অরবিন্দ যাকে  Matter বলেছেন) নিত্য বিবর্তিত হয়ে চলেছে, মানুষের  চেতনার জগতও তেমনিই বিবর্তনশীল। 

("কাল ছিল ডাল খালি 

আজ ফুলে যায় ভরে, 

বল দেখি তুই  মালি 

হয় সে কেমন করে।" 

শিশুপাঠ্য 'সহজ পাঠে' নিগূঢ় রবীন্দ্র দর্শন)


The Life Divine---দিব্য জীবন বা 'অমর্ত্য জীবন'-য়ে  তিনি যে অতিমানস চেতনার কথা বলেছেন তার যোগ  সাধনার শেষ স্তর। এখানে অরবিন্দ বেদ, উপনিষদ,  শ্রীমদ্ভাগবত অবতার এবং প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য দর্শনের  বাণী উদ্ধার করে' তাঁর নিজস্ব  ব্যাখ্যা দিয়েছেন। 
এই গদ্য আঙ্গিকে লেখা ( Prose compositions,  except The Future Poetry) গ্রন্থগুলি, সাহিত্য -রস- পিপাসুদের কাছে ততখানি আকর্ষণীয় নয় যতখানি  অধ্যাত্মবাদী, পরমার্থ সন্ধানী সাধক ও গবেষকদের  কাছে আদরণীয়। গ্রন্থগুলি যে শাশ্বত সত্যের বাণীরূপ  যা মানুষের চেতনার জগতটিকে অতিলৌকিক  মহাজগতের সীমান্ত পারে নিয়ে যায় যেখানে  বিশ্বৈকানুভূতির আলোকস্পর্শ, ইশোপনিষদের মন্ত্র মূর্ত  হয়ে ওঠে। 


"যস্তু সর্বাণি ভূতানি আত্মমন্যেব অনুপশ্যতি। 

সর্বভূতেষু চাত্মানং ততো ন বিজুগুপ্সতে।।" 


নিজের মধ্যে অনন্তের যে মহাশক্তি আছে তার সন্ধান  যদি মানুষ পায়, তবে সে এই বিশ্বকেই পাবে আপন  অন্তরে। সেই বোধ জাগ্রত হলেই দূর হয়ে যাবে ঘৃণা,  হিংসা, অসূয়া। বিচ্ছিন্নতা থেকে মুক্তি ঘটবে মানুষের। 

এতক্ষণ ঋষি অরবিন্দের নববেদান্ত সৃজনের আভাস  দেওয়ার চেষ্টা ছিল, যা আমার মতো বামনের চাঁদ 🌙  ছোঁয়ার ধৃষ্ট প্রয়াস। 
এখান থেকে আমরা যাই কবি অরবিন্দের সাহিত্য সৃষ্টির  নন্দন কাননের প্রবেশ দ্বারে। উঁকি দিয়েই ফিরে  আসতে হবে, হবেই। কেননা The Ilion এবং Savitri  যাঁর রচনা তিনি ইংল্যান্ডেই শিক্ষা লাভ করেছেন প্রায়  শৈশব থেকে, যিনি কেমব্রিজের স্ট্রাইপস্, যিনি বিশ্বের  সাতটি ধ্রুপদী ভাষায় সুপণ্ডিত (সঙ্গে সংস্কৃত ও পরবর্তী  সময়ে বাঙলা), যিনি 'হোমার' পড়েছিলেন গ্রীক ভাষায়,  'ভার্জিল' ল্যাটিন ভাষায়, 'গোথে' জার্মান ভাষায়,  'রেসিন'  ফরাসীতে, 'বাল্মীকি, ব্যাস, বেদ-উপনিষদ'  সংস্কৃত ভাষায় এবং যিনি যোগ সাধনায় কলির  বশিষ্ঠদেব --- তাঁর সৃষ্টি এই দুটি মহাকাব্য। 

"Heaven in it's rapture dreams of perfect earth.

Earth in it's sorrow dreams of perfect heaven." 

                                               ('Savitri' --Arobindo) 

এই স্বর্গ-মর্ত্য-বিস্তারী, জগৎ ও জীবন-জয়ী মহাবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে অজ্ঞাতপূর্ব, অনাস্বাদিতপূর্ব সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন অরবিন্দ। 

The Ilion - য়ের বিষয় বস্তুও গ্রীক মহাকাব্য থেকেই  নেওয়া। বইটির অষ্টম খন্ড পর্যন্ত সম্পূর্ণ, নবম খণ্ড  অসম্পূর্ণ। মহাকবি হোমারের Iliad আর অরবিন্দের  The Ilion একই সঙ্গে উচ্চারণ করা যায় যদিও -- 

"Iliad spread over eight days. Ends with the  death of Hector at the hands of Achilles while  The Ilion covers the events of The Single Day  of the doomed city of Troy." 


মহাকাব্যিক ঘনঘটার উপরে সুমহান দার্শনিক জিজ্ঞাসা,  কবিত্ব প্রতিভা, মননশীলতা, ব্রহ্মাস্ত্রের মত অমোঘ শব্দপ্রয়োগ কোন্ উচ্চতায় উন্নিত হলে এমন সৃষ্টি সম্ভব, তা একমাত্র ধ্যানমগ্ন সাহিত্যসাধকই অনুভব করেন।
পরিব‌্যপ্ত পরিসরে এই মহাকাব্যটির আলোচনা করার  অবকাশ এখানে অত্যন্ত সীমিত ; তাই দ্বিতীয় মহাকাব্য   (Savitri) সাবিত্রীর দিকে দৃষ্টি ফিরাই। 

মদ্র দেশের রাজা আশ্বপতি। রাণী মালবী। তাঁদের  অপূর্ব রূপবতী, গুণময়ী কন্যা সাবিত্রী। সূর্যের  অধিষ্ঠাত্রী, মতান্তরে সবিতা-কণ্যা সাবিত্রীর আশীর্বাদে  এই কন্যা রত্নটির জন্ম তাই তাঁরও নাম রাখা হয়েছে  সাবিত্রী।

''ক্রমে বিবাহের কাল হয় উপস্থিত। 
সুপাত্রেতে কন্যাদান পিতার বিহিত।।'' 

                                      (পাঁচালীকার রামভদ্র) 

 কিন্তু সম্মন্ধ মনঃপূত না। তখন অশ্বপতি কন্যাকে স্বয়ম্বরা  হওয়ার অনুমতি প্রদান করেন। দেশ দেশ, দেশান্তরের  কত যে সম্মন্ধ আসে, কোথাও সাবিত্রীর মনের মানুষ পছন্দ হয় না। অবশেষে, শাল্বদেশের রাজা দ্যুমৎ সেনের পুত্র সত্যবান তার হৃদয় জয় করে। কিন্তু রাজা দ্যূমৎসেন তখন রাজ্য হারিয়ে সপরিবারে বনবাসী। আবার দেবর্ষি নারদ অশ্বপতিকে এসে জানালেন সত্যবানের মৃত্যুযোগ আসন্ন, বৎসরান্তে  মৃত্যু তার অবশ্যম্ভাবী। এসব জেনেও, পিতার বাধা সত্ত্বেও সাবিত্রী সত্যবানকেই বরণ  করলো। 

ভবিতব্য যা ছিল, হোল তাই। সময় ঘনিয়ে এলো।  একদিন কাষ্ঠাহরণে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে সত্যবান।  সব কাজের সঙ্গিনী, জীবন সঙ্গিনী সাবিত্রীর কোলে  মাথা রাখে সত্যবান এবং নারদ ঋষির গণনা অনুযায়ী  মৃত্যু ঘটলো তার অকালে। 
নিথর স্বামীর মাথা কোলে নিয়ে বসে আছে সাবিত্রী। শোকের পাষাণপ্রতিমা। পলে পলে, দন্ডে দন্ডে কাল অতিবাহিত হয়ে। সত্যবানের 'প্রাণ' এখনো সাবিত্রীর আয়ত্বাধীন। 

এখানে সাবিত্রী পূর্ণ নারীত্বের প্রতীক। 

মনে পড়বে জার্মান মহাকবি গোথের (Goethe)বাণী , 

"Eternal famine holds us above."

 যমদূত নিতে পারবেন না। অবশেষে সূর্যসম ভাস্বর এক পুরুষ এসে  দাঁড়ালেন, হাতে তাঁর 'পাশ'। তিনি সত্যবানের দেহ হতে  জ্যোতির্ময় প্রাণ নিয়ে অগ্রসর হতেই সাবিত্রীও তাঁকে  অনুসরণ করলো। সে পুরুষ,  মৃত্যুর দেবতা যম। যম  যতোবার বলেন," তুমি ফিরে যাও", ততবারই সাবিত্রী  উত্তর দেয়, "আমি স্বামীর সঙ্গেই আছি।" যমরাজ  সাবিত্রীকে নিরস্ত করবার বহু চেষ্টা করে গেলেন--- 

কত বর দান করলেন। সাবিত্রীর শ্বশুরকুল, পিতৃকুল  ধনে, জনে, সম্পদে পূর্ণ হয়ে উঠল। তবুও সাবিত্রী  অগ্রসর হতেই থাকল। যমরাজ তার বাকস্নিগ্ধতায় এবং  ধর্মালোচনায় মুগ্ধ। "সত্যবানের ঔরসে আমি শত  পুত্রের  জননী হতে চাই "---- মুগ্ধতার আবেশে,  অসতর্কতায় মৃত্যুর দেবতা এমন বরও যখন সাবিত্রীকে  দান করে দিলেন, তখন, সেই "অমর্ত্যলোকপারের,   মৃত্যুলোক থেকে সত্যবানের প্রাণ আবার মর্ত্যলোকে   ফিরিয়ে নিয়ে এলো সাবিত্রী।। 

এই শেষ থেকে শুরু হয়েছে কবি অরবিন্দের "সাবিত্রী"- -  Savitri মহাকাব্য। তার পংক্তি সংখ্যা, আগেই বলেছি,   চব্বিশ  হাজারেরও(২৪০০০) বেশি। ইংরেজি সাহিত্যে  ভাণ্ডারেও এত বৃহদাকার মহাকাব্য দ্বিতীয়টি নেই। শুধু  আকারে বিপুল এমন নয়, ভাব-ঐশ্বর্যেও অতলস্পর্শ,‌  সমুদ্র সমতুল।
এবার পুনর্জন্মপ্রাপ্ত সত্যবানকে নিয়ে 'যখন এবং  যেখানে'  ফিরে এলো, তা কি সেই সময়, সেই পৃথিবী ---  যে 'স্থান ও কাল'-কে ছেড়ে গিয়েছিল সাবিত্রী চিরপরিচিত জগৎ সংসার থেকে অজ্ঞাত মহাজগতে ? 
উত্তর ---"না।" 

এই "না"-য়ের উপর দাঁড়িয়ে আছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম  মহাকাব্যগুলির অন্যতম একটি Savitri , কেননা সে  আমাদের কল্পনার স্বর্গ-মর্ত-পাতালকে ধরেছে আকাশ-  সন্নিভ এক মানস দর্পণে। দৈব সান্নিধ্যে, দৈব করুণায়  প্রাপ্ত জীবনের মহিমা ও ঈশ্বর্য -- তার অনুভূতি তো  অপার, চরাচর পরিব্যপ্ত। সফলকাম, প্রত্যাবর্তনের পর  সাবিত্রীর উক্তি, 

"All is now changed, yet all is still the same
Lo, we have looked upon the face of God,
Our life has opened with divinity."

একই তো রয়েছে যা ছিল যাবার বেলায় 
তবু দেখি সবই নূতনের রঙে রাঙা ! 
সকলি যেন পূর্ণ দ্যুলোক প্রভায় -- 
দৃষ্টিতে যা মনে হোত ভাঙা ভাঙা। 
                         (অনুবাদ -- দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়) 

  

 সাবিত্রীর যাওয়া কি সাধারণ গমন ? না !  'মৃত্যু দূত'  নয় (কেননা সাবিত্রী যখন, যমকে প্রশ্ন করেছিল, দূত না পাঠিয়ে তিনি নিজেই এসেছেন কেন ; উত্তরে যমরাজ জানিয়েছিলেন, সত্যবানের জীবনের সুকৃতির পুরস্কার দেওয়ার জন্যই তাঁর স্বয়ং আগমন)---  মৃত্যুর দেবতা যমরাজের সঙ্গে  সেই অন্ধকার প্রেত পুরীর সম্মুখে এসে দাঁড়ানো ! তারপর সত্যবানের 'আত্মা'-কে যমের আয়ত্ব থেকে পুনরুদ্ধার করবার পর পুনর্বার মর্তলোকে প্রত্যাবর্তন। গমন-অনুগমন-পুনরাগমন --  এই অভিযাত্রার মধ্য দিয়ে এলো সাবিত্রীর জীবনে যে  আত্মিক মহাবিবর্তন সেটিই 'সাবিত্রী' মহাকাব্যের  সপ্তসুরের একটি সুর। 


"A divine force shall flow through tissue and cell 
And take the charge of breath and speech and  act, 
And all the thoughts shall be a glow of suns 
And every feeling a celestial thrill." 


অমর প্রাণের দুর্বার বেগ অঙ্গে অঙ্গে ছুটে, 
হৃদস্পন্দনে, বচনে, মননে বন্ধন হলো হারা। 
ধ্যান-চিন্তন আলোক সাগরে লুটে', 
আবেগে আমার মন্দাকিনীর ধারা। 

                           (অনুবাদ -- দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়)

উদ্ধৃতি দেওয়ার আগে সাবিত্রীর জীবনের এরূপ  আত্মিক বিবর্তনটিকে সপ্তসুরের একটি সুর বলেছি।  বলেছি সজ্ঞানে, এবং এজন্যই যে, 'সাবিত্রী'  মহাকাব্যটির ভাববৈভব তো অতলান্ত, বিষয় বৈচিত্র্য  বিস্ময়কর, কাব্যকলার প্রয়োগ  ব্যাস-বাল্মীকি সমতুল। 

পুরানো দিনের একটি গল্প ঃঃ

 
বাবা নাবিক। বহুদিন পর ঘরে ফিরেছেন। কিশোর  সন্তান সকল সময় বাবার সঙ্গে সঙ্গে ঘোরে আর প্রশ্ন  করেই চলে, 
--- বাবা, সমুদ্র দেখতে কেমন ? কত বড় ? ঢেউ কি, এই  রকম--ছোট ছোট হাত উঁচু করে দেখায়।  বাবা, বল না  বাবা, বল বল। 
বাবা একদিন বললেন, 
----- চল, তোমাকে সমুদ্র দেখিয়েই আনি। 


ছেলে বাবার সাথে সমুদ্র দেখতে গেল। ফিরেও এলো।  এবার মা ছেলেকে জিজ্ঞাসা করল ---- দেখে এলি ?  কেমন রে দেখতে ? কতো বড় ? আমাদের রায় দিঘীর  মতো ? 
ছেলে তার বিস্ময়ের  ঘোর-লাগা বড় বড় চোখ মেলে  মায়ের মুখের দিকে চেয়েই আছে। কি যেন বলতে  চাইছে। লালামাখা লাল ঠোঁট কেঁপে কেঁপে উঠছে। তাই   দেখে মা তাকে বুকে জড়িয়ে বলল, 
--- থাক্, তোকে আর বলতে হবে না। আমি নিজে গিয়ে  দেখে আসবো। 

সুধী পাঠক, আমার 'সাবিত্রী দর্শন' ওই বিস্ময়-বিমূঢ় কিশোরটির সমুদ্র দর্শনের সমান। সাবিত্রী মহাকাব্যটির  শব্দধ্বনি, মুক্ত ছন্দের তরঙ্গলহরী, অলঙ্কারের চলোর্মী- চঞ্চলতা,' একই সাথে সুগভীর ভাব ও শান্ত রসের  ব্যঞ্জনা এমনই যে, দ্বাদশ খণ্ডের এই মহাগ্রন্থ দ্বাদশ  বৎসর কাল 'দর্শন ও স্পর্শ' করবার পরও মুগ্ধতার  আবেশে আবিষ্ট হয়ে রয়েছি ওই বাক্যহারা বালকটির  মতোই। ভাষাকে, বাণীকে উচ্চতার কোন শিখরে পৌঁছে  দেওয়া যায়, কতখানি ঐশ্বর্যমণ্ডিত করা যায়, ভাবের  বাহন রূপে কী অকল্পনীয় কবিত্ব দক্ষতায় শব্দ ব্যবহার করা যায় তার একটি উদাহরণ দিয়ে আমরা একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে, (রবীন্দ্রের অরবিন্দ) আলোচনার চেষ্টা করব। 

                                ক্রমশঃ


                        (এরপর অরবিন্দ দুই)

৩টি মন্তব্য:

  1. BBC আপনার . মুশকিল আসল কবিতা টি আমার খুব ভাল লেগেছে

    উত্তরমুছুন
  2. অত্যন্ত কঠিন লেখাকে সাধারণ করে পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার অপূর্ব ক্ষমতার অধিকারী লেখক ।
    সাবিত্রী বা শ্রী অরবিন্দের লেখা হৃদয়ঙ্গম করতে না পারার কারণগুলোর খুব সুন্দর ব্যাখ্যা করেছেন ।
    নিজের মনের ভাবনাকে লেখনীতে পেয়ে আপ্লুত।

    উত্তরমুছুন
  3. 'অরবিন্দ দুই 'পড়া থেকে বঞ্চিত থাকায় দুঃখিত।

    উত্তরমুছুন

Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...