বই
দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়
বই,পুস্তক, গ্রন্থ – নাম শুনলেই শিক্ষিত অশিক্ষিত নির্বিশেষে সকলের মনে গভীর এক শ্রদ্ধা ও ঔৎসুক্য জেগে ওঠে । পুঁথি বলতেই সোঁদা-গন্ধ-মাখা , পূরাতন বই , কাগজে, তালপাতায় লেখা পাণ্ডুলিপির কল্পচিত্র চোখের উপর ভাসে । মুদ্রণযন্ত্র আবিস্কারের আগে হস্তলিখিত পুঁথিসাহিত্যই ছিল বিশ্বের সমস্ত দেশের জ্ঞানভান্ডার , সাহিত্যিক ও সাহিত্য পিপাসুদের অবলম্বন । সেই সকল গ্রন্থের রক্ষণাবেক্ষণ হতো নানাবিধ উপায়ে ।
কিন্তু মুদ্রিত গ্রন্থের আগমনে গ্রন্থাগার, গ্রন্থ সংরক্ষণ, গ্রন্থ- সজ্জার রীতি শিল্পের পর্যায়ে উন্নিত হোলো । গ্রন্থপ্রেম একটি আভিজাত্যপূর্ণ আবেগে পরিণত
হয়েছিল । ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারগুলি, বিশেষ ভাবে বিদেশে , ফ্রান্স-ইংল্যান্ড-ইটালি প্রভৃতি দেশে হয়ে উঠেছিল দর্শনীয় , লোভনীয় এবং আকর্ষণীয়, যা গৃহ-শোভাবর্ধক এবং রুচিশীলতার পরিচায়ক ছিল ।
এইখানেও রবীন্দ্রনাথের শ্রী ও সৌন্দর্য চেতনার কাব্যময় প্রকাশ,
'মেঘ ও রৌদ্র' , অবিস্মরণীয় ছোট গল্পটিকে স্মরণ করুন –
" তিনি (শশিভূষণ) যে ঘরে আসিয়া বসিলেন, সে ঘরের চারি দিকেই বড়ো বড়ো কাচের আলমারিতে বিচিত্র বর্ণের মলাটের সারি সারি বই সাজানো।সেই দৃশ্য দেখিবামাত্র তাঁহার পুরাতন জীবন দ্বিতীয় বার কারামুক্ত হইয়া বাহির হইল । এই সোনার জলে অঙ্কিত, নানা বর্ণে রঞ্জিত বইগুলি, আনন্দলোকের মধ্যে প্রবেশ করিবার সুপরিচিত রত্নখচিত সিংহদ্বারের মতো তাঁহার নিকটে প্রতিভাত হইল ।
টেবিলের উপরেও কী কতকগুলি ছিল ।শশিভূষণ তাঁহার ক্ষীণদৃষ্টি লইয়া ঝুঁকিয়া পড়িয়া দেখিলেন,একখানি বিদীর্ণ স্লেট তাহার উপরে গুটিকয়েক পুরাতন খাতা,একখানি ছিন্ন- প্রায় ধারাপাত,কথামালা এবং কাশিরামদাশের মহাভারত ।
স্লেটের কাঠের ফ্রেমের উপর শশিভূষণের হস্তাক্ষরে কালি দিয়া খুব মোটা করিয়া লেখা –গিরিবালা দেবী ।
খাতা ও বইগুলির উপরেও ঐএক হস্তাক্ষরে এক নাম লিখিত । "
এই ছোট গল্পটির আবেদন যেমন অবর্ণনীয় , তেমনই রবীন্দ্রমননে রুচিশীলতার শিল্পীত বিন্যাসটি অননুকরণীয়।
দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়
২/৯/'২ ১
কলকাতা ।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন