সুগভীর প্রজ্ঞার একটি ঐতিহাসিক গ্রন্থ।
এক
সভ্যতার ক্রমবিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানব চেতনার ক্রমবিকাশও অঙ্গে অঙ্গে বাঁধা পড়ে আছে। প্রথমটি জ্ঞানের, উপলব্ধির ও অভিজ্ঞতার প্রায়োগিক দিক, আর দ্বিতীয়টি মুক্তি ও মোক্ষলাভের পথ। এই মুক্তি ও মোক্ষলাভ কোন বিশেষ একটি ধর্মধারণায় বিচার্য নয়। এটি মানুষের জাগতিক জীবনের অনিশ্চয়তা, শোক দুঃখ বেদনা বিষাদ --- যা অবশ্যম্ভাবী, অনিবার্য, তাই থেকে মুক্ত হবার, সকল দুর্গতি ও বিপর্যয়কে স্বীকার করেও শান্ত সুন্দর এবং 'আনন্দময়' জীবন অতিবাহিত করবার সাধনা। সমস্ত ধর্মের মূলগত সাধনার হদিশ মানুষ প্রথম পেয়েছিল আজ থেকে প্রায় তিন হাজার বছর আগে শেষ তীর্থঙ্কর বা প্রথম পূর্ণরূপে-সিদ্ধ সাধক, শাক্যমুনি তথাগত গৌতম বুদ্ধের সাধনপথে ও বাণীতে।
বুদ্ধদেব, বৌদ্ধধর্ম, তার প্রভাব, অনুশীলন-মার্গের ইতিহাস সুদীর্ঘ এবং সুগভীর। আজও সে সবের চর্চা, সেই ধর্মানুসরণ অব্যাহত শুধু ভারতবর্ষে নয়, বিশ্বের বহু দেশে। বিশেষ করে দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় --- চীন জাপান শ্রীলঙ্কা হয়ে ইন্দোনেশিয়া, সুমাত্রা, জাভা, বোর্ণিও, বালি, থাইল্যান্ডসহ দ্বীপময় প্রাচ্যভূমির দেশে দেশান্তরে।
এহেন একটি জীবনাচরণ-সাধনার (নিরঞ্জন বুদ্ধের সাধনার পথ) মার্গ প্রদর্শকের আবির্ভাব ঘটেছিল আজ থেকে প্রায় তিনহাজার বছর আগে এই পুন্য ভারতভূমির উত্তরপ্রান্তে, হিমালয়ের কোলে কপিলাবস্তুর রাজ পরিবারে, রাজা শুদ্ধোদন ও রাণী মায়াদেবীর কোলে।
ভগবান বুদ্ধ ও বৌদ্ধধর্মের উপর অসংখ্য পুঁথি, অসংখ্য গ্রন্থ রচিত হয়েছে হাজার হাজার বছর ধরে ; কিন্তু যে গ্রন্থটি সমগ্র বিশ্বের মানব-সমাজকে, মানব চেতনাকে আলোড়িত করেছিল, করে চলেছে, সেটি স্যার এডুইন আর্নল্ডের লেখা, The Light of Asia, or The Great Renunciation। এশিয়ার আলো বা মহা নিষ্ক্রমণ। আমি তার নামকরণ করেছি প্রাচী ধরিত্রীর আলো।
বইটি আটটি সর্গে (৫৩০০পংক্তি, ৪১০০ শব্দ) সম্পূর্ণ।
প্রথম সর্গ (Book the First) রাজপুত্র সিদ্ধার্থ বা গৌতমের জন্ম। তাঁর শৈশব ও কৈশোর।
দ্বিতীয় সর্গ ( Book the second) বিলাস, বৈভব ও ঈশ্বর্যের মধ্যে বেড়ে ওঠা। অষ্টাদশ বৎসর বয়সে যশোধরার সঙ্গে বিবাহ।
তৃতীয়াংশ সর্গ (Book the Third) পর্যাপ্ত সুখ ও বিলাস ব্যসনের মধ্যে জীবন অতিবাহিত হলেও রাজকুমারের অন্তরে কোথায় যেন অতৃপ্তি, সংসারে নির্লিপ্ততা।
চতুর্থ সর্গ (Book the fourth) রাজকুমার সিদ্ধার্থৈর মহানিষ্ক্রমণ।
পঞ্চম সর্গ ( Book the Fifth) আত্মগ্লানি সঞ্জাত বিষাদ, নিরন্ন নির্জলা উপবাস, এক রাখালের দেওয়া দুগ্ধপান।
ষষ্ঠ সর্গ (Book the Sixth) সুজাতার পরমান্ন নিবেদন, 'মারী বা মার' দুর্গহের সঙ্গে সংগ্রাম, বোধিবৃক্ষের তলায় মহাধ্যানে লীন ও পরম সত্যের উপলব্ধি।
সপ্তম সর্গ (Book the Seventh) সন্তানের অদর্শনে পিতা শুদ্ধোদনের শোক, যুবরাজ্ঞী বিরোহিনী যশোধরার নিরন্তর উদ্বেগ, সপ্তম বর্ষীয় বালক রাহুলের প্রশ্ন, 'পিতা কোথায়', অকস্মাৎ দুই ভিনদেশী বণিকের আগমন, তাদের মুখে বুদ্ধের বাণী। অতঃপর সন্ন্যাসী বুদ্ধের স্বগৃহে আগমন, স্বাগত অনুষ্ঠান, স্ত্রী সহ পরিবারের সকলের বৌদ্ধধর্মে দীক্ষালাভ।
অষ্টম সর্গ (Book the Eight) ভিক্ষু সম্প্রদায় গঠন, কিসাগৌতমীর উপাখ্যান।
সুধী পাঠকদের কাছে ভগবান বুদ্ধের জীবনীর এই সংক্ষিপ্তসার জানা, জানা অবশ্যপাঠ্য ইতিহাসের অংশ হিসাবে। কিন্তু সেই জীবনালেখ্য মানবতা, বিশ্বচেতনা ও জনগণতান্ত্রিকতার ক্রমোত্তরণের প্রচেষ্টায় কতখানি অনুঘটকের কাজ করেছে তা এই ঐতিহাসিক গ্রন্থটির বিপুল প্রচার ও প্রভাবের দ্বারা স্বীকৃত হয়েছে। প্রশ্ন উঠবে প্রাচী ধরিত্রীর আলো বইটি প্রকাশিত হবার আগে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারিত, প্রসারিত হয়নি ? হয়েছিল। আড়ম্বরপূর্ণ যাগযজ্ঞের অগ্নিশিখার জ্যোতির্বলয়ের গন্ডীর মধ্যে থাকা অর্থাৎ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য সম্প্রদায়ের বাইরের শূদ্র বা ন-আর্য জনগোষ্ঠীর 'আপামর' নরনারী বুদ্ধের সরল, সহজ ও মানবিক বাণীর আবেদনে বিমোহিত হয়ে সাড়া দিয়েছিলেন-- 'বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি'।
সে যাই হোক্, আমরা ফিরে আসি 'প্রাচী ধরিত্রীর আলো' গ্রন্থটির প্রসঙ্গে। মুক্ত ছন্দের এই কাব্যটির আটটি সর্গের বর্ণিত আখ্যান সম্পূৰ্ণরূপে আলোচনার করবার প্রয়াস একটি দুর্বহ কর্মভার। (অদূর ভবিষ্যতে তাও পুস্তক আকারে প্রকাশিত হবে।) আমরা আলোচনা করি পূর্ণ আখ্যায়িকার কিছু খন্ডাংশ নিয়ে।
কাব্যটির আরম্ভ হয়েছে এইভাবে,
Book the First
The Scripture of the saviour of the World ,
Lord Buddha --- Prince Sidddrtha styled on earth --
In Earth and Heavens and Hell incomparable,
All- honoured, Wisest, Best, most pitiful ;
The teacher of Nirvana and the Law.
জগতের মুক্তিদাতা বুদ্ধদেব, সিদ্ধার্থ নাম নিয়ে
আবির্ভূত এই ধরাতলে। তুলনা নাইকো তার
ত্রিজগত মাঝে। শ্রদ্ধার দিব্যাসনে অধিষ্ঠান তাঁর।
পুরুষোত্তম, করুণাময় জ্ঞানের আধার --
বিশ্ববিধান আর মহাপরিনির্বাণের পথের দিশারী।
(অনুবাদ স্বকৃত)
এখানেই এডুইন আর্নল্ড মহাশয়ের লেখনীর মহিমা এবং কথকথাটির আকর্ষণীয় গৌরচন্দ্রিকা। গৌতম বুদ্ধের প্রতি কতখানি শ্রদ্ধাবনত আত্মসমর্পণ, কী গভীর প্রেম ! মনে হয়না তিনি সাতসমুদ্র পারের কোন এক ভিনদেশী মানুষ। মনে হতেই পারে তিনি যেন এই ভারতভূমির একজন ভক্ত, ঈশ্বরে সমরর্পিত-প্রাণ বৈষ্ণব।
এবার দেখি সিদ্ধার্থের জন্ম লগ্নের বিবরণ,
...That night The wife of King Suddhodana,
Maya, the Queen, asleep beside her Lord,
Dreamed a strange dream ; dreamed that a star from heaven ----
Splendid, six-rayed in colour rosy-pearl,
Where of the token was an Elephant
Six tusked, and white as milk of Kamadhuk --
Shot through the void and sinking into her,
Entered her womb upon the right.
যেন স্বর্গের আশীর্বাদ এল নেমে, মর্ত্য মানবী মায়ের বক্ষ পূর্ণ হোল দুগ্ধসুধায়, আলোয় আলোয় ভরে গেল চরাচর। কম্পিত অরন্য-পর্বত.... রাণীমার আনন্দ ছড়িয়ে পড়লো সর্বত্র। উদ্বেলিত হয়ে উঠল স্বর্গ মর্ত্য পাতাল ...।
এইভাবে আরম্ভকাল হতে সমাপ্তি পর্যন্ত কথকের আবেগের, আনন্দের উচ্ছ্বাসে ভাব-সিক্ত এই কাহিনীকাব্যের সর্বাঙ্গ। সমস্তক্ষণ মনে হবে লেখক যেন বৈষ্ণবীয় ভক্তিরসে এবং ভারতীয় সভ্যতার, বিশেষ করে সাহিত্যরসে অভিসিঞ্চিত হয়েই এই গ্রন্থটি প্রণয়ন করেছেন। এক্ষেত্রে একটি সমগোত্রীয় বর্ণনা স্মরণে আসে,
"কপিলাবস্তুর রাজবাড়ি। রাজরাণী মায়াদেবী ঘুমিয়ে রয়েছেন ঘরের সামনে খোলা ছাদ, তার ওধারে বাগান। শহর মন্দির মঠ, আরও ওধারে দূরে হিমালয় পর্বতশ্রেণী --- সাদা বরফে ঢাকা। আর সেই পাহাড়ের উপরে আকাশ জুড়ে আশ্চর্য সাদা আলো। শুদ্ধোদন সেই আলোর দিকে চেয়ে আছেন, এমন সময় মায়াদেবী জেগে উঠে বললেন, "মহারাজ, কি চমৎকার স্বপ্নই যে দেখলাম ! এতটুকু একটি সাদা হাতি, দ্বিতীয়ার চাঁদের মতন কচি কচি দুটো দাঁত, সে যেন হিমালয়ের ওপার থেকে মেঘের উপর দিয়ে আমার কোলে নেমে এল। তারপর সে কোথায় গেল দেখতে পেলেম না। "
--------- অবনীন্দ্র নাথ
কালি-কলম ও রঙ-তুলির এমন যুগলবন্দি আমাদের বিস্মিত করে। চোখে দেখি ছবি আর অন্তরে অনুরণিত হয় পণ্ডিত রবিশঙ্কর আর ইহুদী মেদুইনের সেতার ও বেহালায় প্রাচ্য পাশ্চাত্যের মিলনসঙ্গীত। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যের, কেননা লেখক ভারতের ডেকান কলেজের অধ্যক্ষ পদে আসীন ছিলেন এক সময়ে।
(ক্রমশঃ)
দুই
আর্নল্ড সাহেব স্বীকার করেছেন যে তাঁর এই গ্রন্থটি রচনার পশ্চাৎপটে আছে তাঁর যথেষ্ট অধ্যয়ন, 'considerable study.' কিন্তু আর্নল্ড সাহেবের কিছু পূর্বে আরেকজন ব্রিটিশ গবেষক সুপন্ডিত প্রোফেসর T. W. Rhys ভগবান বুদ্ধের ধর্মধারণার উপর একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেন, A manual of Buddhism.
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন