বড় শহর । ভূমির নিম্নতল নরক --ক্লেদ, বিষ্ঠা, বিষাক্ত পাঁকে দান্তে সাহেব বর্ণিত নরক (Inferno), ভূতল -- সংশোধনাগার (Purgatory), ভুলের প্রায়শ্চিত্য-ভূমি, যান ও জন প্লাবনের বৈতরণী পারাপার, তার উপরে ভাসমান, মলায়ানিল দোলায়িত স্বর্গপুর (Paradise) -- সুউচ্চ আবাসন, তার কোটরে কোটরে 'সুখ , শান্তি , ঐশ্বর্য , নিরাবলম্ব একাকীত্ব।' এই স্বর্গধামের জনৈকা নিবাসিনী , (নব)পরিণীতা রুক্মিনী। বর, মা-বাবার বহু সাধনার ধন, কৃষ্ণ সমতুল নির্নিমেষ, তার ভাগ্য-রথের সারথি। পঞ্চম বিবাহ বার্ষিকী আজ, ফুলের তোড়া একটি আনবে হয়তো 'নিমেষ', যদি মনে থাকে। এখনো নিঃসন্তান, এই সন্তানহীনতা আরোপিত। 'নিমেষের' ডাক আসছে বিদেশ থেকে বার বার। যেতে হবে অন্য কোথা, অন্য কোন খানে, সাগরের নীল জলে ছায়া ফেলে অলকাপুরীতে। সেথা শুধু আলো।
নাই ঝিঁঝিঁর ডাক, নাই নাই সুশীতল শান্ত অন্ধকার।
বিশ্বমারী, তাই বিলম্বিত। স্বপ্ন ছিল, একটি আঁষটে গন্ধের উলঙ্গ, জীবন্ত পুতুল। এখন ? চিড়-ধরা কাঁচের বাসন-- হাহাকার অন্তরজুড়ে। নিজের বাবা বলে, 'সৌভাগ্যবতী', শ্বাশুড়ী বলেন, 'নির্জলা শিবরাত্রী করার ফল।'
সে ফলের স্বাদ সবার একই রকম, তা কিন্তু নয়। গল্পটি ব্যতিক্রমীও হতে পারে , আবার 'সত্যি' হয়তো অনেকের কাছেই, যাদের অন্তরের পাখী ডানা মেলে যেতে চায় ফেলে-আসা ইছামতীর পাড়ে।
"পল্লব প্রান্তটুকুই ঈশ্বরের দেওয়া যার একমাত্ৰ ঠাঁই , ঐশ্বর্যের মরুভূমিতে তাহাকে জিয়াইয়া রাখিবে কি করিয়া ?--শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, (গৃহদাহ ) ।
"হেতায় বৃথা কাঁদা দেয়ালে পেয়ে বাধা
কাঁদন ফিরে আসে আপন কাছে। "
('বধূ'-- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)।
আকাশ নীড়
-----------------
নির্মেঘ নীলাম্বর ,
অনুজ্বল এখনো ঊষার আলো।
বিরাট শহর, আকাশে মাথা তুলে'
সংখ্যাতীত ঘর।
ঘর বলি', নাকি বলি নীড় ?
মাটি ছেড়ে শূণ্যে ভেসে থাকা,
ওঠা আর নামা,
যন্ত্র বিকল হোলে মাঝে মাঝে থামা,
টুকরো এক বারান্দায় ক্ষণিক দাঁড়ানো।
দূরতর দিগন্তে তাকানো ; প্রতীক্ষা, না কী
নির্জনতার ভীতি থেকে মুক্তির 'যন্ত্রণা' ---
জানি না তা, রাতের অফিস-ফেরা একটি মানুষের,
ক্লান্ত প্রত্যাবর্তনের ।
হঠাৎই পড়লো চোখে কাশফুল-রঙ পায়রা একখানি --
প্লাস্টিকের টুকরো নিয়ে মুখে, বসলো এসে
সামনের সে আবাসনের জানালার কোণে।
কোথায় বাঁধবি বাসা ওরে !
যা, চলে যা উড়ে দূরে, ওই দূরে -- সুখপুরে,
আমার সে গ্রাম। শতেক নদী আর সতের পাহাড়
হবি পার, তারপর এক নদী, নাম ইছামতী।
এপার ওপার বন, দিগন্ত প্রসারী মাঠ,
তারপর বাঁশঝাড় ঘেরা গাঁ -- নাম লীলাবতী।
সাত পাড়ার পল্লী সেটি, মাঝে হরিসভা ,
তারও পূবদিকে, পাঁচ-ডানা উড়ানেই
আমাদের ঘর, ছায়া ঢাকা, মায়া ভরপুর।
তিন চালা ঘর, আছে খিড়কী পুকুর,
তাল সুপারি আর আম গাছে ঘেরা
বিশাল উঠানে আছে ধানের যে গোলা,
সেখানেই পেয়ে যাবি আপনার জন।
হাজার সঙ্গী পাবি তোরই মতন।
বকাবকি করে বটে মা, পিসীমা ;
কুলো ভরা সোনা ধান দিবে ঠাকুমা।
মুড়ি চিঁড়ে ? তাও পাবে, ভাই বোন যে ছড়াবে --
যত পারো খুঁটে খুঁটে সেও তুমি খাবে।
যাও ভাই, চলে যাও থেকো না এখানে।
ভিখারী বাঁচেনা সখি, সম্পদ -শ্মশানে।
এখানে হয়তো পাবে থাকার কোণা,
ডাস্টবিনে পেয়ে যাবে খাবার কণা,
বর্ষায় ভিজবেনা নিদাগ ডানা,
কিন্তু তবুও, আমি বলি বার বার,
এই ইন্দ্রপুরী নয় তোমার, আমার।
এখানে উর্বশী থাকে, থাকে মেনকারা,
হাসিমাখা মুখ নিয়ে থাকে 'বেদনারা',
এখানে অপার আছে ভোগ, উপভোগ,
এখানে মলমে ঢাকা শত শত রোগ,
বৃন্ত-কাটা গোলাপের বিষন্ন নিঃশ্বাস,
ঘরময় খোঁজে হায়, 'কোথায় বিশ্বাস' !
হীরা নয় ,কাঁচঘরে রয়েছি রে পাখী,
ঝড় এলে সার হবে শুধু ডাকাডাকি !
যাও যদি, খুঁজে নিও মা'টিকে আমার
বুঝে নিবে দেখে তুমি চোখ দুটি তার।
শান্ত নয়ন দুটি জলে ছল ছল,
হয়তো আমারই কথা ভাবে অবিরল।
হয়তো তোমাকে ডেকে কয়ে দিবে মা,
'দুটো দিন তোর ডানা ধার দিয়ে যা।
উড়ে যাব, ওরে পাখী, দেখে মেয়েটাকে,
ফিরে এসে এক কুলো ধান দিব তোকে।'
স্বর আর সরে না রে, যা তুই যা ---
হৃদয় ভাঙার আগে ফিরে যা রে গাঁ।
(পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত)
দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
(০১-০২-২০২২)
২৮-০৩-২০২৩
ব্যাঙ্গালোর ।
_________________________________
Super like
উত্তরমুছুনভাস্কর বোস- দুর্দান্ত একটি কবিতা পড়লাম দাদা। আমি সত্যিই অভিভূত হয়ে গেলাম।।
উত্তরমুছুন