"হ্যাঁ চণ্ডীমণ্ডপ থেকে বাড়ী ফিরছিলাম। এই তো সিঁদুর খেলা শেষ হল। কি আনন্দই আজ হয়েছে , জানো। চৌধুরী পাড়ার কাকিমা , জেঠিমা , পিসিমারা সব যেভাবে সিঁদুর খেলায় মেতেছিলেন ! তোমার দুই দিদিও ছিলেন। আমাকে কী বললেন ? বললেন - প্রতিমা লক্ষীতো পেঁচা নিয়ে এসেছে , তুই কবে পেঁচা নিয়ে ঘুরবি ?
আমি ঘরে এসে গেলাম। তুমি আমার বিজয়ার প্রণাম নিও। রাখছি। ফোন করবে। না না - বাই -না। আগে তোমার দেওয়া সিঁদুর তো ....।"
ঘরে ঢুকল সীমন্তিনী। ঘর নয় বিশাল অট্টালিকা পরিখা দিয়ে ঘেরা। বাগান , না বাগানতো নয় যেন বোন দিয়ে ঢাকা। জনপ্রাণী বলতে কনকমাসী। বাবা আর খাঁচার ভেতর একটি বিস্রস্ত পাখনার বুড়ো কাকাতুয়া। ও , রান্নার মাসী। সাদা লম্বা চুল দাড়িতে ঢাকা বাবা একতলার খোলা বারান্দায় বসে থাকেন আরাম কেদারায় - উদাসীন , নির্বাক। মাসী ঠাকুর ঘরে বালগোপালের মূর্তিটিকি সাজাতেই থাকেন দিনের অর্ধেকটা সময়। রান্নার মাসী রান্না সেরে , রান্নাঘরের চৌকাঠে হেলান দিয়ে ঢুলতে থাকে। কাকাতুয়া ছায়া দেখলেই ডেকে ওঠে - 'কে', 'কে'। বাড়ির নাম অশোক ভবন।
সীমন্তিনী আয়নার সামনে এসে দাঁড়ায়। সত্যি তাকে খুবই সুন্দর দেখায় এই সিঁদুরের ছোপে। গাল দুটি সিঁদুরে লেপা , কাপালটিও। শুধু সিঁথিটুকু বাদ।
"একদিন , একদিন এসো না স্বপ্নময়। সিঁথিতে সিঁদুর দিয়ে যাওনা - কপালে টিপ দেবে কোন সরমা। তুমি না হয়ে চলে যেও। আমাকে দিয়ে যাও সিঁদুরের অধিকার। জানোতো , আমি সিঁদুর কত ভালোবাসি। আমার - কী জানি কেন যে মনে হয়ে সিঁদুরের প্রতি জন্ম জন্মান্তরের এই অনুরাগ সংস্কার নয় , স্থিতি ও সৃষ্টির কামনা। "
দেখ স্মৃতি বিস্মৃতির আলোছায়ায় ঢাকা পঁচিশটা বছর আজ আমার জীবনে অতীত। এই অতীত তার অস্তিত্বের চিন্হটুকুই শুধু এঁকে দিয়ে গেছে আমার দেহে , আমার মনে। দেহে তা ব্যক্ত - মনে সে অব্যক্ত। এই ব্যক্ত প্রকাশ আর অব্যক্ত আবেগ মিলে সৃষ্টি হয়েছে আমার নারীসত্ত্বা। সে আবার বঙ্গনারী। শাড়ি , শাঁখা , সিঁদুর আমার অলংকার। আচ্ছা আমি না থাকলে এই অলংকারের ঠাঁই কোথায় হত ?হ্যাঁ একথা জানি যে সিঁদুর আমার নারীসত্ত্বার পূর্নতা দেয়। কিন্তু এও তো সত্য আমার এই বিকশিত নারী - আমিত্বের ছোঁয়ায় সেও ধন্য হয়েছে। নইলে এই স্বল্পমূল্যের লাল ধুলাটি মাটি থেকে আকাশে উঠতে পারত ?
".........সিঁদুর বিন্দু শোভিল লালাটে
গোধূলি ললাটে , আহা ! তারা রত্ন যথা।"
স্বপ্নময়, তুমি কোথায় ? সাগর পারে ?তোমার সিঁদুর বিলাসী সীতার দীর্ঘ লালিত মনস্কামনা পূর্ন কর। আমি ঊর্বশী , রম্ভা হতে পারবো না - এমন কি চিত্রাঙ্গদাও। আমি বঙ্গবধূ। নারী -মেদ -লোলুপ রাক্ষসদের , নিয়ত চক্রান্তকারিনী রাক্ষসীদের মাঝখানে সরমাহীন "অশোকভবনে" আমি বন্দিনী নারী। আমার বর্ম সিঁদুর দিয়ে ঊদ্ধার কর।
স্বপ্নময়, ভয়ও হয়। তোমার মধ্যকার অনাদীকালের রামচন্দ্র বেরিয়ে আসবেনা তো ? আবার সতীত্বের অগ্নিপরীক্ষা ? এবং নারীত্বের পাতাল প্রবেশ ?
--------------------------------------------------------------------------------------------------------
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন