বৃহস্পতিবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

মানসী (ছোট গল্প )

মানসী 

 কবিতা তো অনেক হোল। এবার একটি ছোট গল্প হয়ে  যাক্। স্মৃতিচারণা -- বার্ধক্য-বিড়ম্বিত জীবনে, দ্বিপ্রাহরিক অলস প্রহরগুলি কাটাতে নিষ্কলুষ অবলম্বন -- ফেলে আসা দিনের স্মৃতি। সারাটা বর্ষাকালে  মালিকের ফরমাইশমত মই -লাঙল বেয়ে, শরতে ছাড়া পেল চাষীর বলদ ; তারপর নব-অংকুরিত তৃণদলে  উদরপূর্তি করে, গাছের ছায়ায় বসে যেমন জাবর  কাটতে থাকে, তেমনি হোল বুড়াকালের স্মৃতিরোমন্থন ।  

--------------------------------------------------------------------------

মানসী  


"Till then I wandered careful and comfortless  
In secret sorrow and sad pensiveness."  
         Edmund Spenser -- Sonnet 34.  


এখন অনুগল্প, পরমাণু যুদ্ধের -- থুক্কুম্বা --পরমাণু গল্পের যুগ। এই ধর, তুমি চারচাকা বা দু'চাকায় ছুটছ, 
তেষ্টা পেয়েছে, সময় নষ্ট করার মতো সময়ও নেই হাতে।
চোখে পড়ল, রাস্তার ধারে বিক্রি হচ্ছে আঁখের রস। ক্ষণিক থামা, এক গেলাস রস গেলা, আবার 'হুস'! 
কিন্তু আমরা যখন (অর্ধ শতাব্দী আগেকার সে কথা)    আঁখের রস খেয়েছি তখন আঁখ পেড়ানো হোত  আঁখশালে, গরু বা কাড়া-টানা আঁখপেষা কলে। আঁখের লাঠি ঢুকতো একটা-দুটো, রস গড়াতো ঝির ঝির, টোপ টোপ, গ্রামের ভেতো, হাভাতে ছেলেগুলো দাঁড়িয়ে থাকতো দূরে ; বটপাতা, শালপাতার দোনা হাতে নিয়ে । কখন মালিক ঘটিতে রস নিয়ে আসবে, দেবে একটু একটু। রসের সঙ্গে সরস বাখানও।  
এমনই এক আঁখ মাড়ানো কলের কাছে, ওই যে‌  বললাম, বছর পঞ্চাশেক আগে, সতের আঠারো‌  বছরের একটি ছেলে, এই আমি, দাঁড়িয়ে ছিলাম  ভরতপুরের সরাণ পুকুরের পাড়ে, বিপুলদেহী‌ বটগাছের  শালবল্লির মতো একটি ঝুরিতে (এমন ঝুরি ‌কত যে ছিল -- গুনতে গেলে মাথা ঘুরে যাবে) হেলান  দিয়ে ওই আঁখশালের দিকে তাকিয়ে রয়েছি একাগ্র। দেখছিলাম সেই বিলম্বিত লয়ের কর্মকান্ড আর‌ রসপিপাসুদের প্রলম্বিত প্রতীক্ষা। আজ প্রথম দিন‌ এমন নয়। আজ তৃতীয় দিন। গরুর গাড়ি ঠাসা আঁখ‌ আছে, কাস্তে দিয়ে ঝাড়াই হচ্ছে, কলের মুখে বসা‌ একজন, তার কাছে বোঝা বোঝা জড়ো হচ্ছে। সে আঁখের দাঁড়ি কলের মুখে ঢুকিয়েই চলেছে, রস গড়িয়ে জমা হচ্ছে মাটিতে আধপোঁতা এক প্রকান্ড জালায়। সেখান থেকে বালতি বালতি তুলে ঢালা হচ্ছে বিশাল এক কড়াইয়ে। গূহামুখের মতো উনুন, আগুন জ্বলছে 
 দাউ দাউ, রস ফুটছে, গুড় হচ্ছে। গন্ধে ভরে উঠেছে  চতুর্দিক। আমার যেন ঘোর লেগেছে -- দেখেই চলেছি ,  চোখ ফেরাতে পারছি না।  
 
হটাৎই সেই মোটা গুঁড়ির পিছন থেকে একটি ‌
মেয়ে-হাত, হাতে ধরা ঘটি, ঘটিতে সফেন টলটলে ‌রস। 
চমকে উঠে মাথা ফেরাতেই দেখি ছিপ ছিপে এক   কিশোরী। ঘটি হাতা ফ্রকের মতো পিরান, আবার  গামছা পরার ধরণে কাপড়, যার আঁচল গোটানো অবস্থায় কাঁধের উপর ঝোলানো। আমাদের চিত্তরঞ্জনে  এমন অদ্ভূত পোশাক দেখিনি। এমন মেয়েও। তা সে‌ ঘটি ধরে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে রয়েছে আমার দিকেই ।‌ গোল মুখ, বড় বড় চোখ ঝাঁকড়া চুল --মুখের দুপাশে  ঝুলে রয়েছে কাঁধ পর্যন্ত। হাসছে আর ওই ঝাঁকড়া  চুলওয়ালা মাথাটি উপর নীচ দুলিয়ে যেন বলতে  চাইছে..."খাও" ।  
আমি কিছুটা ঘাবড়েই গিয়েছি, আর তার ওই বিশাল  চোখ দুটির উপর আমার চোখ আটকে রয়েছে ।  কিছুক্ষণ পর হঠাৎই ধমক দিয়ে উঠল মেয়েটি ,  
--- কতক্ষণ ঘটি ধরে দাঁড়িয়ে থাকব ? খেয়ে নাও। কেও  এনে দেবে না এমন করে, এখানে পাতার ঠোঙা নিয়ে  দাঁড়াতে হয় ।  
--- আমি তো রস খেতে আসিনি ।  
--- উঁ, রস খেতে আসিনি তো ! ঠোঁট উল্টে ভেংচি  কাটছে আর বলছে , --এমনি এমনি দাঁড়িয়ে আছো ?  
কালও ছিলে, ছিলে না ?  
--- কাল তুমি আমাকে দেখেছিলে ?  
---হুঁ , দেখেছিলাম তো। আমি রোজ আসি। এখন  আমাদের আঁখ পেষাই হচ্ছে। আমি এক ঘাঁটি রস 
খাই। আর এক ঘাঁটি নিয়ে যাই --মা খায়। আজ ভাবলাম। তোমাকেও দিই, কাল থেকে হ্যাংলার মতো দাঁড়িয়ে আছ। ধর ঘটী, আমার হাত ধরে গেছে না ?  
অগত্যা ঘটিখানা নিতেই হলো। কিন্তু খাবো কি করে ?  উপরে তুলে খাওয়া অভ্যেস নেই ।  
বুঝে গেলো মেয়েটি বলে উঠলো ,  
--- চুমুক দিয়েও খাও। 
যেই না মুখে তুলে চুমুক দিয়েছি অমনি খিল খিল হাসি‌ ।  আমি খাওয়া বন্ধ করতেই আবার হাসি --হাসতে হাসতে‌ লুটিয়ে পড়ে, এমন তার অবস্থা। কোনো রকমে হাসি চেপে বলে উঠলো ,  
--- আমার দাদুর মতন বুড়া লাগছে ।  
বাঁ হাত মুখে দিতেই বুঝতে পারলাম রসের ফেনা   লেগেছে নাকের নীচেই --সাদা গোঁফের মতো দেখতে  ‌  লাগছিলো হয়তো ।  ‌ 
--- ফেনা মারতে জানো না ?  
আমি মাথা নাড়লাম -- না ।   
---দাও আমাকে ।   
ঘটি দু'হাতে ধরে ফুঁ দিয়ে অদ্ভুত কায়দায় ফেনা সরিয়ে,  আমার হাতে দিয়ে ,  
--- নাও , এবার খাও ।   

                          দুই 

সদ্য-পেষা, তাজা আঁখের রসের যে কী স্বাদ বুঝলাম  সেদিন। ভরা -ঘটি খেতে পারিনি , কিছুটা রেখেই  ঘটিটি  দিলাম তার হাতে। সে অবিচল দাঁড়িয়ে, নিষ্পলক দৃষ্টিতে দেখেই চলেছে আমাকে এখন আর চপলতা নেই। শান্ত,  ঔৎসুক্য-গাঢ় কন্ঠস্বরে জিজ্ঞাসা করল, 
--- ঘর কোথা তুমার ? কাদের ঘরে এসেছো ? 
বললাম সবই। ভাব এমন দেখালো যেন সব ঘরই তার দেখা আছে, সব পাড়াই তার জানা, গ্রামের প্রতিটি  মানুষই তার চেনা। তারপর বেশ জোরের সঙ্গে বলে  উঠল ,  
--- টিক আছে, আবার কাল আসবে, গুড় খাওয়াবো ।  আসবে কিন্তু , না এলে না..... হেসে ফেলল ।  
ততক্ষণে আমি অনেকটাই সহজ হয়ে গিয়েছি।  তবু  একটু গম্ভীর হওয়ার চেষ্টা করলাম। শুধালাম ,  
--- তোমার নাম কি ?  
--- আমার নাম পদ্ম । সবাই পদিবুড়ি বলে ডাকে ।  
--- কেন ?  
--- আমি বুড়িদের মতন কথা বলি --তাই। তুমি আমায়  এমন বলবেনা-- তা বলে' ...। আবার হেসে 
উঠল ।  
--- আমি তবে কি বলবো--পদ্ম ?  
--- না , তাও বলবে না।  তুমি পদ্মরাণী বলবে ।  
--- কেন ?  
--- আমি তোমাকে ভালোবেসেই তো রস দিয়েছি, আমি তুমার বউ হব যে ... বলেই দৌড়, আঁখ শালে গিয়ে  নাচতে লাগলো, হয়তো চিৎকার কোরে রসই চাইছিল ।‌  হুঁ তাই, ওই যে -- এবার ঘটি নিয়ে ছুটছে।   
যতদূর দেখা যায় চোখ দুটিকে ছোটানোর চেষ্টা করে  চলেছি আমিও ...না:, আর দেখা যাচ্ছে না ! হারিয়ে  গেল ! গাছ-গাছালির ফাঁক ফোঁকর দিয়ে ঘন  বাঁশঝাড়ের ভিতরে ! নাই ! আমি ফিরে এলাম ঘরে ।‌ দিদির ঘরে। 

দিদির ঘর। ভরতপুর গ্রাম, বর্ধমান জেলায়। বর্তমানে    পূর্ব বর্ধমান। পানাগড় স্টেশন থেকে মাইল আটেক  দক্ষিণে, দামোদর নদের তীরেই। হাঁটা পথ , সুদূরপ্রসারী ধান জমির আল ধরে। দিদির ঘরে দিদি,  জামাইবাবু আর দশ বছর বয়সের ভাগ্নে সুবল। সে  এখন স্কুলে। গ্রামেই তার স্কুল। আমি এগারো ক্লাসের‌  'ফাইনাল' পরীক্ষা দিয়ে চিত্তরঞ্জন থেকে এসেছি দিদির  বাড়িতে। আগেও এসেছি বহুবার, থেকেছি অনেক দিন  ধরে ; কিন্তু এই প্রথম বার ঘরের বাইরে, গ্রামের শেষে  নদীর ঘাটে , মাঠে হাটে, পুকুর পাড়ে, একা একা,  কখনও বা সুবলকে সঙ্গে নিয়ে ঘোরা ।  

দিদির কাছে ঘটনাটি বললাম না ।  
কেন জানিনা, বলতে গিয়ে বাধ বাধ ঠেকল। কিন্তু  মনের মধ্যে কিরকম যেন হতে থাকল। আনন্দের ভাব, চমকে চমকে ওঠার মতো শিহরণ। কেবলি মনে পড়তে  লাগলো ওই আঁখশাল, ওই রসের ঝির ঝির স্রোত, গুড়‌  ফোটার গন্ধ মাখা চৈত্রমাসের বাতাস, ওই রসে-ভরা,  ফেনা-ওঠা ঘটি আর পদ্মরাণী, শব্দটি মনে মনে  উচ্চারণ করে অজান্তেই এদিক ওদিক চেয়ে দেখছি ,  লজ্জা লজ্জা একটি সঙ্কোচ ! চোখ দুটি মনে পড়েছে  তার আর মনে পড়েছে ওই হাসি। আমি শহরে বড়  হয়েছি ; কিন্তু মেয়েটির কাছে অপ্রস্তুত মনে হচ্ছিলো  নিজেকে। এক বিন্দু লজ্জা -শরম নেই। বিদ্যুতের  আলো ওই বীজন গ্রামদেশে তখনও ছিল স্বপ্নের। সন্ধ্যা  হোতেই অন্ধকার নামতো মা কালীর রঙের 
মতো‌। দিদি রান্নাঘর থেকে মাঝে মাঝেই তাড়া দিতো , 
---আই, খেয়ে নিবি। দেবু , সুবল আয়, হ্যারিকেনে তেল থাকবে না। রেশনে কেরোসিন নাকি এ মাসে আসে নি। 
কাজেই শুয়ে পড়তেই হয় সন্ধ্যা গড়াতেই। শুয়ে পড়িও।  অন্য দিন ঘুমিয়েও যাই অঘোরে। আজ কিন্তু চোখে ঘুম নেই।  ছবির মতো মনের মধ্যে ভেসে ভেসে উঠছে আঁখশাল। বটগাছের তলা  আর পদ্ম  ...না , না  ...পদ্মরাণী  রাত্রিটা কাটলো আধো ঘুম ,আধো তন্দ্রাচ্ছন্নতায় । মাঝে মাঝেই উঠে বসেছি, জানালায়  চোখ রেখে দেখেছি আকাশ ফর্সা হোল কি না ।  প্রতীক্ষার অবসান , সামনের বাঁশ ঝাড়ে হাজার‌  চড়াইয়ের কলরব। জামাইবাবু ভোরবেলায় রেডিও‌ চালিয়ে দেন রোজ। সুন্দর গান বাজছে ," নূতন 
প্রভাত‌, জাগো সময় হলো"। মা আমার গান করে, আমাকেও চেষ্টা করে শেখানোর। আমার ভালো লাগে   না। এখন মনে হচ্ছে, শিখলে ভালো হোত । আজ  আবার যখন  দেখা হবে , একটা গান তাকে শুনিয়ে‌  অবাক করে‌ দিতাম ! ইস্, কী ভাবছি এ সব !   
 – দেবু, জামাইবাবুর ডাক, – ওঠ , তৈরি হয়ে নে‌ তাড়াতাড়ি, আজ তোকে নিয়েই বেরোব...।  



                         তিন  

আমাকে নিয়ে জামাইবাবু কোথায় বেরোবেন ? আমি আঁখ শালে যাবো যে ! মনে তীব্র উদ্বেগ নিয়ে উঠে  
এলাম । দিদি তখন তুলুসী তলায় গোবর মাড়ুলী দিচ্ছে ।   জামাইবাবু দিদিকেই উদ্দেশ্য করে বলছে , 
---শুনছো , আজ দেবুকে নিয়েই রনডিহার হাটে যাবো । 
--- অতখানি দূর , হাঁটতে পারবি দেবু ? 
---খুব পারবে , ইয়াং ম্যান । 

আমি চুপ। মনে হলো সূর্যটা ডুবে যাক্। আবার সন্ধ্যে হোক। তা হোল না , কিন্তু আমার চোখের সব আলো যেন নিভে গেলো। যাবো না যে , কিন্তু কেন ? তার তো কোনো উত্তর নেই। একবাটি মুড়ি খেয়ে জামাইবাবুর পিছন পিছন চলতে থাকলাম ওই আঁখশালের ডান দিক দিয়েই , তবে বেশ কিছুখানি দূরের ব্যবধান , লোকজনও দেখা যায় , চেনা যাচ্ছে না । না , না , এতো সকালে সে আসে নি। নদীর পাড় বরাবর মেঠো পথ , মাঝে মাঝে গ্রাম , ছোট ছোট বন, দিগন্তের সীমা ঘেরা প্রান্তর, গরু-মোষের পাল। শাঁখ সাদা বকের ঝাঁক , উড়তে উড়তে এসে বসলো মাঠ যেখানে নদীর চরটিতে মিশেছে ঠিক 
সেখানটিতে । ভালো লাগছে খুবই , কিন্তু মন উড়ে যাচ্ছে সেখানেই, সেই সে সরাণ পুকুরের পাড়ে, বটগাছের তলাটিতে। রোদ বেশ চড়া হোল, চৈত্র মাসের রোদ, সঙ্গে এলোমেলো হাওয়া, ঠিক এই সময়েই তো গতকাল সে এসে গিয়েছিল। এতক্ষণে সে এসেছে‌ হয়তো। খুঁজছে আমাকে কী। ওই বড় বড় চোখদুটি  নিয়ে ? আমি যদি বক হয়ে যাই ! দূর ! আবার সেই চিন্তা ! যাগ্গে, কাল সকালে তো দেখা হবেই ।  
রণডিহার হাট এসে গেল। এতো দোকান, এতো  শাকসবজি, ফলমূল, এতো লোক, এমন কোলাহল ,  কখনো না দেখেছি, না শুনেছি। জিনিসপত্র কেনা হোল,  চপ জিলিপি খাওয়া হোল। ফেরার পথে কেন 
যে আমারি এতো তাড়া। জামাইবাবু কেন যে এমন ধীরে ধীরে হাঁটেন ! শেষে কিনা তাই হোলো, বেলা ডুবেই  গেল ঘরে ফিরতে। আবারও একটি দীর্ঘ রাত্রির  
প্রতীক্ষা। অতখানি দূর, অতটা পথ হাঁটা অভ্যাস নেই,  ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। প্রথম দিকটায়, কিন্তু  ঘুম  ভেঙে গেল মাঝ রাত্রে। অন্ধকার যেন কাটাতেই চায়না। 

একসময় রাত ফুরাল, সকাল হোল। আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতেই হবে। কেননা এত সকালে তো সে আসবে না। রোদ একটু চড়া হোতেই, বেরিয়ে গেলাম । কোন দিকে না তাকিয়ে সটান গিয়ে দাঁড়ালাম গিয়ে ওই  আঁখশালে, ওই বটগাছটির ওই ঝুরিতে, ওই ভাবে হেলান দিয়ে। তাকে যেন আর খুঁজতে না হয়। সেকি ! 
কোথায় সে ? 
বেলা বাড়ছে, বাড়তে বাড়তে সূর্য মাথার উপর, দুপুরবেলা, তাও পেরিয়ে যায় যায়। তবে কি সে আসে  নি ? শরীর খারাপ.হোল না তো ? ঘরের মানুষ, বন্ধু, কাছের মানুষদের জন্যও এমন উৎকণ্ঠা কোন দিন হয়নি আমার। পদ্মরাণী, কোথায় তুমি ? তার খবর জানার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছি। ছোট ছেলেদের একটি ছোট দল, বোধহয় রস খেয়ে নিয়েছে, আমার সামনে দিয়ে ফিরে যাচ্ছে । আমি থাকতে না 
পেরে , তাদেরই একজনকে হাতছানি দিয়ে ডাক 
দিলাম। 

(গল্পটির শেষের অংশটি )

---পদিদের গুড় কাল উঠে গেছে। আর আসবে না। কে  ওকে রস দেবে ? কাল ও কাউকে গুড় দেয়নি।  
আরেক জন বলল , 
--- নিজে এক দোনা গুড় নিয়ে এইখানে দাঁড়িয়ে একা একা খেয়েছে। 
অন্যজন ,
--- না না, দোনায় গুড় নিয়ে কাঁদছিল। খায় নাই। 

'জীবন নাট্যের সেই স্থান, কাল, কুশী-লব ; অস্ফুট 
কথা, অর্থহীন ব্যাকুলতা, নিষ্কলুষ আবেদন, নিষ্ফলা প্রয়াস, সকরুণ পরিণাম – প্রবেশ-প্রস্থানের তোরণদ্বার- সমন্বিত, জীবন প্রভাতের অমল রৌদ্রকরোজ্জ্বল  ক্ষণকালের সেই রঙ্গমঞ্চটি ফেলে এসেছি আজ থেকে  পঞ্চাশ বছর আগে। বুকের ভিতরের স্থায়ী মঞ্চটিতে  একান্তে বেজে চলেছে কখনো ইমন রাগে সানাই,  কখনো বা মাড়োওয়া-য় বাঁশী । কেনই যে পাওয়া , 
কেনই বা হারিয়ে যাওয়া !' 
নাট্যগুরু শেক্সপিয়ারের 'কিং লিয়র' নাটকের মতো ,  জনান্তিকে-য়ের স্বগতোক্তির মতো আপন মনে আওড়ে  বোতলের Last lees টুকুও গলায় দিলাম ঢেলে ! 

---বুঝলাম, আমার সাঙাৎ কেন কাব্যি করে' আর 'মধু' খেয়ে জীবনটা দিল কাটিয়ে । 
অখিল এরকম রোজই বোঝে আর রোজই বলে । ঘোরের কথা নয়, এ হোল বন্ধুত্বের জোরের কথা । 

হ্যাঁ, অখিল আর আমি দুই বন্ধু, কাঁচড়াপাড়া রেলকারখানা থেকে অবসর নেওয়ার পর থেকে কারখানার পিছন দিকের গেটের ঝুপড়িতে বসে' পরাণের গল্প করতে করতে ওই একটু আধটু পান - 
টান করে', যে যার ঘরে ঢুকে পড়ি আরকি ! অবসর নেওয়ার আগে থেকেই এই রেল শহরেই এক কুঠুরি 
ঘর ভাড়া নিয়ে আছি। ওই ঘর আর এই ঠেক। 
আমার জগৎ সংসার এই গন্ডীর মধ্যেই আবদ্ধ। 
মা-বাবা, দিদি- জামাইবাবু, এঁরা সবাই জগতাতীত ,  আর রক্তের সম্পর্কের যারা, তারা আমার জীবন ও সান্নিধ্য থেকে বহুদূরে আত্মনির্বাচিত স্থানে আত্মনির্বাসিত। ঠেকের বন্ধু তো ঠেকেই। 
ঠেকে মিলন বিরহ নাই। 

আমি একা। 
দিনের বেলা পরিবর্তিত, বিবর্তনীয় সমাজের, চলমান জনতার অরণ্যের মধ্যেও একা। কিন্তু রাত্রিবেলা   আমরা দুজন। আমি আর পদ্মরাণী। কোন্‌ সুদূর অতীতে ফেলে আসা সেই সরাণ পুকুরের পাড়, সেই  শতঝুরি বট গাছ, ডাগর দুটি চোখ, অনাবিল সেই  চাহনি, ঘটিভরা আঁখের রস, আর সেই মধুমাসে  মধুমাখা কথা, 
"কাল এসো, গুড় খাওয়াবো ।" 
 এসব যদি নেশার ঘোরে ভুলে যাইও কখনোও বা,  ভুলতে পারি না, 

---"গুড় খায় নাই, দোনায় গুড় নিয়ে কাঁদছিল ।" 

                       সমাপ্ত

(গল্পটি সংক্ষেপিত আকারে একটি পত্রিকায় , 'নীল পালক'  প্রকাশিত হয়েছে। এখানে পান্ডুলিপি থেকে মূল গল্পটি দেওয়া হোল ।) 
দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় 
২০/০২/২০২২ 
ব্যাঙ্গালোর ।





২টি মন্তব্য:

Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...