শ্রীমদ্ভগবত গীতায় অর্জুন- ৭
শ্রীমদ্ভগবত 'গীতায় অর্জুন-৬ -তে' আমরা নবম অধ্যায়ের প্রথম শ্লোকটির উল্লেখ করেছি। আমাদের উদ্দেশ্য নয় যে গীতার একটি নবতম ভাষ্য রচনা করা ; কেননা, আগেও বলেছি, আবারও বলব যে প্রায় তিন হাজার বছর বা তারও অধিক কাল ধরে অসংখ্য ঈশ্বরপ্রমাণ সাধক ও জ্ঞানতাপস যে মহাগ্রন্থের ভাষ্য ও টিকা রচনা করেছেন তাদের বোধের এবং পাণ্ডিত্যের কণামাত্র লাভ করা জন্ম জন্মান্তরের সাধনা। সে সাধনা আমার নাই। শ্রীমদ্ভগবত গীতা নিয়ে আমার আলোচনার প্রয়াসও ধৃষ্টতার নামান্তর। তবু আলোচনা করে চলেছি এই কারণেই যে অর্জুনের বর্তমানে মনের যে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব, কিংকর্তব্যবিমূঢ়তা তার সঙ্গে আমাদের মত অসহায় মর্ত্য-মানবের অন্তরের মিল খুঁজে পাই। অরিন্দম পার্থ সখা ও সারথিরূপে যাঁকে চিনতেন সেই কৃষ্ণ এখন বিশ্বসংসার-পরিব্যপ্ত অব্যক্ত পরমাত্মা, সম্পূর্ণ অপরিচিত অচিন্ত্য এক দৈববিগ্রহ !
ময়া ততমিদং সর্বং জগদব্যক্ত মূর্তিনা।
মৎস্থানি সর্বভূতানি ন চাহং তেষু অবস্থিতঃ।। (৯।৪)
কৃষ্ণ বলছেন, এই জগৎ --- দ্যুলোক, ভূলোক, ঊর্দ্ধ্বলোক, অধঃলোক এবং ভূতগণ (বস্তুবিশ্ব) আমার মধ্যেই অবস্থান করে রয়েছে কিন্তু আমি এ সবের মধ্যে নেই।। তুমি দোষ-রহিত পুরুষ, তোমাকেই আমার (ভগবানের) এই গুহ্য জ্ঞানের কথা জানাব ; আর সেই অতি গোপন জ্ঞানরহস্য জানলে এই দুঃখপূর্ণ সংসার প্রপঞ্চ থেকে মুক্তি লাভ হবে, --- বলে' ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সখা অর্জুনকে রাজগূহ্যযোগ-সাধনার তত্ত্ব বিশদে বলতে আরম্ভ করলেন।
এই পরমজ্ঞান-রহিত মানুষ জন্মমৃত্যুর চক্রে কাল কালান্তর ধরে ঘূর্ণায়মান ও দুঃখের নরকে নিমজ্জিত। দেখ অর্জুন, অব্যক্তরূপে আমি (এই পরম চৈতন্যে)সমস্ত জগতে ব্যপ্ত। সমস্ত জীব (সর্বভূতানি) আমার মধ্যেই অবস্থান করে, কিন্তু 'আমি' না জগতে, না জীবে -- কোথাও অবস্থিত নই। যদিও সৃষ্টির কারণ ও কার্য আমি, সমস্ত জীবের ধারক আমি, আমি সর্বব্যপ্ত ; তবুও আমার আত্মা ভূতজগতের মধ্যে স্থিত নয় -- ন চ ভূতস্থঃ মম আত্মা। যেমন আকাশ থেকে উৎপন্ন সর্বগা (সর্বত্রগামী) বাতাস নিত্য আকাশেই স্থিত আছে তেমনই সমস্ত জগৎ আমাতেই স্থিত আছে। কল্পের অন্তে সমস্ত ভূতজগত (এই যে জীব-অজীব-সমন্বিত মহাবিশ্ব) আমারই সৃষ্ট প্রকৃতিকে প্রাপ্ত হয় আর লয় হয় এবং (তারপর আবারও) কল্পের আদিতে তাদের আমি পুনরায় সৃষ্টি করে থাকি --- বিসৃজ্যামি। এই ভূতজগত আমারই প্রকৃতির অধীন, প্রকৃতির বশে চেতনাহীন হয়ে আবার আমারই দ্বারা পুনঃ পুনঃ সৃষ্ট হয়, সৃষ্ট হয় তাদেরই বিগত জন্মের কর্মানুসারে, এবং অন্তকালে বিনষ্টও হয় আমারই ইচ্ছায়। হে অর্জুন, এই যে আমি 'বিসৃজামি' বা 'সৃষ্টি করি' কথাটি তোমাকে বলছি, তাতে মনে হতে পারে এই কর্ম আমার দ্বারা কৃত --- তা কিন্তু নয়। এবং এও নয় যে ভূত জগতের (জীবকুলের) কৃত কর্মে আমার প্রেরণা আছে। ('আমি' এখানে অক্ষরব্রহ্ম, 'পরম চৈতন্য'। কর্ম সাধিত হয় 'প্রকৃতিম অবষ্টভ্য' --প্রকৃতিরই স্বভাবের বশে, প্রকৃতিরই 'ত্রিগুণময়ী মায়াকে' অবলম্বন বা অঙ্গীকার করে। সেখানে আমার কোন কর্তৃত্বভাব নেই। তবে ত্রিগুণময়ী (সত্ত্ব, রজঃ ও তম-গুণসম্পন্ন) 'মায়া' আমার বশীভূত এবং একইসঙ্গে এই মায়ার দ্বারা আমি আবরিত।
"ময়াধ্যক্ষেণ প্রকৃতিঃ সূয়তে সচরাচরম।
হেতুনানেন কৌন্তেয় জগদ্বিপরিবর্ততে ।। ৯।১০।।
শ্রীগীতায় স্ফুরিত এই মহাবাণীর তাতপর্য্য অতিশয় গভীর, যুগপৎ জটীল। 'ময়া অধ্যক্ষেণ ' --- 'স্রষ্টার মায়াবিগ্রহ' পরমাত্মা বা পরমচৈতন্যরূপ শ্রীকৃষ্ণ এখানে বলছেন যে আমার অধ্যক্ষতায় অর্থাৎ আমার নিয়ন্ত্রণে প্রকৃতি (ত্রিগুণাত্মিকা মায়া) এই চরাচর ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি করেন এবং আমারই 'নির্লিপ্ত' ইচ্ছাশক্তির প্রভাবে বা প্রকৃতির নিয়মেই এই জগৎ পুনঃ পুনঃ সৃষ্ট হয় এবং ধংস হয়। ('বিপরিবর্ততে' -- গমনাগমনরূপ চক্রে আবর্তিত হয়ে চলেছে)। মহেশ্বর (মহা+ঈশ্বর =মহাদব বা শিব নহেন), পরমেশ্বররূপে আমার যে পরম ভাব, তাকে মূঢ়তাচ্ছন্ন মানুষ, স্বীকার করে না যখন আমি মনুষ্য অবতারে আবির্ভূত হই। এই নির্বোধ, মূঢ় মানুষেরা রাক্ষসী ও আসুরী অজ্ঞতায় মোহাচ্ছন্ন স্বভাবকে ধারণ করে। বৃথা আশায়, বৃথা কর্মে, নিষ্ফলা জ্ঞানে তারা তমসাবৃত। কিন্তু সুরপ্রকৃতির মহাত্মাগণ 'শুদ্ধস্বভাবকে' আশ্রয় করে, ভূতজগতের সৃষ্টির কারণ 'আমাকেই' জেনে এবং অবিনাশী ও অক্ষরস্বরূপ আমাতেই আশ্রয় করে আছেন, আমাকেই নিরন্তর ভজনা করেন এবং তাঁরা আমাকে লাভ করেন ও জন্মমৃত্যুর দুঃখময় আবর্তন থেকে মুক্তি পান। (বিষয়টি আমরা ষোড়শ অধ্যায়ে বিশদে আলোচনা করবার চেষ্টা করব)। আমার ভক্ত যাঁরা তাঁরা একনিষ্ঠভাবে আমার নাম কীর্তন করেন, গুনকীর্তন করেন, প্রণত হন, ধ্যানস্থ হয়ে অনন্যা ভক্তির সঙ্গে আমার উপাসনা করেন। কিছু তেমন ভক্তও আছেন যাঁরা এই প্রকার জ্ঞানযোগে উপাসনা করেন যে এই মহাসৃষ্টিতে যা কিছু আছে (জীব অজীব ও নির্জীব শূন্য) সবই বাসুদেব কৃষ্ণ -- একত্বভাবে। আবার অন্য সকলে পৃথকভাবে, অথবা 'বহু'ভাবেও উপাসনা করেন। কেননা আমিই--- এই বাসুদেব ----অগ্নি -যজ্ঞ-ঘৃত-মন্ত্র-পিণ্ডান্ন-ঔষধি-বনস্পতি। আমিই পিতামাতা-ধাতা-পিতামহ। আমি বেদত্রয়ী (ঋক্ সাম যজুঃ-- স্মরণীয় অথর্ব সংহিতা আদিতে বেদ পদবাচ্য ছিল না)। আমিই জগতের গতি ; আমিই ভর্তা-প্রভু-সাক্ষী ও শরণ (আশ্রয়)। ভূতজগত সূক্ষ্মরূপে লয়প্রাপ্ত হলে, 'নিধানে' আমাতেই (অবিনাশী এবং বীজরূপ পরম সত্ত্বা) যুক্ত হয়। কেননা আমিই---
গতর্ভর্তা প্রভুঃ সাক্ষী নিবাসঃ শরণং সুহৃদ।
প্রভবঃ প্রলয়ঃ স্থানং বিধানং বীজমব্যয়ম।। ৯।।১৮
আমি আবার সূর্যরূপে তাপ, বর্ষার আকর্ষণী শক্তি ও বর্ষণ। আমিই অমৃত, আমিই মৃত্যু। আমিই সৎ এবং অসৎ। (এখানে সৎ ও অসৎ অর্থে আলো ও অন্ধকার--- উপসংহারে আলোচ্য)
সকাম উপাসনা (যাগ যজ্ঞ) যাঁরা করেন সে সকল বৈদিক পবিত্র সোমপায়ীগণ আমার আরাধনা করে, নিজ নিজ পুন্যফলে ইন্দ্রলোক প্রাপ্ত হন, স্বর্গে দেবতাদের মতই দেববাঞ্ছিত ভোগ উপভোগ করেন। তারা আপন আপন পুন্যের প্রভাবে স্বর্গসুখ ভোগ করতে থাকেন, আবার পুন্যবল ক্ষীণ হলে (সঞ্চিত পুন্যফল শেষ হয়ে এলে) আবার তাঁরা, এই জন্মমৃত্যুর ধাম মর্ত্যলোকে ফিরে আসেন। আর যাঁরা নিষ্কামনায় উপাসনা করেন, অনন্যভাবে আমাকেই নিরন্তর স্মরণে রেখে, আমাতেই সুস্থিত থেকে, সেই সমস্ত 'আমাতে যুক্তি' ভক্তপুরুষদের জন্য আমি স্বয়ং 'যোগক্ষেম' বহন করে থাকি ---
"তেষাং নিত্যাভিযুক্তানাং যোগক্ষেমং বহাম্যহং।"
(এখানে ক্ষেম শব্দের অর্থ লব্ধ পুন্যবলের সংরক্ষণ)।
দেখ অর্জুন, কাম্যফলের আশায় যাঁরা অন্যান্য দেবতাদেরও শ্রদ্ধার সঙ্গে আরাধনা ('যজন্তে' কিন্তু পূজা নয়) করেন, তাঁরাও আমারই সাধনা করেন ; কিন্তু যদি তাদের সেই দেবারাধনা বিধিবিধানহীন হয় এবং অজ্ঞানতা প্রসূত হয়, তাত্ত্বিকভাবে 'অধিযজ্ঞ'রূপ আমাকে না-জেনে হয়, তবে তারা পুন্যলোক থেকে চ্যুত হয়ে আবারো পুনর্জন্ম লাভ করেন। বিভিন্ন দেবতার আরাধনার ফল বিভিন্ন। কেও পিতৃলোক, কেও ভূতলোক প্রাপ্ত হন ; কিন্তু আমাকে যারা ভজনা করেন (মদযাজিনঃ) তারা আমাকেই লাভ করেন। আমাতেই মিলন হলে, জীবাত্মা যখন 'পরমাত্মায়' লীন হয়ে যান তখন জন্মমৃত্যুর শৃঙ্খল থেকে তার মুক্তি লাভ।
এতক্ষণ, অর্থাৎ অষ্টম অধ্যায় পর্যন্ত আমরা অর্জুনের সাথেই যোগেশ্বর শ্রীকৃষ্ণের শ্রীমুখনিঃসৃত বাণীসমূহে কখনো দুঃসাধ্য, কখনো বা অসাধ্য, মাঝে মাঝে সাধ্যায়ত্ব যোগসাধনার বর্ণনা ও যোগমার্গের দ্বারা ফললাভের কথা শুনেছি। যোগ-সাধনমার্গের অন্তিম প্রাপ্তি জন্মমৃত্যুর আবর্তণ থেকে মুক্ত হয়ে ব্রহ্মসত্যকে উপলব্ধি করা। 'শ্বেতাশ্বতর' উপনিষদ যেমন বলেছেন ----
"যদাত্মতত্ত্বেন তু ব্রহ্মতত্বম্
দীপোপমেনেহ যুক্ত প্রপশ্যেৎ
অজং ধ্রুবং সর্বতত্ত্বৈঃ বিশুদ্ধম্।
জ্ঞাত্বা দেবং মুচ্যতে সর্বপাপৈ।।"
সাধক যখন যোগযুক্ত হন, যোগারূঢ় অবস্থায় তাঁর শরীর হতেই আলোর মত স্বয়ংজ্যোতিঃ প্রকাশিত হয়। সেটি নিজেরই আত্মার সত্যোপলব্ধির জ্যোতিঃ। এবং সেই প্রকাশ পরম জ্যোতিরই বিকিরণ। (সূর্যালোক যেমন চন্দ্রে প্রতিবিম্বিত) সেই দিব্য আলোকে তখন তিনি আপনার মধ্যেই 'ব্রহ্মসত্যকে' উপলব্ধি করেন এবং সেই অবস্থাতেই তিনি জন্মমৃত্যুরহিত, পরিবর্তনহীন, প্রকৃতির কার্যকারণের ঊর্দ্ধে পরম দেবতাকে জেনে (ব্রহ্মানন্দ লাভ করে) সমস্ত পাপ বা আপনার হীনতা দীনতা ক্ষুদ্রতা থেকে মুক্ত হয়ে যান।
মহাবাহো, অমিতশক্তি, দেবরাজ ইন্দ্রতনয় কি ভাবে সেই সুকঠিন যোগমার্গ অনুসরণ করবেন তা তো পরবর্তী পর্যায়ে জানা যাবে কিন্তু আমাদের মত ইন্দ্রিয়াসক্ত, বিক্ষুব্ধচিত্ত, মরজগতের মানুষ নিরাশ হতে বাধ্য। "এ জীবন তোর এমনি গেল মন।" ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কথিত চরিতার্থতা, মোক্ষ-মুক্তি-স্বর্গ তো 'নিশিতা দুরত্যয়া', মোহ-মায়া, কামনা-বাসনা, দুঃখ-শোকের এই সংসার নামক নিত্য-কুরুক্ষেত্রের নরককুণ্ডু থেকে আমাদের আর নিস্তার নাই।
___________________________________________
বৈষ্ণব মতের উৎস
(আর্তস্বরে ডেকে উঠি, 'হা কৃষ্ণ!' বলতে চাই, অন্য কোন সহজ পথ বল, হে ঠাকুর। তখন, ঠিক তখনই কুরুক্ষেত্রের সেই পার্থসারথি, সুদর্শনধারী, পাঞ্চজন্য শঙ্খনিনাদী শ্রীকৃষ্ণের পরিবর্তে হৃদয়াসনে দেখি, দেবকী গর্ভজাত বসুদেবসূত, বৃন্দাবনের শ্রীনন্দনন্দন ---- প্রেমের ঠাকুর, বংশীধারী ত্রিভঙ্গমুরারী, শ্রীরাধাবল্লভ শ্যামরায়। হ্যাঁ, এখন তাঁর শ্রীচরণে আত্মসমর্পন করে বলা যায় --
"এই কর হরি দীন দয়াময়,
তুমি আমি যেন দুটি নাহি হয়।
জলের বিম্ব জলে কর লয় ---
চিন্ময় শ্যামসুন্দর।")
___________________________________________
আমাদের মত, অর্জুনেরও কী পরমাত্মার সাধনপন্থা এমনই সুদুর্গম হয়ে উঠছিল ! তাই কি অন্তর্যামী বাসুদেব এবার করুনাময় রূপ ধারণ করলেন ? সখা অর্জুনকে, সঙ্গে সঙ্গে জগৎসংসারের সকল অসহায় ভক্তকুলের উদ্দেশে, সান্ত্বনার সুরে বলে উঠলেন,---- না না, এত কঠোর কঠিন সাধনপন্থা অবলম্বন করবার প্রয়োজন নেই, 'সুগম' ভক্তিমার্গ বরণ কর, ---
পত্রং পুষ্পং ফলম্ তোয়ম্ তো মে ভক্ত্যা প্রযচ্ছতি।
তদহং অহম্ ভক্ত্যুপহৃতমশ্নামি প্রযতাত্মনঃ।। ৯।।২৬
শোন অর্জুন, ফুল, তুলসী (পত্র) জল --- এই প্রকার অতি সামান্য নেবেদ্য-নির্মাল্য কোন মদগতপ্রাণ ভক্ত যদি আমাকে প্রেমপূর্বক অর্পণ করে তবে সেই প্রেমিক ভক্তের অর্ঘ্য আমি (সগুণরূপে আবির্ভূত হয়ে) গ্রহণ করি, প্রীত ও পরিতুষ্ট হয়ে ভক্ষণ করি---- অশ্নামি। কিন্তু হে সখা, অর্পণের সাথে সমর্পণও করতে হবে যে ! আত্মসমর্পণ ! ভগবান নারায়ণ যেন সত্যকার মানবরূপী জীবনবল্লভ হয়ে উঠলেন। অর্জুনের সঙ্গে মর্ত্যলোকের দিশাহারা ভক্তবৃন্দও এতক্ষণে স্বস্তি লাভ করেছেন। তবে তাকে বরণ করবার, তাঁর করুণা, তাঁর কৃপা আস্বাদন করবার সহজ পথও আছে ! কায়-মন-বাক্যে বলতে হবে,
"আমার জগতের সব তোমারেই দেব
দিয়ে তোমায় নেব----ভাবনা ।" --রবীন্দ্রনাথ।
এইবার সেই শ্রীমদ্ভগবত গীতার মহাবাক্যগুলির অন্যতম একটি --- শ্রীকৃষ্ণ বলছেন,
"যৎ করোষি যদশ্নাসি যজ্জুহোষি দদাসি যৎ।
যৎ তপস্যসি কৌন্তেয় 'তৎ কুরুষ্ব মদর্পণম্।।" ৯।।২৭
প্রারব্ধ-আরব্ধ-অনারব্ধ, পূর্ণ-অপূর্ণ কর্ম এবং কর্মের ফলাকঙ্ক্ষা এমন কি দান-পান-ভোজন, যজ্ঞাদি সঙ্কল্প, সাধনা তপস্যা --- সমস্তই, সমস্তটাই আমাকে অর্পণ কর --- কুরুষ্ব মদর্পণম।
এই 'শূন্য করে' দেবার মধ্যেই আছে আমিত্বের বিনাশ। তখন নিঃস্ব, নিষ্কাম, নির্ভার, নিরহংকার আত্মসত্ত্বার সঙ্গে পরমাত্মার মিলন।
"যেন সময় এসেছে আজ ফুরালো মোর যা ছিল কাজ ---
বাতাস আসে হে মহারাজ তোমার গন্ধ মেখে।।"
তখন ভারহীন প্রাণে পরমেশ্বরকেই পাওয়া হোল। সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী হয়ে, কর্মবন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে আমাকে প্রাপ্ত হও। "বিমুক্তঃ কর্মবন্ধনৈঃ মাম উপৈষ্যসি।।" শুধুই ভক্তি, অনন্যা ভক্তি। আমার কাছে প্রিয় বা অপ্রিয় কেও নয়, কিছু নয়, কেননা বিশ্বচরাচরের সকল প্রাণে, সকল বস্তুতেই তো আমি। তবুও কিন্তু অহংত্যাগী ভক্ত আমার সঙ্গে একাত্ম। ভক্তির দ্বারা ভজনা করলে আমার মধ্যেই ভক্তের বাস, আমিও ভক্তের মধ্যেই বাস করি।
"যে ভজন্তি তু মাং ভক্ত্যা ময়ি তেষু চাপাম্যহম।।"
ভক্ত ও ভগবান একাকার।
শ্রীকৃষ্ণ মানব জগতের প্রতি করুণার্দ্র হয়ে বলছেন, পাপাত্মা, দুরাচারী মানুষও যদি যথানিশ্চয় হয়ে ভক্তিপূর্বক আমার ভজনা করে, সেও অচিরেই ধর্মাত্মায় পরিণত হয়, (আমার ভক্ত) নষ্ট হয়ে যায় না। অধিকন্তু, স্ত্রীজাতি, বৈশ্য , শূদ্র এবং কলুষজন্মা মানব মানবীও পরম গতি (দেব লোক) লাভ করে যদি একান্ত ভক্তি সহকারে মৎপরায়ণ হয়। যাঁরা ব্রাহ্মণ (ব্রহ্মকে জেনেছেন যাঁরা), রাজর্ষি তাঁরা এই সত্য উপলব্ধি করেছেন যে এই পার্থিব শরীর ক্ষণভঙ্গুর, অনিত্য ; তাই বিষয়সুখ পরিত্যাগ করে আমাকেই ভজনা করেন। অতএব হে অর্জুন,
"মন্মনা ভবো মদ্ভক্তো মদযাজী মাং নমস্কুরু ।
মামেবৈষ্যসি যুক্ত্বা এবমাত্মানং ম পরায়ণঃ।। " ৯।।৩৪
হে সখা, তুমি সমস্ত পরস্পর বিরোধী চিন্তা দূর করে আমাতেই শ্রদ্ধা-ভক্তি-প্রেম-সমন্বিত মন সমর্পণ কর, আমার ভক্ত হও, আমারই অর্চণা কর, আমায় প্রণাম নিবেদন করে, পরিপূর্ণভাবে আমার শরণাগত হয়ে স্ব-আত্মাকে 'পরমাত্মন আমাতে' যুক্ত করলে 'পরেই আমাকে, চরাচরপরিব্যপ্ত 'আমিরূপ বিশ্বচৈতন্য'-- আমাকে লাভ করবে।
শ্রীমদ্ভগবত গীতার এই নবম অধ্যায় 'রাজবিদ্যারাজগুহ্যযোগ' নামাঙ্কিত। বিগত সাতটি অধ্যায়ে (প্রথম অধ্যায় অর্জুনবিষাদযোগ) পরমাত্মারূপী ভগবৎ আরাধনার যে সমস্ত মত, পথ, উপায় ও উদ্দেশ্যের কথা বলা হয়েছে সে সবই (সাংখ্যযোগ, কর্মযোগ, জ্ঞানযোগ, কর্মসন্ন্যাসযোগ, অভ্যাসযোগ, জ্ঞানবিজ্ঞানযোগ ও অক্ষরব্রহ্মযোগ) গভীর তাত্ত্বিককতাপূর্ণ, 'বেদ ও ব্রাহ্মণ' সংহিতার সাধনক্রিয়ায় বর্ণিত এবং 'স্মৃতি' সংহিতা-নির্ধারিত, আচরণীয় ক্রিয়াকল্পের জটীল ও দুরূহ বিধি-বিধানের বিষয়ীভূত যা স্বয়ং 'যোগেশ্বর'সখা পুরুষাগ্রগন্য তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুনের অধিগম্য। এখন এই নবম অধ্যায়ে এসে--- আত্মানুভূতি হতে শতসহস্র যোজন দূরে, কাম-কামনা-তাড়িত, মায়া মোহে আচ্ছন্ন জীব --- আমরা প্রথম এই সান্ত্বনার বাণী (তাঁরই অযাচিত করুণায়) পেয়েছি যে একটি সরল 'পথও' আছে। ভক্তির পথ।
কিন্তু ভক্তির পথ, পরমেশ্বর আরাধনার এই পথই পরবর্তীকালে 'ভক্তি আন্দোলনের' উৎস এবং তা শত ধারায় প্রবাহিত হয়ে ভারতবর্ষের পূর্ব হতে পশ্চিমে, উত্তর হতে দক্ষিণে আবেগময় কলকলোচ্ছ্বাসে ছড়িয়ে পড়েছিল। দক্ষিণের মহাসাধক রামানুজ, পূর্বদেশের শ্রীগৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর প্রেমভক্তি সাধনপন্থার জোয়ারে আজিও লক্ষকোটি মানবের মনোভূমি অভিসিক্ত। ভক্তি আন্দোলন আজ দেশ ছাড়িয়ে বিশ্বময় মানবচিত্তকে আলোড়িত করেছে।
যাই হোক্, এই আলোচনা ধারাবাহিকভাবে চলমান রইবে। আজ ভাদ্রমাসের কৃষ্ণপক্ষ। নিখিল জগতের শোক-দুঃখহারী শ্রীমাধবের পবিত্র আবির্ভাব তিথি। পালিত হচ্ছে দেশজুড়ে--- বিশ্বজুড়েও। আজ মহাচৈতন্যর কণারূপ বালগোপালকে স্মরণ করি।
"করারবিন্দেন পদারবিন্দ।
মুখারবিন্দে বিনিবেশন্তম্।।
বটস্য পত্রস্যপুটে শয়ানম্।
বালমুকুন্দম্ মনসা স্মরামি।।"
জন্মাষ্টমী
কমলদলের মত ছোট দুটি করে
কমলফুলের মত পা'দুখানি ধরে,
কমলনিন্দিত মুখে রাখে বার বার,
দেখে হাসে নন্দরাণী আনন্দ অপার।
ছিল যত গোপবালা বলে যশোদাকে,
"কি নিঠুরা মা গো তুমি ? নাও তুলে বুকে।"
পদ্মাসনে নন্দরাণী গোপাল নিল তুলে --
শরতের পূর্ণচাঁদ খণ্ড-মেঘ কোলে।
ব্রজাঙ্গনা নৃত্য করে যমুনা পুলিনে
কে যেন বাজায় বাঁশী নিখিল অঙ্গনে।।
ভাবানুবাদ--
দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
_____________________________________
(ক্রমশঃ)
পরবর্তী অষ্টম পর্ব একাদশ অধ্যায় থেকে।
_________________________________________
Bhalo laglo kintu ektu kothin ....onek kichu jante hobe eta bujhte hole
উত্তরমুছুন