জাত গোত্র
"বলতে পারিস বিশ্বপিতা ভগবানের কোন সে জাত?
কোন্ ছেলের তাঁর লাগলে ছোঁওয়া অশুচি হন জগন্নাথ?"
--- কাজী নজরুল ইসলাম।
--- আমি ভেবে পাই না জাত নিয়ে এখনো কেন এত ভড়ং, দেমাক। এমন কত দেখেছি, দেখছি যে বাবা মা'ই জানে না তাদের ছেলেদের বা মেয়েদের কি জাত !
যেই বলা অমনি ভীমরুলের চাকে যেন ঢিল ছুঁড়ল কেও!
--- দেখ খুড়া, সামাল দিয়ে কথা বল। আজগুবি বলে দিলেই হোল ? প্রমাণ দিতে পারবে ?
--- কত প্রমাণ চাই ?
--- কই, একটিও দাও না, দেখি।
এমনিই এক বাক বিতন্ডা চলছিল নামু দামোদরের --- যে প্রচণ্ড দামোদর ঝাড়খণ্ড ছাড়িয়ে পশ্চিম বাংলার পশ্চিম বর্ধমানে ঢুকেছে, যে দামোদর এখন দুর্গাপুরের ডি ভি সি-র বাঁধে বাঁধা পড়ে , মন্দীভূত স্রোতে পূর্ব বর্ধমানে প্রবেশ করেছে --- সেই দামোদর পাড়ের তাজপুর নৌকা ঘাটার চা'য়ের দোকানে।
"বাঙলা দেশটার বিশালত্ব আর বৈচিত্র্য দুটিই আমাদের কল্পনা, আমাদের ধারণার সীমানার বাইরে। এখন না হয় পূর্ব প্রান্ত কাটা পড়ে একটি আস্ত বাংলাদেশ হয়েছে, পশ্চিম প্রান্ত উত্তর বিহার, অধুনা ঝাড়খণ্ড দখল করে নিয়েছে, উত্তরে আদি অস্ত্রাল আর মঙ্গোলিয়ান ভাষাভাষী মানুষের আধিক্য বেড়েছে ; কিন্তু এই ভৌগলিক ভূমির মধ্যেও, এই বৈচিত্র্যময় সম্প্রদায়, সংস্কৃতির মধ্যেও বাঙালি আছে, বিভিন্ন উচ্চারণের বাঙলা ভাষা আছে, সনাতন বাঙলার ঐতিহাসিক ঐতিহ্য আছে। আর আছে নানা জাতের, নানা ধর্ম ও বর্ণের সংমিশ্রণে একটি এমন মানুষের গোষ্ঠী যাদের আলাদা কোন জাতই নাই।"
ওই চায়ের দোকানে বসে খুড়া, মানে বুড়া সত্যখুড়া এই সত্যি কথাটিই বলতে চেয়েছিল। সে পুরাণো খবর কাগজের চপ মুড়ির ঠোঙা ছিঁড়ে ওই লেখাটি পড়েছিল, নিজের অভিজ্ঞতায় একেবারে অকাট সত্যি বলে মেনেও নিয়েছিল ; কিন্তু জুতমতো বলতে পারে নাই। কেননা ইস্কুলের লেখাপড়া তো সে শিখে নাই, তবে তার কাকার কাছে বাঙলা পড়েছিল দেদার। এমনকি রামায়ণ, মহাভারত, পাঁচালীর বই পড়তে পারত অনর্গল। তাই, ওই তল্লাটের --- পখন্না, পলাশডাঙা, লখিমপুর, রাঙাবেড়িয়া, এসকল গ্রামের বাউরী, বাগ্দী, দুলে, কলু, গোপ পাড়ার, এমনকি খাল পারের মুসলমান পাড়ার নিরক্ষর চাষা-ভুষাদের কাছে তার কদর ছিল দারুণ।
--- তাহলে শুন, সত্যখুড়া আরম্ভ করল, বছর সত্তর-আশির আগের কথা। তখন, এই যে এখানে বসে আছি আমরা, এই মজে-যাওয়া চর ছাপিয়ে একেবারে গাঁয়ের ধার পর্যন্ত বইতো দামোদর নদ। বাবা কাকাদের মুখে শুনেছি সেকালের রাক্ষুসে দামোদরের তান্ডবের কাহিনী। আর আমাদের, মানে 'ছুটু' লোকদের, ঘরবাড়ি ছিল সবই নদীর পাড় বরাবর। বর্ষায় ডুবত, ধ্বসে পড়ত, ভেসে যেত ফি'বছর।
এমনিই এক ভয়ঙ্কর বর্ষাকালের কালরাত ! সৎগোপ চাষী বাসু ঘোষের বৌ মরে গেল মাঝরাতে। পাশে তার দশদিনের ছাওয়াল, চিঁ চিঁ ডাকে ঠোঁট নাড়ছে মাঝে মাঝেই। দড়ির খাটের বাজুতে মাথা ঠুকতে ঠুকতে, দুহাত দিয়ে চুল ছিঁড়তে ছিঁড়তে শ্রান্ত হয়ে যখন সে মরা বৌয়ের হলুদ মুখের দিকে স্থির নজরে চেয়ে আছে তখনই আবারো চিঁ চিঁ। চোখ ফিরিয়ে দেখে আধ পাকা বেলের মতো সোনালী মুখে লাল ফুলের শুকিয়ে যাওয়া পাঁপড়ির পারা ঠোঁট দুটি নড়ছে।
ঘোর অমাবস্যার শেষ রাতে জয়চণ্ডী পাহাড়ের ঢালে মোষ বলি ! মোষের চারখানা পা বেঁধে জনা বিশেক লোক মিলে যখন তাকে খুঁটায় পুরে' তখন তার যে মরণ 'নাদ' সেই রকম আওয়াজ বার হোল বাসুর গলা থেকে। চোখে জল নাই। হাঁ মুখে শুকনা জিভ ওলটপালট করে বলতে লাগলো,
---- বাপ আমার....কি খেতে দিব রে তোকে....মরে যা বাপ, তুইও মরে যা !
বাইরে লক্ লক্ বিদ্যুৎ জ্বলছে, ঘন ঘন বাজ পড়ছে, সঙ্গে জল ঝরছে অঝোরে। ওদিকে দামোদরে হড়পা বানের গোঁগানী। পাড় ভেঙে এবার জল ঢুকবে ঘরে। 'কি করি রে ....কি করি... !' পাগল হয়ে গেলেই বোধ হয় ভাল হোত বাসুর। একবার বাইরে যায়, আবার ভিতরে ঢোকে। যতবার ভিতরে ঢোকে ততবারই কানে বাজছে চিঁ চিঁ ! তার ব্যাটা যেন বলছে,' মা আমার মরে গেল বাবা, তুমি খেতে দাও !'
না, এ রাত আর সকাল দেখবে না কোনদিনও !
যতগুলি শুকানো কাপড় ছিল ঘরে সবগুলি জড়ো করে ছেলেটাকে মুড়ে নিল বাসু। কোলে নিয়ে বার হোল সে। ডোম পাড়ার ধাই'মার ঘরে যখন পোঁছাল জল পড়া বন্ধ হয়েছে কিছু, ভোর হয়েছে। ধাই কেতকা ডোমনী উঠানের থৈ থৈ জল বাটি দিয়ে ছিঁচে ছিঁচে বার করবার চেষ্টা করছে।
----'দিদি গো' !
উৎকট সে ডাকে চমকে উঠল কেতকা।
উদভ্রান্ত, বীভৎস চেহারার বাসুকে দেখেই বুঝে গেল সে যা বোঝার,
----- আমি কিছু করতে পারব নাই গো, তুমি নিয়ে যাও, তুরন্ত নিয়ে যাও ভাই, যে ঘরে নতুন ছাওয়াল হয়েছে, সেই ঘরে নিয়ে যাও। এ ছেলের এখন বুকের দুধ চাই। এই বলে, ওই গাঁয়ে যে যে ঘরে, যে যে মা'য়ের সদ্য সদ্য ছাওয়াল হয়েছে তাদের ঘর ও ঘরের কত্তাদের নাম এক নিঃশ্বাসে বলে গেল কেতকা।
ছুটল বাসু। বাউরী, বাগ্দী, দুলে, কলু, এমনকি নিজের জাত গোপেদের প্রসূতি ঘরেও। দুয়ারে দুয়ারে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলতে লাগলো, 'ছেলেটিকে আমার বাঁচাও গো। এই হতভাগার মা আজ রাতে মরে গেল গো।'
এমন দায় নিতে পারবে না কেউ। একজন বেরিয়ে এসে চুপি চুপি বলে দিল, 'মোছলমানরা এমন ছেলে নিয়ে নেয়। ওদের পাড়ায় গিয়ে দেখ না।' মুসলমানদের পাড়া একটু দূরেই। খালের ওপারে। সেদিকে ছুট। কিন্তু থমকে যেতে হোল খালের পাড়েই। খালেও বান, উথালি পাথালি ঢেও। সাপের মত ফুঁসছে।
অচল হয়ে আসছে পা দুটো, অবশ হয়ে আসছে শরীর। ---- না, তোকেও বাঁচাতে পারলাম না রে বাপ। তুইও মা' য়ের সঙ্গে সঙ্গেই চলে যাবি। তোকে এই খালের জলে বিসজ্জন দিয়েই তোর মাকেও ভাসাতে যাব নদীতে। কাঠ নাই, পোড়াব কিসে ? ততক্ষণে তুইও পৌঁছে যাবি ; মা ব্যাটা দুজনেই দামোদরের কোলে .......!
আর দাঁড়াতে পারল না বাসু। কাঁপতে কাঁপতে বসে পড়ল সে। কোলের পুঁটলিটি দেখছে, আর ডুকরে ডুকরে কাঁদছে। এ কান্না কান্না নয়, ছিল রাজা সোমকের সন্তাপের হাহাকার !
চায়ের দোকানের ওই শ্রোতার দলটি একসাথে কান্নাভাঙা গলায় হো হো করে উঠলো,
---- আর বলো না খুড়া। সহ্য করা যায় না গো।
---- দাঁড়া, সবে তো আরম্ভ, এখন কত বাকি।
---- বাকি আর কি রইল ! ছেলেটিকে কি ওইভাবে ....জীবন্ত ... ? কৃষ্ণের জীব ! আমাদের পাড়া ছিল, বামুন পাড়া ছিল, --- -ওসব দিকেও গিয়ে দেখতে পারতো।
বলতে বলতে কেঁদেই ফেলল সুদামা বৈরাগী। বয়স অল্প কিন্তু ভক্ত মানুষ। এই কিছু দিন হোল সেও বাবা হয়েছে।
---- বেজাত, ছুটুজাতের ছেলেদের ছুঁয়ে ফেললে উঁচু জাতের লোকেরা তখন স্নান করত, তাদেরকে আবার ঘরে পালন পোষণ ! তাছাড়া ঘরের মালিক নিজের বৌয়ের বুকের দুধ কেন দিবে বেঘরের, বেজাতের ছেলেকে চুষতে।
---- ওই টুকুন বালশিশু, কৃষ্ণের জীব --- তার আবার জাত আছে নাকি ?
---- তোর ঘরে গেলে নিতিস ? চা ছাঁকতে ছাঁকতে জিজ্ঞাসা করল সনাতন ঘড়ুই।
রহিম চাচা দিল এক ধমক।
---- রাখ্ তো তোদের কচকচানি। এই সত্য, বল বল, তারপর কি হোল ?
দুই
---- হঠাৎই মন পাল্টে গেল বাসু ঘোষের। তাই কি পারে, বাবা হয়ে কি পারে জীবন-থাকা দশ দিনের ছাওয়ালকে বানের জলে ফেলে দিয়ে ঘরে ফিরতে ? বাবার বুকের মায়া ! কথায় বলেনা, মায়ের কান্নায় চোখে নদী, বাবার কান্নায় বুকে সাগর।
---- না বাবা না, না, তোমাকে এই খালে ফেলব না বাবা। চল, ঘরে ফিরে যাই। তোমার মরা মাকেও লিব, এক সঙ্গে তিন জনেই ঝাঁপ দিব দামোদরে। ততক্ষণে তুমি যদি মরে যাও। মর বাবা, মরে যাও আমার কোলেই।
টেনে তুলল অসাড় শরীর। কাদায় হড়কে গেল কিন্তু পুঁটলি বুকে চাপা। উঠল আবার। সকাল হয়েছে। কিন্তু তার কি। ঘরে মরা বো, কোলে আধমরা ব্যাটা। 'চল্ বাসু, সব নিয়ে দামোদর !'
---- কে, কে রে, বাসু নাকি ? কোথা গিয়েছিলি ? বীজতলা বিলকুল ডুবে গেছে ? বুকে কি ধরে আছিস ? মাছ নাকি ?
শ্যামসুন্দর রায়, বিপুল সম্পত্তির মালিক। জমি জিরেত, পুকুর বাগান। স্থাবর সম্পত্তি গ্রামের সবার চাইতে বেশী। অস্থাবর যে কত , তা নিয়ে নানা লোকের নানা জল্পনা,নানা কল্পনা। জমি-জমা করেছে সে কিছুটা হড়প করেই। যে যে বছর অনাবৃষ্টিতে ফসল মরেছে কিম্বা অতিবৃষ্টিতে, দামোদরের বানে ফসল ভেসেছে , সেই সেই বছরে তারা তার মরাইয়ের ধান ধার নিয়েছে। সময়মত সুদে আসলে শোধ করতে পারেনি বলে শ্যাম সুন্দর লিখিয়ে নিয়েছে তাদের জমি ; এমনকি বসতবাড়িও। বাসু ঘোষও তার বিয়ের সময় কিছু টাকা ধার নিয়েছিল, সুদসহ সোধ দিয়েছিল বৌয়ের একপদ গয়না বেচে আঘন মাসের আগেই। ভয়ে ভয়েই, কেননা শ্যামার নজর পড়েছিল তার সুন্দরী বৌয়ের উপরে। তখন থেকে এই শ্যামার সঙ্গে কোনরকম সম্পর্ক রাখতে চায়নি বাসু। বাসু ঘোষের চাইতে অন্তত বছর দশেকের বড় শ্যামসুন্দর চরিত্র দোষের জন্যও গ্রামের লোকেদের চক্ষুশূল। শুধুমাত্র ধনবান বলেই বাহ্যত সকলে মেনে নেয়, মেনে চলেও। সমাজের 'নীচুতলায়' তার কদর-আদরও আছে ; কেন না তাদের বিপদে আপদে সে 'অন্য' সুদে সাহায্য করে। অনেকেই বলে মুনিষ- মজদুরদের ঘরের দু' একটি বিটি ব্যাটা দেখতে নাকি তার মতোই।
ঘরে তার দুটো বৌ। বড়টি বাঁজা, ছেলে পুলে হয় নাই ; তাই আরো একটি এনেছে। তার আবার পর পর তিনটি বিটি। একটি সদ্য হয়েছে --- দিন পনের হোল।
বৌটি তো মরেছে, ছেলে নিয়ে সেও তো মরতেই যাচ্ছে। তবে এখন আর বাধা কি। আপন তো কেও নাই এই সারাটা গাঁয়ে। শ্যামাকেই বলে যাই শেষ কথা।
---- মাছ লয় গো, মর-মর দশদিনের ব্যাটা। বৌ মরে গেল কাল রাতে। ছেলেটিকে কেও নিতে চাইল নাই। চললুম দামোদরে --- শেষ গতি।
কিছুক্ষণ বিমূঢ়ের মত চেয়ে রইল শ্যামসুন্দর বাসু ঘোষের মুখের দিকে। তারপর হঠাৎই মাথা ঝাঁকিয়ে,
---- সর্বনাশ ! বলেই, বাসুর বুক থেকে ছেলে-মোড়ানো পুঁটলিটা নিজের বুকে চেপে দৌড়।
হতবম্ব বাসু পড়িমরি করে চলতে লাগল পেছনে পেছনে তার।
বিশাল তিনতলা দালানকোঠা। বাইরের বাহারি দুয়ার। দুয়ারের দুপাশে রোয়াক। টলমল পা'দুটোকে টানতে টানতে কোন রকমে শ্যামসুন্দরের ঘরের সদর দুয়ার পর্যন্ত নিয়ে এসে বাসু ঘোষ বসে পড়ল রোয়াকে। --- 'ছেলেটিকে কি করবে শ্যামসুন্দর ! না আর কিছুই ভাবতে পারছি না।'
---- শোন্ বাসু, (চমকে উঠল বাসু, এতক্ষণ মড়ার মত পড়েছিল) ছেলেটিকে দু চামচ জল খাইয়েছে ধাইমা। ছেলে খেয়েছে। এখন তোর বৌদি বুকে নিয়েছে, চুষছেও। ধাইমা আঁতুর ঘর থেকে বাইরে এসে বলে গেল ছেলে বেঁচে যাবে, তবে খুব দুর্বল। আমি শহর থেকে ডাক্তার আনাব আজকেই। ছেলেটিকে বাঁচাতে যা করার করব।
বাসু ঘোষ শ্যামসুন্দরের পায়ে মাথা দিয়ে লম্বালম্বি পড়ে রইল।
---- ওঠ ওঠ, এই নে, হাত খোল্ ।
ধুতির কোঁচড় থেকে একটা ছোট গেঁজিয়া (থলি) বার করে এক মুঠো সিটি, আধূলি, টাকা বাসুর হাতে ফেলে দিয়ে বলল,
---- যা, বৌয়ের সৎকার কর্ গিয়ে।
আর শোন্ বাসু, তোর ছেলেকে যে আমার ঘরে এনেছি, এ কথা কাউকে, কোন দিনও বলবি নাই। বলবি, ছেলেও মরেছে, তাকে পুঁতে দিয়ে এসেছি দামোদরের পাড়ে। শপথ কর্ আমার পায়ে ধরে।
---- তুমি বামুন, ছেলের জীবন দাতা --- পয়সাগুলি একপাশে ফেলে দিয়ে --- এই তোমার পায়ে হাত দিয়ে দিব্ব করছি ঠাকুর, ছেলের সুলুক এ জীবনে কাউকে দিব নাই, দিতে পারবোও নাই। তবে ওই পুঁতে দেওয়ার কথা বলতে বোল না। ওটি পারবো নাই ঠাকুর, পারবো নাই.....। কথাগুলি বলতে বলতে, পয়সার দিকে দৃষ্টিপাত পর্যন্ত না করে' , বেসামাল পরণের কাপড়টাকে কোনরকমে কোমরে জড়াতে জড়াতে চলে গেল বাসু ঘোষ, বড় রাস্তা ধরে নয়, ঘরের পেছনে কাঁটা ঝোঁপের ভিতর দিয়ে, যেন আর কারো নজরে না পড়ে, আর কাউকে কিছু বলতে না হয়।
শ্রোতার দলটি, নিশ্চুপ, নির্বাক। করিম চাচার চোখের জল তো তার ছুঁচলো দাড়ির ডগা বেয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ছে।
আর সেই তখন থেকে, যখন বাসু ঘোষ দুয়ারে দুয়ারে তার আতুর ছেলের জীবন-ভিক্ষা চেয়ে চেয়ে ফিরছিল, তখন থেকেই সুদামা হাতদুটি জোড়া করে প্রণামের ভঙ্গিতে কি যে বিড় বিড় করে চলেছে।
সত্য খুড়া বিড়ি ধরিয়ে, গোটা দুই বড় বড় টান দিয়ে বেশ আবেগঘন উচ্চারণে বলে উঠল,
--- ওই ছেলেই রায় বাড়ির বংশধর, স্বনামধন্য রাখহরি রায়। তার থেকেই আজ তাজপুরের এত বড়, এত নামকরা রায় পাড়া। এবার বল, কি জাত তারা ? কিইবা বা গোত্র তাদের ?
কারো মুখে রা নাই। চা-দোকানি সনাতন আবার একবার চায়ের কেটলি গরম করতে উনানে চড়িয়ে, একটি দীর্ঘ দীর্ঘশ্বাস ফেলে, সত্য খুড়ার দিকে চেয়ে বেশ কাতর হয়েই জানতে চাইল,
---- তোমার আগের বুড়াদের শুধাও নাই, বাসু ঘোষের কি হোল ?
---- সেটি গাঁয়ের লোক জানতে পারে নাই। কেউ বলেছিল দেশান্তরী হয়েছে। আবার কেউ কেউ মনে করেছিল, এক রাতের মধ্যে বৌ আর ব্যাটার মরণ শোক সহ্য করতে না পেরে তাদের সঙ্গেই নিজেকেও দামোদরের বানে বিসর্জন দিয়েছে বাসু।
সমাপ্ত
দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
৩রা অক্টোবর, ২০২২
ব্যাঙ্গালোর।
____________________________________________
অসাধারন
উত্তরমুছুন