(কবিগুরুর মহাপ্রয়াণ দিবস সমাসন্ন। শ্রাবণ মাস, বর্ষা, নদী, বাঙলা দেশ ও রবীন্দ্রনাথ।)
-'সোনার তরী' কবিতাটি নিয়ে দুটো কথা।
দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়
বাঙলা ভাগ হয়েছে কিন্তু বাঙলার মাটি, বাঙলার জল, বাঙলার আকাশ, বাঙলার আবেগ আর বাঙলার রবীন্দ্রনাথ বাঙালীর 'এজমালি সম্পত্তি' ; ভাগ হয়নি, ভাগ হবেও না কোনকালে। 'সোনার তরী, মানসী' পর্বের অধিকাংশ কবিতার রচনার কাল ঊনবিংশ শতকের নয়ের দশক এবং স্থান বাঙলা দেশ -- দেশবিভাগপূর্ব মাটি ও সময়কাল।
'সোনার তরী ও মানসীর' কয়েকটি কবিতা নিয়ে আলোচনা করবার ইচ্ছা আছে। আজ সোনার তরীর প্রথম কবিতা 'সোনার তরী'।
সোনার তরী' কবিতাটি- তে অনেক রবীন্দ্র গবেষক দার্শনিকতা খুঁজে পেয়েছেন। সমকালের পণ্ডিতগণ প্রশংসা করেছেন, আবার বিরুদ্ধ সমালোচনাও করেছেন ।
বিরুদ্ধবাদীদের মধ্যে দ্বিজেন্দ্রলাল রায় ছিলেন কঠোরতম। তিনি লিখলেন,
"......এই কবিতাটি দুর্বোধ্য নয়, অবোধ্য -ও নহে– একেবারে অর্থশূণ্য ।"
সেই শুরু, তারপর থেকে আজোও এই কবিতাটি নিয়ে আলোচনা চলছেই।
'সোনার তরী' যখন লেখা হয় তখন কবির বয়েস একত্রিশ , ১২৯৮ সাল । 'সোনার তরীর' অব্যবহিত পূর্বেকার কাব্যগ্রন্থ 'মানসী'।
এই 'মানসীর' কথা বলতে গিয়ে কবি নিজে বলছেন , এবার 'কবির সঙ্গে যেন এক শিল্পী যোগ দিল ।'
তাই 'মানসী , সোনার তরী'র সময় কাল থেকেই সেই অদৃশ্য কবিসত্ত্বার অমর্ত্য সঙ্গ, সঙ্গীত, সুর ও বাণী, একটি মাত্র বিমূর্ত , দৈবী প্রেরণারূপে কবির সমস্ত সৃষ্টি কর্মের সঙ্গে একাত্ম ।
তারপর সারা জীবন ধরে এই মানস-সঙ্গিনীর সঙ্গে নিরুদ্দেশ যাত্রায় চলেছেন কবিকুলগুরু রবীন্দ্রনাথ ।
শেষে বলবেন –
"আধাঁর রজনী আসিবে এখনি
মেলিয়া পাখা,
সন্ধ্যা-আকাশে স্বর্ণ -আলোক
পড়িবে ঢাকা ।
শুধু ভাসে তব দেহসৌরভ,
শুধু কানে আসে জল-কলরব,
গায়ে উড়ে পড়ে বায়ুভরে, তব
কেশের রাশি ।
বিকল হৃদয় বিবশ শরীর
ডাকিয়া তোমারে করিব অধীর,
'কোথা আছ ওগো, করহ পরশ
নিকটে আসি ।'
কহিবে না কথা, দেখিতে পাবনা
নীরব হাসি ।"
এই যে কবির মানস-সঙ্গিনী, ছায়া-সঙ্গিনী, মায়া-সঙ্গিনী, জীবন কালের যাত্রা-সঙ্গিনী তারই সঙ্গে গূঢ় পরিচয়ের প্রথম আলাপকালের হৃদয় আলোয় দেখা, লেখা এই 'সোনার তরী'।
এই কবিতাটির 'ভাবে' যে দার্শনিক মনন খুঁজে নেওয়ার প্রবনতা দেখা যায় তা কবি স্বয়ং ইঙ্গিত দিয়ে গিয়েছেন। 'শান্তিনিকেতন' গ্রন্থে 'তরী বোঝাই' প্রবন্ধে কবি বলছেন
– 'মানুষ সমস্ত জীবন ধরে ফসল চাষ করছে। তার জীবনের ক্ষেতটুকু দ্বীপের মতো , চারিদিকেই
অব্যক্তের দ্বারা বেষ্টিত, ওই একটুখানি তার কাছে ব্যক্ত হয়ে আছে। সেইজন্য গীতা বলছেন –
"অব্যক্তাদীনি ভূতানি ব্যক্তমধ্যানি ভারত ।
অব্যক্তনিধনান্যেব তত্র কা পরিদেবনা ।।"
যখন কাল ঘনিয়ে আসছে, যখন চারিদিকে জল বেড়ে উঠছে, যখন আবার অব্যক্তের মধ্যে তার ওই চরটুকু তলিয়ে যাবার সময় হোল –তখন তার সমস্ত জীবনের কর্মের যা কিছু নিত্যফল তা সে ওই সংসারের তরণীতে বোঝাই করে দিতে পারে। সংসার সমস্তই নেবে, একটি কণাও ফেলে দেবে না । কিন্তু যখন মানুষ বলে ওই সঙ্গে আমাকেও নাও, আমাকেও রাখ, তখন সংসার বলে, "তোমার জন্য জায়গা কোথায় ?"
এই তত্বগত আলোচনার সূত্রধর কবি নিজেই, তবু মনে রাখতে হবে , পাঠকের চাহিদা হলো রস। কাব্য সাহিত্য পাঠের মূল উদ্দেশ্য রসাস্বাদন ।
ক্ষেত, চাষ ,চাষী –এসকল রূপকল্প বাঙলার মাটিতে,
সমাজ-ভূমিতে, সর্বোপরি বাঙলা সাহিত্য -সংস্কৃতিতে অনাদিকালের প্রবনতা – চর্যাগীতি থেকে মঙ্গল- কাব্য, বৈষ্ণব সাহিত্য থেকে শাক্ত- সাহিত্য । আধুনিক বাঙলা সাহিত্যেও বর্ষা, মাঠ ,ধান, লাঙ্গল-কাস্তের অনুসঙ্গ অপ্রতুল নয় ।
রামপ্রসাদের বিখ্যাত সেই গান –
"মন তুমি কৃষি-কাজ জান না
এমন মানব -জমিন রইল পতিত
আবাদ করলে ফলতো সোনা ।"
এগানের শেষ অন্তরা ,
"অদ্য অব্দশতান্তে বা,
বাজাপ্ত হবে জান না ।
এখন আপন ভেবে যতন করে
চুটিয়ে ফসল কেটে নে না ।"
চাষ হবে, ফসল কাটাও হবে, জীবন-তরীতে সঞ্চয় হবে কিন্তু তার পরে?
কাল-রূপা, কাল-রূপিনী পাটনী
বা কর্ণধারের কাছে তা গচ্ছিত রেখে ,
"শূন্য নদীর তীরে রহিনু পড়ি
যাহা ছিল নিয়ে গেল সোনার তরী।"
এই 'শূণ্য' শব্দটির ব্যঞ্জনার মধ্যে অভিব্যক্ত হয়েছে যে বিষাদ-করুণ সুর সেই মর্মচ্ছেদী বেদনার অনুভূতিটুকুই পাঠকের সারা জীবনের সম্বল ।
দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়
৩০/৮/২০২১
কলকাতা ।
শেষ পর্যন্ত তাই তো হয়। " শূন্য নদীর তীরে রহিনু পড়ি" খুব ভালো লাগলো।
উত্তরমুছুনKhub sundor...eto kothin bhab bujhte samay lage
উত্তরমুছুনঅসাধারণ ,সাবাস
উত্তরমুছুন