বিশ্বসাহিত্যের শিশিরবিন্দু
খ্রিষ্টোফার মারলো
Christopher Marlowe (1464--1593),
উলফ্যাং ভ্যান গোথে
Wolfgang Van Goethe(1749-- 1832),
এবং
ডাক্তার ফস্টাস বা ফাউস্ট-- বিষাদময় পরিণতির ইতিহাস।
বিশ্বসাহিত্যের দুই যশোধন পুরুষ, অপ্রতিদ্বন্দ্বী কবি ও নাট্যকার খ্রিষ্টোফার মারলো এবং সেক্সপিয়ারের জন্ম একই সময়ে, একই সাথে, ১৫৬৪ খ্রীষ্টাব্দে। মার্লোর জীবনকাল ২৮ বছরের, সেক্সপিয়ারের ৫২ বছরের। মার্লো ইংল্যান্ডের কেন্ট শহরের একজন জুতা প্রস্তুতকারকের সন্তান। কিন্তু কি ভাবে তিনি ক্যান্টারবেরি শহরের কিংস স্কুল হয়ে কেমব্রিজের করপাস ক্রিষ্টি কলেজ এবং কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটিতে মাষ্টার্স ডিগ্রীর জন্য পড়াশুনা চালিয়ে গিয়েছিলেন, কি ভাবেই বা তা সম্ভব হয়েছিল -- সে ইতিহাস অজানা। তার অতিমানবীয় মেধা এবং বিস্ময়কর প্রতিভার ফসল তার সৃষ্ট, দুইখন্ডে সমাপ্ত নাটক তাম্বুরলাইন দি গ্রেট (Tamburlaine The Great), আর দি ট্রাজিক্যাল হিসট্রি অব ডাক্তার ফস্টাস (The Tragical History of Doctor Faustus).
এ ছাড়াও তাঁর অনুবাদ সাহিত্য ওভিদের 'এজেলিস', লুকানের 'ফারসালিয়া' এবং তাঁর কাব্যগ্রন্থ Dido, The Tragidie Queen of Carthage, Hero And Leander -- শুধু ইংরেজি সাহিত্যে নয়, বিশ্ব সাহিত্যের অক্ষয় ও অমুল্য সম্পদ। এই সমস্ত গ্রন্থগুলির মধ্যে জ্যোতির্ময় হয়ে রয়েছে তাঁর ডাক্তার ফস্টাস।
গল্পটি বিদগ্ধ পাঠক সমাজের জানা। মানব জীবনের পাপ পুন্যের দ্বন্দ্ব। সাতটি ভয়ঙ্কর পাপ নিয়ে স্বর্গ মর্ত্য পাতালব্যাপী বিরাজ করছে দুজন শয়তান। লুসিফার ও ও মেফিস্টোফেলিস (Lucifer and Mephistopheles)
Doctor Faustus, weary of the sciences, turns to magic and calls up Mephistopheles, making a compact to surrender his soul to the Devil in return for 24 years of life ; during the time Mephistopheles shall attend on him and give him all he demands.
চিকিৎসক ফস্টাস, অকস্মাৎ ডাক্তারি ছেড়ে তান্ত্রিক যাদুকর হয়ে যান। এই ডাক্তার তাঁর বাল্যকাল ও যৌবন কেটেছে দুঃখ এবং দারিদ্র্যের মধ্য দিয়ে, তিনি নিঃস্ব হয়ে আর থাকতে চাইলেন না। কামনার তৃপ্তি হয়নি (আমাদের মহাভারতের পৌরাণিক চরিত্র যযাতির সঙ্গে কিছুটা মিলছে কি?), তাই তিনি জ্ঞান ও ক্ষমতার বিনিময়ে নিজের আত্মা বিক্রি করে দেন শয়তানের কাছে, এই শর্তে যে শয়তান তাঁকে যা দান করবেন, তিনি তা অস্বীকার করতে পারবেন না। ফল হোল এই যে শয়তানের সহযোগিতায় ও কারসাজিতে ফস্টাস কামনা বাসনায় জর্জরিত হয়ে ধংসের অতল তলে নিমজ্জিত হলেন। মৃত্যু হোল ; কিন্তু তার আত্মা স্বর্গে যেতে সমর্থ হোল না, কেননা শয়তানের কাছে তাঁকে আগেই বিক্রি করা হয়েছে। শয়তান আত্মাকে স্বর্গ থেকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। ফস্টাসের আত্মা এসে পড়েছিল মহান যীশুর কোলে।
নাটকটিতে গল্পের অভিনবত্ব, ঘটনার চমৎকারিত্ব ও সর্বোপরি আবেগরঞ্জিত কাব্যসুষমার যে দৃষ্টান্ত আছে তার তুলনা বিশ্বসাহিত্যে বিরল। তিনিই প্রথম তাঁর নাটকে অমিত্রাক্ষর ছন্দের (blank verse)ব্যবহার করেন। এক্ষেত্রে তিনি সেক্সপিয়ারের পথপ্রদর্শক এবং পরবর্তী কালের ইংরেজি সাহিত্যের মহান কবিরাও, বিশেষত মহাকবি মিলটন, মার্লোর পদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন। তিনি যে শয়তানের চরিত্র অঙ্কন করেছেন তাও তার পরবর্তী কালের কবি, নাট্যকার, যাঁরা বিশ্বসাহিত্যের নক্ষত্রস্বরূপ, তারাও সেই 'চরিত্রাদর্শ' প্রায় পূর্ণরূপে গ্রহণ করেছেন।
এ-সবই সাহিত্যের ছাত্র যারা তাদের গবেষণার বিষয়। আমি এখানে Tamburlaine থেকে একটি এবং Doctor Faustus- থেকে আরও একটি উক্তি উদ্ধার করে পাঠকের কৌতুহল উদৃক্ত করবার চেষ্টা করব।
1. "Our souls, whose faculties can comprehend The wondrous architecture of the world,
And measure every wandering planet's course, Still climbing after knowledge infinite,
And always moving as the restless spheres --- Will us to wear ourselves and never rest."
-------(Tamburlaine, pt. 1.)
বোধ বুদ্ধি আর প্রজ্ঞার আলোয়
সচেতন আত্মা আমাদের, পারে
বুঝে নিতে এ বিশ্বের সৃষ্টির আদল।
পরিমান পরিমিতি গতি খোঁজে নিরন্তর
গ্রহদের তারাদের ভ্রম্যমানতার।
তবু আরো, আরো যাত্রা, আরো আরোহন--
সীমাহারা, অধরা ভূধররূপী যে মহাজ্ঞান --
নিত্য নিত্য চলে তার চূড়ার সন্ধান।
শ্রান্তিহীন শান্তিহীন আত্মক্ষয়ী এ মহা সংগ্রাম
মানবের কাছে আজ অনিবার্য নিয়তি আহ্বান।
-----------(ভাবানুবাদ মৎকৃত)
2. ফাউস্ট ম্যাজিক শেখার জন্য নিজের আত্মাকে শয়তানের কাছে বিক্রি করে দিলেন তাতে তিনি আগামী চব্বিশ বছরে, শর্ত অনুযায়ী, জ্ঞান ও ক্ষমতায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারেন।
এখানেই শয়তান মেফিস্টোফিলিসের একটি সত্তা- আলোড়নকারী উক্তিঃ
Mephistopheles
"Hell hath no limits, nor circumscribed
In one self place ; where we are is Hell,
And Where Hell is there must we ever be."
......................…........................................
All places shall be Hell, that is not Heaven.
Faustus,
Come, I think Hell is a fable.
Mephisto,
Ay, think so still, till experience changes thy mind.
নরক কি কোন এক আলাদা জগৎ ?
সীমানা ঘেরা প্রায়শ্চিত্তের অন্ধ শ্মশান ?
তা নয়, তা নয় ---
যেখানে আমরা আছি পাপের তনয়
তাই তো নরক। এখানেই থাকা আছে ললাট লিখন--
এ যে প্রেতলোক,
সাম্রাজ্য রয়েছে যার সারা বিশ্বময়।
ফস্টাস,
তাই হোক্, আমি জানি নরক সে তো কল্পকাহিনী।
মেফিস্টো,
তাই তো ভাবছো তুমি, সেই স্বাভাবিক ;
যে অবধি অভিজ্ঞতা হবে না তোমার।
-------ভাবানুবাদ মৎকৃত।
এই উক্তিগুলির মধ্যে কি পাই আমরা ? শুধু কি বিস্ময়কর সাহিত্য প্রতিভার অভিব্যক্তি ? সুগভীর মননশীলতা, দার্শনিক বোধ ? না কি মানুষের মনোজগতে যে সুতীব্র বিত্তবাসনা, ক্ষমতা লাভের যে আত্মক্ষয়ী চিতাগ্নিশিখা তার অন্তরে নিরন্তর প্রজ্বলিত, সেই অমোঘ সত্যের আগ্নেয় ভাষারূপ ! জীবনের অবশ্যম্ভাবী শেষ পরিণতির অন্তেষ্টি ক্রিয়ার কাব্যময় বেদমন্ত্র উচ্চারণ !
দুই
এস্থলে যেহেতু বেদ শব্দটি এসে গেল তাই আমাদের, এই প্রাচ্য দেশে বিত্ত ভোগ ও ক্ষমতার কামনা ও লালসা (The Devil that reigns the Soul of humanity) থেকে মুক্তির উপায়গুলি ভিন্নতর যে আদর্শের মূল বাণীগুলি ছড়িয়ে আছে আমাদের প্রাচীন শ্রুতি ও স্মৃতি শাস্ত্রের অফুরন্ত ভান্ডারে। একটি উদাহরণ রেখে সেই সমস্ত মহাবাণীর সার জিজ্ঞাসাটি রাখবার চেষ্টা করব ,--
ব্রহ্মর্ষী যাগ্যবল্ক্য যখন তাঁর দুই সহধর্মিণী মৈত্রেয়ী ও কাত্যায়নীকে (সন্ন্যাস আশ্রম পালনের নিমিত্ত গৃহত্যাগকালে) তাঁর স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, গোধন, শিষ্যকুল--- সকল কিছুই ভাগ করে দিতে চাইলেন তখন দেবী মৈত্রেয়ী বলেছিলেন,--
"যেনাহম্ নামৃতা সাম কিমহং তেন কুর্যাম্" --- কি প্রয়োজন আমার, হে প্রভু, যে বিত্তে অমৃত লাভের আশা নেই ?
তারপর সেই অমৃতনিঃস্যন্দ মহা বাণী, চিরকালের প্রার্থনা মন্ত্র,
অসতো মা সদ্গময়
তমসো মা জ্যোতির্গময়
মৃত্যোর্মা অমৃতং গময়।।
ওঁ শান্তিঃ ওঁ শান্তিঃ ওঁ শান্তিঃ ।।
পাশ্চাত্যদেশে এমনতর ত্যাগ ও তিতিক্ষার দ্বারা জীবনে অমৃত লাভের সাধনার পথনির্দেশ নাই বললেই চলে। তবে অষ্টাদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে ভারতীয় দর্শন ও সাহিত্য ইউরোপ খণ্ডে প্রসারিত ও প্রচারিত হতে থাকে। ম্যাক্সমুলার এবং স্বয়ং গোথে বহু পাশ্চাত্য সারস্বত সাধকদের মধ্যে বিশিষ্টতর। মুলার (The Great German orientalist and sanskrit scholar--1823- 1900) এবং আমাদের আলোচিত গোথে বেদ, উপনিষদ ও পুরাণ নিয়ে গভীর গবেষণা করেছেন। ম্যাক্সমুলার ১৮৪৬ সালে ইংল্যান্ডে আসেন ঋক বেদের উপর গবেষণা ও অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে ঐ গ্রন্থ প্রকাশ করবার বাসনায়। (উৎসুক পাঠকদের জন্য নিরোদ চন্দ্র চৌধুরী মহাশয়ের Scholar Extra ordinary বইটি অবশ্য পাঠ্য)।
এবার আমরা আবার গোথে -তে ফিরে আসি। মহাকবি কালিদাসের অভিজ্ঞান শকুন্তলম জার্মান ভাষায় প্রথম অনুদিত হয় ১৭৯১ খ্রীষ্টাব্দে। ইয়রগ্ ফরস্টারের সেই অনুবাদ পড়ে গোথে বলেছিলেন, --
"বিশ্বের সমস্ত সাহিত্য সম্ভার, যা মানুষের সত্তাকে আচ্ছন্ন, আবিষ্ট এবং পূর্ণ করে তুলতে পারে তার 👑মুকুট মণি হচ্ছে শকুন্তলা।"
এতক্ষণ এতখানি আলোচনা এইজন্যই করলাম মার্লোর (Christopher Marlowe) ড. ফস্টাস-য়ের ট্র্যাজিক পরিনতির সঙ্গে গোথের (Wolfgang Van Goethe) ফাউস্ট -য়ের ট্র্যাজেডির ভাবগত বিবর্তন কতখানি -- সেইটির একটি সূক্ষ্মতম ইঙ্গিত উপস্থাপিত করবার বাসনা জেগে উঠল বলে'।
গোথে-য়ের ফাউস্ট-য়ে দুটো পর্ব বা Part.
পর্ব ১ বা Part. শেষ হয়েছে গেচেন-য়ের (Gretchen) মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে।
(The tragic story of Foust's love for a town girl, Gretchen (Margarete), of her seduction, infanticide, execution).
ফাউস্টের অবৈধ প্রনয়িনী গ্রেচেন, হলেন অবৈধ সন্তানের জন্মদাত্রী, আত্মগ্লানি অসহ্য হওয়ায় সদ্যজাত সন্তানকে হত্যা করলেন জলে বিসর্জন দিয়ে, বিচারে হত্যার অপরাধে কারারুদ্ধ,অবরুদ্ধ,বন্দী অবস্থায় তাঁর আত্মহননের প্রয়াস। ফাউস্ট ও মেফিস্টোফিলিসের চেষ্টা সত্ত্বেও তিনি মুক্তি চায়নি। এই সময়ে Foust and Mephistopheles flee from the dungeon, while voices from heaven (দৈববাণী হোল) announce that --- 'Gretchen shall be saved.'
(স্মরণীয় -- জানি গো তুমি ক্ষমিবে তারে
যে অভাগিনী পাপের ভারে
চরণে তব বিনতা।।)
কিন্তু প্রথম যে পাণ্ডুলিপি সেখানে দেখা যায় গেচেন ঈশ্বরের ক্ষমা থেকে বঞ্চিতা। Urfoust-য়ে লেখা হয়েছে, --'She is condemned' - শাস্তিযোগ্য অপরাধী।
দ্বিতীয় সংস্কারের গ্রন্থ (পর্ব -- এক) স্রষ্টার এই যে ঐশ্বরিক অনুভবের বিবর্তন ('Catchen shall be saved') সেখানে ভারতীয় দর্শন ও সাহিত্যের প্রভাব স্পষ্টরূপে অভিব্যক্ত।
এবার শয়তান প্রভাবিত ফাউস্টের অন্তিম পরিণাম !
Mephistopheles ঈশ্বরের কাছে প্রমাণ করছিল, 'Humanity does not always choose Good.' মানুষের চাওয়াগুলি সবসময় শুভঙ্কর হয় না' এবং এটি সে প্রমাণ করে দিয়েছিল ঈশ্বরের ভালবাসার পাত্র ফস্টাসের জীবনাচরণে আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে। কিন্তু ফস্টাসের আন্তর চেতনায় কোথায় যেন ভালোর প্রতি, শুভর প্রতি অর্ধসুপ্ত ঝোঁক (dormant inclination) ছিল। তাই মেফিস্টোফিলিসের প্রভাব সত্ত্বেও তার পরিণতি মার্লোর ডাক্তার ফস্টাসের মত হয়নি। এখানে গোথের ফাউস্ট 'ultimately built a commercial Empire on the land which he own as a gift by the Emperor whom he, along with Mephistopheles had helped In winning the war. And now, when he reached his golden age of hundred years he died. And a host of Angels descended to draw him up to Heaven instead of the Devil getting his Soul.
তাহলে কঠ উপনিষদের মন্ত্রই কি শেষ কথা,
যথা সর্বে প্রমুচ্যন্তে কামনা যেহস্য হৃদি শ্রিতাঃ।
অথ মর্ত্যো অমৃতো ভীতি ব্রহ্ম সমুশ্নুতে ।।
ওঁ শান্তিঃ ওঁ শান্তিঃ ওঁ শান্তিঃ ।।
May Peace drops down from the Heaven,
From the Eternity, for ever and for good.
দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
০৮ /১০ /২০২৪
বেঙ্গালোর ।
____________________________________________
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন