St. Paul's Cathedral in Kolkata
ধর্মসংকটের বলি মানবতা--- পর্ব ৪
যীশুর মৃত্যুর পর 'যীশুর রক্ত পান করে' (The last Supper, অন্তিম নৈশভোজ স্মর্তব্য) যীশুর পরিকর ও শিষ্য সম্প্রদায় আদম্য উৎসাহে প্রচারে আত্মোৎসর্গ করেছিলেন। ইউরোপ ছাড়িয়ে তাঁরা ছড়িয়ে পড়েছিলেন আফ্রিকায়, অস্ট্রেলিয়ায়, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকায় এবং অবশ্যই রাশিয়া ও চীনসহ বিশাল এশিয়া মহাদেশেও।
(আমাদের এই ভারতবর্ষে কেমন ছিল তাদের ধর্মপ্রচার তারি একটি অতি সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়াও যুক্তিযুক্ত।)
Saint Thomas, the founder of Christianity in India.
Christianity বা খ্রীষ্টধর্ম আলোচনা প্রসঙ্গে
ভারতে খ্রীষ্ট ধর্মের প্রচার, বিস্তার ও প্রভাবের কথা অবশ্যম্ভাবীরূপে আসবেই। ঐতিহাসিকেরা গবেষণা করে দেখেছেন সেন্ট টমাস নামের এক খ্রীষ্টান ধর্ম প্রচারক আনুমানিক ৫০ খ্রীষ্টাব্দে ভারতে আসেন এবং ৫৮ খ্রীঃ নাগাদ মালাবার উপকূলে খ্রীঃ ধর্ম প্রচার করতে থাকেন।
(Thomas the Apostle --- One of the Twelve Apostles of Jesus).
বেশ কিছু মানুষ এই নূতন ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং একটি সম্প্রদায় গঠন করেন। অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন তিনি জলপথে এসেছিলেন, আবার অনেকের ধারণা তিনি ইটালি থেকে পূর্বদেশের পথ ধরে এশিরিয়া হয়ে ধর্মপ্রচার করতে করতে স্থলপথে, বর্তমান আফগানিস্তানের মধ্য দিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবেশ করেছিলেন। পশ্চিমঘাট উপকূলের আদিবাসী সম্প্রদায়ের কাছে তিনি শ্রদ্ধার সঙ্গে সমাদৃত হন। সহজ সরল আবেদনে বিরাট এক জনগোষ্ঠীকে তিনি খ্রীঃ ধর্মে দীক্ষিত করেন। আনুমানিক ৭২ খৃষ্টাব্দে, দক্ষিণ ভারতে চোল বংশের রাজত্বকালে পারানজিমালায়, (সেন্ট টমাস মাউন্ট বর্তমান তামিলনাড়ুতে), তিনি প্রয়াত হন, যেখানে একটি সুন্দর চার্চ তৈরী করা হয়েছে। তারপর থেকে একাধিক ক্রমে জেসুইট সম্প্রদায়, সিরীয় ও রোমান ক্যাথলিক সম্প্রদায় ভারতবর্ষে আসেন। দক্ষিণ ভারতীয় উপকূল অঞ্চলেই মূলত তাদের ধর্মীয় প্রচার ও ধর্মান্তরিতকরণ সীমাবদ্ধ ছিল।
জেসুইট সম্প্রদায়ের সঙ্গে বাঙলার প্রথম সংযোগ স্থাপিত হয় ১৫৭৬ খ্রীষ্টাব্দে, ফাদার এন্টনী ভাজ, ফাদার পিটার ডায়াস প্রভৃতি ধর্ম প্রচারকগণের প্রচেষ্টায়। রোমান ক্যাথলিকদের আগমন ঘটে ১৫৮০ খ্রীঃ নাগাদ। ওলন্দাজদের ব্যাবসায়িক কাজ শুরু হয়েছিল ব্যান্ডেল অঞ্চলে এবং তাদেরই প্রচেষ্ঠায় গড়ে ওঠে ব্যান্ডেল শহর। এখানেই ১৬২২ খ্রীষ্টাব্দে সেন্ট পল কলেজের রেক্টর নিযুক্ত হয়েছিলেন জনৈক ফাদার গোমেজ, এবং ধর্ম সংক্রান্ত শিক্ষারও সূচনা হয়েছিল। এখানেই বাংলার প্রাচীনতম খ্রীষ্টান গীর্জা ব্যান্ডেল চার্চ (The Basilica of the Holy Rosary, Bandel, West Bengal), ১৬৬০ খ্রীষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত।
এ ছাড়া পরবর্তী সময়ে কোলকাতায় কয়েকটি ঐতিহাসিক গীর্জার অস্তিত্ব এখনো বর্তমান। সেগুলির মধ্যে 'মিশন চার্চ' সম্ভবত প্রাচীনতম। 'যোহান জাখারি' (Johnn Zachariah Kiernader) নামের এক মিশনারী, যিনি ১৮ বছর ধরে দক্ষিণ ভারতে খ্রীষ্টধর্ম প্রচার করছিলেন, তাঁকে এই একই কাজে লর্ড ক্লাইভ কোলকাতায় আমন্ত্রণ করেন। এই মিশনারী জোহান ১৭৭০ খৃষ্টাব্দে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত খরচে একটি চার্চ নির্মাণ করেন। এটি মিশন চার্চ নামে পরিচিত। মূল নাম ছিল, Beth Tephillah (Hebrew -- House of Prayer). এই চার্চটিতেই মাইকেল মধুসূদন দত্ত দীক্ষিত (baptized) হয়েছিলেন।
এরপর যে কয়েকটি প্রাচীন চার্চ কোলকাতায় নির্মিত হয়েছে ও আছে তাদের মধ্যে সেন্ট পল'স ক্যাথিচার্চ, আর্মেনিয়া চার্চ, সেন্ট জন'স চার্চ, সেন্ট এনড্রিউ'স চার্চ, সেন্ট থমাস (প্রোটেস্টান্ট) চার্চ, সেন্ট থমাস (অর্থডক্স) ক্যাথিড্রাল, স্যাক্রেড (ক্যাথলিক) চার্চ ইত্যাদি।
('ভারতভূমিতে চার্চ' -- বিষয়ে আলাদা আলোচনার অবকাশ রইল)
১৬৩৩ খ্রীষ্টাব্দে মোগল সম্রাট সাজাহানের এক ফরমানে খ্রীষ্টবিশ্বাসীদের ধর্মাচরণের জন্যে, গীর্জার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ৭৭৭বিঘা নিষ্কর জমি দান করা হয়েছিল। এই দৃষ্টান্ত মোগল শাসকদের পরধর্মসহিষ্ণুতার উদাহরণ। বিশেষ করে এই বাঙলায় তথা সমগ্র ভারতবর্ষে খ্রীষ্টান ধর্মের যে প্রতিষ্ঠা ও বিস্তার তা ভারতবর্ষের সমকালীন ও পরবর্তীকালেও সমস্ত শাসকবর্গের, হিন্দু মুসলিম সকলের আনুকুল্য লাভ করেই সম্ভব হয়েছে। সেন্ট টমাসের সময়কাল (আনুমানিক ৫০খ্রীঃ) থেকে মোগল সাম্রাজ্যের তৃতীয় প্রজন্ম পর্যন্ত প্রায় দেড়হাজার বছরের অধিককাল ধরে ভারতবর্ষে শাসকদের ইসলাম ধর্মের ও বনিক ইংরেজদের খ্রীষ্টান ধর্মের প্রচার ও প্রসার হয়েছে সমান্তরালভাবে। অপর দিকে ভারতের আদি বেদান্ত ধর্মের পাশাপাশি, কিছুটা অনুচ্চগ্রামে হলেও শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পারসিক ও লোকায়ত বহু প্রকার গোষ্ঠী-সম্প্রদায়গত ধর্মের আচরণ ও ধর্মীয় সংস্কার পালনেরও প্রচলন ছিল ; কিন্তু নির্বাধ ছিল সর্বতোভাবে, তেমন কথা বলা যায় না। পুরাতন হিন্দু দেবদেবীদের অজস্র মন্দির, বিশেষ করে ভারতের উত্তর অর্ধাংশে, ধংস করা হয়েছিল। সেখানে নির্মিত হয়েছে বহু মসজিদ। অসংখ্য বৌদ্ধ মঠ, স্তুপ, প্যাগোডা, শিক্ষাকেন্দ্র ( যেমন নালন্দা বৌদ্ধ বিহার ও মহাবিদ্যালয়)। সেই সকল ধংসস্তুপের নিদর্শন আজিও প্রত্নতাত্বিকদের গবেষণার বিষয়।
এই সময়কালের মধ্যবর্তী অংশটি, অষ্টম থেকে পঞ্চদশ শতক, ইউরোপ ভূখন্ডে যখন অন্ধকারময় যুগ তখন সমগ্র ভারতবর্ষসহ এই বঙ্গদেশেও নানা কৌম ধর্মবিশ্বাস ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান, ব্রাহ্মণ্য ধর্মের নানা মত, নানা পথ, বিভিন্ন বিচিত্র লোকসংস্কার, জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মের নানা প্রকার আদর্শ, আচরণ লোকায়ত স্তরে প্রচলিত ছিল। একাদশ, দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতকে উত্তর ভারতের সঙ্গে পূর্ব ভারতও যখন সামরিক শক্তিতে প্রবলতর বহির্দেশীয় মুসলিম অভিঘাতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ল তখন সমগ্র বঙ্গভূমির সহস্রাব্দব্যাপী আচরিত ব্রাহ্মণ্যবাদী ও কৌম ধর্মাচরণ ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল।
এমনই এক শিথিলগ্রন্থী, ভগ্নপ্রায় সমাজবন্ধনের সুযোগে ভারতবর্ষের উচ্চবর্ণের দ্বারা উপেক্ষিত নিম্নবর্ণের কৌম সম্প্রদায়ের বিরাট অংশ ইসলাম ও খ্রীষ্টান ধর্মের আশ্রয় গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিল। তবে একথা ঠিক যে ভারতবর্ষে খ্রীষ্টান ধর্ম প্রচারণার ক্ষেত্রে আগ্রাসন ও রক্তপাতের তেমন ইতিহাস প্রায় নেই বললেই চলে।
অষ্টাদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে (১৭৫৭ খ্রীষ্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধ, ১৭৬৫ খ্রীষ্টাব্দে মোগল সম্রাট শাহ আলমের কাছ থেকে বাঙলা, বিহার ও ওড়িশার দেওয়ানী লাভ) ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর শাসন এবং পরবর্তী কালে ইংরেজ রাজত্বের সুদৃঢ় প্রতিষ্ঠার পর বাংলায় তথা ভারতবর্ষে, ক্রমান্বয়ে খৃষ্টান ধর্মের প্রচার ও প্রসার ঘটতে থাকে। এবং যেহেতু ভারতে বৃটিশ সাম্রাজ্যের শাসন প্রতিষ্ঠিত হোল একমাত্র সেই কারণেই এদেশে ক্যাথলিক ধর্মপ্রচার অনেকটাই স্তিমিত হয়ে এসেছিল, আর তার ব্যাপকতাও সীমাবদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। পরিবর্তে ইংল্যান্ডের 'রাজধর্ম' প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রীষ্টধর্ম প্রচারক পাদ্রীদের অপ্রতিহত প্রাধান্য কায়েম হোল। শুধু ভারতবর্ষে নয়, পৃথিবীর যে সকল অঞ্চলে প্রোটেস্টান্টবাদ (Protestantism) বিকাশলাভ করেছে, সেখানেই এই শাখার ধর্মপ্রচারকেরা রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্য বিস্তার করবার চেষ্টা করেছে এবং রাজশক্তির অনুগ্রহে সফলও হয়েছে চুড়ান্তভাবেই।
তবে ক্যাথলিক সম্প্রদায়ভুক্ত মিশনারীদের দল যেভাবে আফ্রিকায়, চীনে, মেক্সিকোতে বা পেরুতে ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের কনিষ্ঠ সহযোগীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে সে সব দেশের আদিবাসীদের উপর রক্তঝরা নির্যাতন চালিয়েছিল ভারতবর্ষের ক্ষেত্রে প্রোটেস্টান্ট সম্প্রদায় সে রকমটি করেনি, বা করতে চায় নি। তার অনেকগুলি কারণের মধ্যে ভারতের মূল ধর্মভাবনার ঔদার্য, গ্রহনক্ষমতা ও ভিন্ন ভিন্ন মতের আত্মীকরণ ও আঙ্গীকরণ মানসিকতা ; যদিও উচ্চবর্ণীয় ব্রাহ্মণ্যবাদীদের কাছে ইসলামধর্মের মতই খ্রীষ্টানধর্মও অচ্ছুৎ ছিল। কিন্তু বর্ণাভিমানের বাইরে যে যে বৃহত্তর মানবগোষ্ঠী বহিরাগত ধর্মপ্রচারকদের সহানুভূতি, সখ্য ও সহায়তা লাভ করছিলেন, প্রাণের স্পর্শ ও দানের আনন্দ ভোগ করার অযাচিত সুযোগ লাভ করেছিলেন, তাঁরা যীশুর বাণী গ্রহণ করতে দ্বিধা করেননি। এতৎসত্ত্বেও ভারতবর্ষে খ্রীষ্টানধর্মের দ্বারা প্রভাবিত ও ধর্মান্তরিত মানুষের সংখ্যা ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত ভারতবাসীর সংখ্যা অধিকতর। এবং তা সম্ভব হয়েছে রাষ্ট্রশক্তির শাসনে ও আনুকুল্যে। মুসলিম ধর্মবিস্তারের ক্ষেত্রে সেই রাষ্ট্রশক্তির অপ্রতিরোধ্যতা দশম, একাদশ ও দ্বাদশ শতাব্দী থেকে ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত এবং অবিরামভাবে ভারতবর্ষকে কেন স্বীকার করে নিতে হয়েছে সে প্রসঙ্গে ইতিহাস গবেষক নীহার রঞ্জন রায় লিখছেনঃ
"বাঙলাদেশ তথা সমগ্র উত্তর-ভারতে হিন্দুরাষ্ট্র ও হিন্দু রাজত্বের পতন ও অবসানের প্রধান কারণ ব্যক্তিগত সাহস বা শৌর্য্যবীর্যের অভাব নয় ; সে-কারণ রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব এবং সঙ্ঘ শক্তির অভাব। কৌমচেতনা, আঞ্চলিক চেতনা, সামন্ততন্ত্র, বর্ণবিন্যাসের অসংখ্য স্তরভেদ, সংকীর্ণ স্থানীয় রাষ্ট্রবুদ্ধি প্রভৃতি সমস্তই তাহার মূলে ; এ সব কথা বিস্তৃত ব্যাখ্যার কোনও অবকাশ রাখে না।"
তবু আমরা সেই আলোচনায় প্রবেশ করতে চাই।
কেন ? তার আলোচনা পরবর্তী পর্বে।
(ক্রমশঃ)
ধর্মসংকটের বলি মানবতা ---পর্ব ৫
_____________________________________________
খুব ভালো লেখা
উত্তরমুছুন