________________
হাজার হাজার বছর–কবেকার সে কথা,
কথা কি, কাহিনীও বলতে পারো তুমি।
রামের রাজত্ব ছিল আ-সমুদ্রহিমাচলে,
এমন কি সমুদ্রপারেও, দ্বীপে দ্বীপান্তরে
রামের মূর্তি আছে, আছে রামায়ণ গাথা।
সকলের প্রিয় রাজা সবাকার হৃদিরত্নধন,
আচণ্ডালে সমভাব, ধর্মপ্রাণ, প্রজানুরঞ্জন।
"নীলাঞ্জন মূর্তি তাঁর, নীলোৎপল আঁখি।
আনন্দে বিচরে লোক "রাম রাম" ডাকি।।"
কিন্তু সীতা ? পত্নী তাঁর, বার বার পরীক্ষার মুখে,
শুধু দিতে হবে প্রামাণ্য সাবুদ, 'আমি সতী' !
জন্ম রাজকুলে, যুবরাজ্ঞী, নবপরিণীতা।
তবু তুচ্ছজ্ঞানে রাজসুখ দিয়ে বিসর্জন,
অলক্তরাগ রঞ্জিত, পুষ্পদল সুকোমল
শ্রীচরণ – শ্রীলক্ষ্মী নিন্দিত, অনিন্দ্যসুন্দরী
সীতা, কণ্টক আকীর্ণ পথে, স্বামী সঙ্গে যায়
বনবাসে, বক্কলসজ্জায়। পাথেয় অন্তরে শুধু প্রেম ;
তাই নিয়ে অনন্ত দুঃখের ব্রতে , 'জনমদুঃখিনী'।
অত্রিমুনির আশ্রমে যখন সীতা
"কৃতাঞ্জলি নমস্কার করিলেন সীতা।
আশীর্বাদ করিলেন অত্রির বনিতা।।
মুনিপত্নী বসাইয়া সম্মুখে সীতারে।
কহেন মধুর বাক্য প্রফুল্ল অন্তরে।।
রাজকুলে জন্মিয়া পড়িলে রাজকুলে।
দুই কুল উজ্জ্বল করিলে গুণে শীলে।।
এ সব সম্পদ ছাড়ি পতি সঙ্গে যায়।
হেন স্ত্রী পাইলা রাম বহু তপস্যায়।।"
-----কৃত্তিবাস
তারপর
পঞ্চবটী বনে পাতার কুটীরে বাস, ছিল সখী
ভয়ে ও বিস্ময়ে মেশা অরণ্য প্রকৃতি –
হোল তাও হারা। খেলাছলে চেয়েছিল অবোধ
সে বধূ, সোনার হরিণ, মোহঘোরে সেই ভ্রান্তি,
দায় তার ছিল না কী, তোমারও, হে রাম–
পূর্ণব্রহ্ম নারায়ণ, ঈশ্বরের নব অবতার ?
তবু, মানুষী বিরহে তুমি কেঁদেছিলে, আহা !
"সীতাহারা আমি যেন, মণিহারা ফণি।"
"কচ্চিজ্জীবতি বিদেহী প্রাণৈঃ প্রিয়তরা মম।
কচ্চিৎ প্রব্রাজনং বীর ন মে মিথ্যা ভবিষ্যতি।।
যদি মামাশ্রমগতং বৈদেহী নাভিভাষতে।
পুরঃ প্রহসিতা সীতা বিনশিষ্যামি লক্ষ্মণ।।"
বৈদেহী আমার, আছে জীবিত কী ? মিথ্যা হোল
বনবাস ! আশ্রম দুয়ারে যদি না দেখি হাস্যময়ী,
শুভাননা সীতা, না শুনি যদি তাঁর কলকণ্ঠে বাণী,
নিশ্চিত মৃত্যুর দেশে, হে লক্ষ্মণ, যাব চলে আমি।
(ভাবানুবাদ মৎকৃত)
আর, সীতার বিলাপ ধ্বনি আজও বিশ্বপ্লাবী,
বদ্ধ নয় অশোক কাননে, পরিব্যাপ্ত ত্রিভূবনময়।
সে-শোকের বিমূর্ত মূর্তি এলো যেই কাছে,
অপবিত্রতা দোষে দুষ্ট তাকে, চড়ালে চিতায় !
জীবন্ত! বিপরীত হতো যদি ? তবে...?
(পরকীয়া প্রেমে কৃষ্ণ দিব্য প্রেমময় !)
"রামায়ণ" সেখানেই ইতি ! হোত না কি ?
তাই শেষ হয় না কাহিনী, অবশেষ থাকে বাকী।
সতীত্ব দেখানো হোল বিদেশে, বিভুঁইয়ে।
এবার ঘরেতে ফেরা, যেখানে রাজত্ব রাজধানী।
হতে হবে প্রজানুরঞ্জক, তাই আরো একবার
লোকাপবাদে পত্নীর সতীত্ববিচার ! ওহো, অন্তঃসত্ত্বা !?
"তবে যাও বনবাসে, নিতান্ত একান্তে যাও।"
রাম রাজা, রাজ্ঞী অসহায় ! নির্বাসিনী !
তুমি কেন, কী সুখের মোহে, 'মণিহারা'
হে প্রভু, হে রঘুকুলচন্দ্র, গেলে নাকো সাথে ?
ভাই, মন্ত্রী, সান্ত্রী নিয়ে ভরত তো ভালো ছিল,
যোগ্যতর রাজা। আরোপিত কলঙ্কের
আপন জায়ার, আর আপনার পিতৃত্বের
দায়িত্বের ভার নিয়ে কেন সাথী হলে না
সীতার ? তা হোলে কি 'রামরাজ্য ইতিকথা'
হয়ে যেতো শেষ, এখানেই ?
হায় সীতা !
গর্ভভার অবনতা, ছিন্নমূল স্বর্ণলতা,
রাজকীয় দুর্বিচার-ভার বয়ে নিয়ে কেন,
লক্ষ্যহীন পথে যাত্রা করেছিল হেন, রাম,
তাও তুমি জানো । না হলে, সেই মুহূর্তেই
সর্বনাশা বিচারের বংশনাশা ফল হাতে হাতে
পেয়ে যেতে রঘুরাজ ! কী বা ফল শেষে ! ?
পরাভুত রাজা, পরাজিত স্বামী ! পিতা নির্বিবেক !
সে রূপেও সর্বাঙ্গে অঙ্কিত ছিল কলঙ্কের রেখা --
রূপে গুণে শৌর্যে বীর্যে সমুজ্জ্বল সে-দুই সন্তানে
অস্বীকার করনি তো ? তবু, কোন্ দম্ভে ?
পৌরুষেয় কোন অহংকারে, পুনর্বার, প্রাকৃত
শ্রীরাম, তাদের সম্মুখে, লজ্জাহীন অপমান
পুত্রের জননী যিনি, জনমদুখিনী সর্বংসহা, তাঁকে ?
আর নয়, আর নয় ! প্রেম ভিক্ষা ? ধিক্ !
মাতৃত্বের, নারীত্বের এ কী অসম্মান !
হে ধরিত্রী দ্বিধা হও ! কোলে নাও ,মাগো !
বিশ্বব্যাপ্ত অন্ধকার নেমে এলো ঘনঘোর,
কোথা রাম, কোথা রাজা, রাজদন্ড তাঁর ?
সীতা, তুমি বিজয়িনী, সর্বজয়ী নারীত্ব তোমার !
"নমি' আমি কবিগুরু তব পদাম্বুজে, বাল্মীকি।"
অমৃত আস্বাদী পদমালা করেছ রচনা মানবের।
পদে পদে তার, দিয়ে গেলে সূক্ষ্মতম কণা
শাশ্বত সত্যের। মানুষের অন্তরের গহন গহ্বরে,
কত রাগ, কত অনুরাগ নিত্য নিত্য ফুটে আর টুটে।
কত সত্য, কত ভ্রান্তি, মর্ম আর ধর্মের সমুদ্রমন্থন !
অমৃতের কুম্ভ কিংবা বাসুকীর বিষের দহন !
তোমার বীণার তারে ঝংকৃত সেই বাণীর ক্রন্দন,
বহমান যুগ হতে যুগান্তরে, ঘরে ঘরে --তাই রামায়ণ ।।
আদি কবির মহাসৃষ্টি মহাকাব্য চিরন্তনী,
রঘুবংশ সম্ভূত রাম, সতী সীতা জনকনন্দিনী।
পিতা মাতার পুন্যফল, সুত দুলাল চন্দ্র গায়।
সীতারাম খেলা কর আমার হিয়ায় ।।
উদ্ধৃতিঃ
১।বাল্মীকি রামায়ণ
২। কৃত্তিবাসের রামায়ণ,
৩।জগদ্রামী রামায়ণ ও
৪। মাইকেল মধুসূদন দত্তের
"মেঘনাদ বধ কাব্য থেকে ।"
দুলাল চন্দ্র বন্দোপাধ্যায়
২৬--০১--২০২২
পুনঃপ্রকাশিত
০৮-০৩-২০২৪
লেখাটি পরিচিত মানুষদের পাঠান।
রামের পিতৃত্ব নিয়ে সন্দেহ ছিল।
উত্তরমুছুনঅত্যন্ত সুন্দর লিখেছেন বন্ধু। আমি অভিভূত হয়ে গেলাম।
উত্তরমুছুনখুব সুন্দর একটি লেখা পাঠ করলাম।
উত্তরমুছুনNo one can interpret Sita better than this.
উত্তরমুছুনআজ আন্তর্জাতিক নারী দিবসে নারীত্বের লাঞ্ছনার প্রতীক সীতাকে তুলে ধরেছেন যথাযথ।
উত্তরমুছুন
উত্তরমুছুনখুব ভালো লাগলো।
খুব সুন্দর লেখা পড়ালাম
উত্তরমুছুনখুব ভাল লাগলো, মনের কথা।
উত্তরমুছুনDarun criticism...satti to in respect to upbringing his sons , he failed...
উত্তরমুছুন