"তুই ফেলে এসেছিস কারে"
(জীবনের ঊষা লগ্নে বাগ্দেবীরূপে যাঁর আশীর্বাদ আমরা লাভ করি তিনি জন্মদাত্রী। তারপর শিক্ষকরূপে জন্মদাতা, প্রথম শিক্ষাগুরু। জগৎ সংসারের সকল জনক জননীর প্রতি আমার অবনত চিত্তের প্রণতি।)
বর্ষার পুরোপুরি যায়নি তখনও। সেদিন ঘন বাদল। দমকা হাওয়া। মাঝে মাঝে বৃষ্টি কমছে, আবার ঝরছে অঝোরে। মেঘও ডাকছে ঘন ঘন। অজয় নদে উথালি পাথালি বান। ঝিমঝিম বৃষ্টি মাথায় নিয়ে আমি দুপুর থেকেই অজয়ের পাড়ে। ভয়ঙ্কর স্রোত ভেঙে, ঢেওয়ের সঙ্গে যুদ্ধ করে, পাল ছেঁড়া নৌকা এপার ওপার পাড়ি দিয়ে চলেছে ঘন ঘন। আমার দৃষ্টি ওই নৌকার উপর। ওই বুঝি বাবা ওপারে দাঁড়িয়ে। এই, এবার, হ্যাঁ তো বাবাই উঠেছে। 'অজয় ঠাকুর', তুমি বড় বড় ঢেও তুলো না। আমার বাবা আমার মত সাঁতার জানে না। ওই যে নৌকা এপারে এল। বাবা নেমে আসছে।
মেঘ-বাদলের অন্ধকারে, জলকণায় ঝাপসা চোখের কষ্টের দৃষ্টি দিয়ে চেয়ে চেয়ে, অসহ্য অপেক্ষার পর বাবাকে পেলাম। ছাতায়-ঢাকা মুখ দাঁড়িয়ে আছে আমার মুখের সামনে।
--কেন বাবা, ভিজে ভিজে, এতো দূরে এসে, নদী-পাড়ে.... এমন বর্ষা, বাজ- বিদ্যুৎ !
বলে চলেছেন বাবা আর তাঁর ধুতির অর্ধেকটা খুলে আমার মাথা, গা মুছে দিচ্ছেন।
তারপর?
তারপর সারা পথ নিজে ভিজে, আমার মাথায় ছাতা ধরে, বাবা হাঁটতে লাগলেন। নিজে ভিজছেন, খেয়াল নেই। থলি থেকে বার করছেন লেবুর কোয়ার মত লজেঞ্জুস, পাকা কলা। আমার মুখে পুরে দিতে দিতে বলছেন,
--এবার তোমাকে পড়াশোনা করতে হবে যে, বাবা।
ঘরে চল, দেখবে, তোমার জন্য কতো বই এনেছি, শ্লেট, পেন্সিল।
আমার এতক্ষণের খাবারগুলি সব যেন বিস্বাদ হয়ে গেল। তাহলে কি আমারও দশা অমনি হবে, ওই পশ্চিম পাড়ার রায়জেঠুর ছেলে সতনার মত। সকাল বেলায় তার মাস্টার আসে, তারপর সে পাঠশালায় যায়। সন্ধ্যা বেলাতেও আরেক মাস্টার। খেলতেও আসে কম। সব চাইতে খারাপ, মাছ ধরতে যায় না মোটেও।
ঘরে ঢুকলাম।
বাবা এসেছে। বড়দিদি, ছোট ভাই সবার কী আনন্দ। ঘরে কতো ভালো ভালো খাবার। আমার কিচ্ছু ভালো লাগছে না। বাবার কাছে যেতে ভয় লাগছে আমার। আমি বাগানের ভিতরে ঢুকে পড়লাম। পেয়ারাও পাড়লাম। কিন্তু না, খাবার ইচ্ছাই নাই। সামনের মাঠটায় মনা, ধনা, জগা, শ্যামলা ডাং-গুলি নিয়ে এসেছে। ওখানে যাই .....না, থাক্।
শাঁখের আওয়াজ। সন্ধ্যা হয়ে এলো। সঙ্গে সঙ্গে দিদির ডাক ,
--- সুবল, ঘরে আয়।
গলা শুকিয়ে গেলো, পা-দুটো অবশ লাগছে। কি করি, অন্য দিন হলে কাকুর ঘরে ঢুকে পড়তাম। মুড়ি খেতাম কাকিমার মার কাছে। কিন্তু আজ তো বাবা রয়েছে ঘরে।
ঘরেই গেলাম।
গিয়ে দেখি,-- হ্যারিকেন জ্বালানো, চটের বস্তা পাতা, বাবা বসে, সামনে.....।
-- খোকা আয়, বোস এখানে ।
প্রথম ভাগ, ধারাপাত, একটি অন্য রকম বই। বড় শ্লেট, লম্বা চক পেন্সিল। দিদি ঝুঁকে পড়ে দেখছে, ছোট ভাই হাতে নিতে চাইছে। আমি বসতেই বাবা বললেন,
-- মা সরস্বতী। প্রণাম করে আরম্ভ কর।
বাবা-ই মন্ত্র বলে গেলেন, আমি ঠোঁট দুটো নাড়ালাম।
"শ্বেতপদ্মাসনা দেবী, শ্বেতপুষ্পে শোভিতা।
শ্বেতবীণাধরা দেবী শ্বেতালঙ্কারভূষিতা।।
সরস্বতৈঃ মহাভাগে বিদ্যে কমললোচনে।
বিশ্বরূপে বিশালাক্ষী বিদ্যাং দেহি নমস্তুতে।"
এরপর বইগুলি খুলে খুলে দেখাতে লাগলেন। এমনি করে পড়তে হবে। বার বার লিখতে হবে...
রাত্রি হলো। মায়ের ডাক,
-- এসো সবাই, খেয়ে নাও।
বাবা বললেন,
-- কাল থেকে ভোরবেলা উঠবে, পড়বে। শুধু খেলাধুলা করে সময় নষ্ট করবে না। সামনের মাসে এসে তোমাকে রতন মাস্টারের পাঠশালায় ভর্তি করবো ।
সেই একটা মাস আমার জীবনের পরম দুঃখের সময়।
এমনও মনে হোত, বাবা যেন কোন দিনও না আসে। (আজ একথা মনের হতেই চোখ ভেঙে জল আসছে) আর এলেও লজেঞ্জুস, বিস্কুটগুলো দিয়েই যেন চলে যায়।
ঠিকই, পরের মাসে বাবা আসতে পারেন নি। মালিকের আদেশে কোথায়ও যেন কাজে গেছে। সে যে কী মুক্তি আমার। আবার নূতন উদ্যমে খেলা শুরু। মাছ ধরার ছিপ তৈরী। বই, শ্লেট বস্তায় জড়ানো, উঠেই রইল কুলুঙ্গিতে।
বাবা তিন মাস পরে ঘরে এলেন। কাজের জন্য দূরে দূরে নাকি যেতে হয়েছিল। এসেই আমার পড়ার খবর নিলেন।
কিছুক্ষণের জন্য চুপ। বসে রইলেন। সারা ঘরে ভয়।
থম্ -থমে পরিবেশ !
হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে। কুলঙ্গিতে রাখা, আমার বই-শ্লেট জড়ানো চটের আসন ছুঁড়ে ফেলে দিলেন উঠানে।
--দোষ আমার ! দোষ আমার দরিদ্রতা ! প্রবাস আমার ললাট-লিখন। মূর্খতা ছেলের ভবিতব্য ! বলছেন, আর নিজের কপালে থাপ্পড় মারছেন বারবার। সারা বাড়ি নিস্তব্ধ, নিথর !
পেরিয়ে গিয়েছে বছর ! না না, যুগ !
কিছুতেই ভুলতে পারি না, সে দৃশ্য, বাবার সেদিনের ওই আর্তনাদ।
বেঁচে আছি। সংসার, সম্পদ, আত্মতুষ্টি, অহঙ্কার নিয়ে বেঁচে আছি ...না না না ! জীবন বয়ে চলেছি এতকাল !
জ্ঞানহীন, বিদ্যাহীন, বিবেক-বিবেচনাহীন জৈবিক দিন যাপনের গ্লানি নিয়ে কোন্ পরিণামের প্রতীক্ষা ? এই কি জীবন ! নিশাচরদের সঙ্গে এর পার্থক্য কোথায় ?
গ্রন্থ, গ্রন্থাগার, বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে পরিব্যপ্ত রয়েছে যে জ্যোতির্ময় জগৎ, পল্লী প্রান্তের জীর্ণ মাটির ঘরে তার প্রদীপ শিখাটি প্রথম জ্বালিয়ে দিতে চেয়েছিলেন বাবা, আমার জীবনের উপেক্ষিত শিক্ষক। সেখান থেকে, তাঁর ধুতির স্পর্শ থেকে দূরে, বহুদূরে, অজ্ঞান-তিমিরের অন্ধকূপে আপনাকে আবদ্ধ রেখে অর্থসর্বস্ব, পরমার্থ-শূণ্য জীবনের নিরর্থকতার উপলব্ধি আজ ? এতোদিন পরে ?
হে স্রষ্টা, হে পিতা !
-- আমার জীবনে শিক্ষক দিবস অনুতাপের অশ্রুজলে ভিজে গেছে বাবা, দেখ।
-- আরেকটি বার মুছে দিতে আসবে না, বাবা ?
সুদূরের সেই ফেলে আসা স্মৃতি আজও যেন জীবন্ত ; কিন্তু তার বেদনার ভার দুর্বিসহ। সেই পিতৃহৃদয়ের স্নেহবিগলিত রসধারা, সেই বর্ষণ-স্ফীত অজয়ের উচ্ছ্বাস, খেয়াঘাট, রূপন মাঝী (রায়), কাশ- ঝোপে- ভরা নদীর পাড় ; সেই বাদল-ঝরা সান্ধ্য-অন্ধকার, কাঁচ-ভাঙা লণ্ঠনের মৃদু আলো, বিদ্যাসাগরের প্রথম ভাগ, অবাক চাহনি, দুঃখী বাবা, দুঃখিনী মায়ের শাসনের সোহাগের করস্পর্শ... আজ দিগন্তের ওপারে বিলীন ।
বুকভাঙা হাহাকার !
----- বাবা, তুমি এসো, আমি পড়বো।
একটি বিশ্বগ্রাসী ''না"-মেঘের ''হাঁ-মুখ'' জমাট কালো রাহুর মতো, অস্তগামী সূর্যের শেষ আলোর লেখাটুকুও গিলে খেয়ে অন্ধকারে ঢেকে দিল আমার জগৎ। বৃষ্টি নামলো অঝোর ধারায়।
(গল্পটি পুনঃপ্রচারিত)
দুলাল বন্দোপাধ্যায়
৫/৯/'২১
ব্যাঙ্গালোর
ভালো,বেশ ভালো
উত্তরমুছুনএই মন্তব্যটি একটি ব্লগ প্রশাসক দ্বারা মুছে ফেলা হয়েছে।
উত্তরমুছুনশক্ষক দিবসের লেখাটি অত্যন্ত ভাল কারন আপনি বহু ছেলে মেযেদের পড়িয়েছেন তারা অনেকেই আজ প্রতিষ্ঠিত আপনার শিক্ষায় শিক্ষিত বিদ্যার সাগরে শিক্ষা রূপ নৌকার মাঝি রূপে হাল ধরে থাকতেন তাই আমার সন্তানের ৩ তরফ থেকে ধন্যবাদ
উত্তরমুছুনখুব সুন্দর গল্প দাদা। মনটা ভরে গেল।
উত্তরমুছুন