শ্রীমদ্ভগবত গীতায় অর্জুন-২
বর্ণসঙ্করতার পরিণতি সনাতন জাতিধর্ম এবং কুলধর্মের সর্বনাশ। যারা নিজেরাই নিজেদের কুলঘাতী তারা তো সমগ্র স্বজাতির ও স্বগোষ্ঠীর নরকবাস নিশ্চিত করে।
হে জনার্দন, আমরা (বেদবিধি প্রনেতাদের কাছে) শুনেছি কুলধর্মভ্রষ্ট মানুষ অনন্তকাল নরকে বাস করে।
ঋকবেদের কাল থেকে (আনুমানিক ১৫০০ থেকে ১২০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ, কিন্তু অনেক ঐতিহাসিকের মতে ৫০০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দেরও আগে ঋকবেদের সুক্তগুলির বাচনিক অস্তিত্ব ছিল) আর্যগণ পার্থিব কামনাকে ত্যাগ করেননি। ব্যক্তিক কামনা নয়, সমষ্ঠির কামনাই ঋকবেদের মন্ত্রগুলিতে প্রকাশ পেয়েছে। "আমাদের ধন বর্ধিত হোক্, আমাদের পশু বর্ধিত হোক্, আমাদের শত্রুর বিনাশ হোক্, আমাদের বীর পুত্র উৎপন্ন হোক্। একটি কামনা ঘুরে ফিরে বার বার ---- প্রায় ধূয়ার মত --- ঋকবেদের দ্বিতীয় মণ্ডলে, অর্থাৎ প্রাচীনতম অংশটিতে, ব্যক্ত হয়েছে, "বৃহদ্বদেম বিদথে সুবীরাঃ।" আমরা বীর পুত্রের জন্য সভায় বিশেষ করিয়া বলিতেছি।" দ্বিতীয় মণ্ডলে বাইশবার, নবম মণ্ডলে একবার, অর্থাৎ প্রাচীন থেকে অর্বাচীনকালের ঋকেও এই প্রার্থনা উচ্চারিত হয়েছে।"
---- লোকায়ত দর্শন, দেবী প্রসাদ চট্টোপাধ্যায়)
(এস্থলে স্মরণীয় যে প্রায় দুই হাজার বছর ধরে এই বেদ মহাসংহিতার মন্ত্রগুলি রচিত এবং 'শ্রুতি'র মাধ্যমে সংরক্ষিত। পরে কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস সেগুলিকে সুবিন্যস্ত করে, সঙ্কলিত করে , প্রথমে তিনটি---ঋক, সাম, যজুঃ ও পরে একটি অথর্ব --- এই চারটি বেদ সংহিতার সৃষ্টি করেন।)
আবারও আসি আলোচনায়।
অর্জুনের বক্তব্যগুলি অত্যন্ত যুক্তিপ্রযুক্ত। মানুষের জাগতিক অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়োজনেই ছিল পুত্রকামনা। আধিভৌতিক আধিদৈবিক বিপর্যয়কে পরাস্ত ও পরাভূত করবার জন্য প্রয়োজন কেবল পুত্র নয় বীরপুত্র। এমতাবস্থায় এক রক্তক্ষয়ী মহারণের আয়োজন করে তরুণ যুবকদের, সক্ষম পুরুষদের সংহার করলে একটি জাতিগোষ্ঠীর (ক্ষত্রিয়দের) যে মহাবিনষ্টি সাধিত হবে তা নরকবাসেরই সামিল।
দ্বিতীয় অধ্যায়ে
এরপর বিষাদগ্রস্ত, অশ্রুপূর্ণ লোচন, বিষন্ন অর্জুনকে ঐরূপ মোহাচ্ছন্ন হওয়ার কারণে সখা শ্রীকৃষ্ণ কিঞ্চিৎ ভর্ৎসনাই করলেন। বললেন, এরূপ জ্ঞানহীনতা ও হৃদয়দৌর্বল্য "অনার্যজুষ্টম্, অস্বর্গ্যম্, অকীর্তিকরম।" তোমার এবম্প্রকার আচরণ শ্রেষ্ঠ পুরুষোচিত নয়, স্বর্গ ও কীর্তি লাভেরও অনুকূল নয়। (এই 'অস্বর্গ্যম' শব্দটির, অনেক পুজ্যপাদ পুরাণবিদ অর্থ করেছেন যা ভবিষ্যতের জন্য মঙ্গলদায়ক নয়। কিন্তু রামায়ণ, মহাভারতের মত পুরাণ শাস্ত্রগুলিতে পুন্যকর্মের সঙ্কল্প ও অনুষ্ঠান দ্বারা স্বর্গলাভের বাসনা চরিতার্থ হয় --- এ কথা অসংখ্যবার বলা হয়েছে)। কৃষ্ণ আবারো বলছেন, (এবার তিরস্কার বেশ তীব্র), "ক্লৈবং মাস্মগমঃ পার্থ।" নপুংশকের মত ভাব তোমার ক্ষেত্রে উপযুক্ত নয়। হৃদয়ের দুর্বলতা পরিত্যাগ কর উঠে দাঁড়াও, যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হও।
কিন্তু বিষাদবিহ্বল অর্জুন তখনও বলছেন,
কথং ভীষ্মমহং সংখ্যে দ্রোণঞ্চ মধুসূদন।
ইষুভিঃ প্রতি যোৎস্যামি পূজার্হাবরিসূদন।।
পিতামহ ভীষ্ম, গুরু দ্রোণাচার্যের প্রতি বাণ নিক্ষেপ করব কি করে ? হে মধুসূদন, হে অরিসূদন (শত্রুসংহারক), ওঁরা যে আমার পূজনীয়। মহানুভব এসকল গুরুজনদের প্রাণসংহার না করে ভিক্ষান্ন খেয়ে জীবনধারণ করা কল্যাণকর। আমি কি পূজার্হদের হত্যা করে তাঁদের রক্তসিক্ত 'অর্থ ও কাম' ভোগ করব ?
"ভুঞ্জীয় ভোগান্ রুধিরপ্রদিগ্ধান"
দ্বিতীয় অধ্যায়ে অর্জুন কথিত এই পঞ্চম বক্তব্যটি আমাদের অন্তরাত্মকে শিহরিত করে। মানসচক্ষে প্রতিবিম্বিত হয় প্রবৃদ্ধ দুই মহান ব্যক্তিত্বের রক্তলাঞ্ছিত মৃতদেহ যাঁরা কৌরব ও পাণ্ডব পরিবারের আজন্ম হিতাকাঙ্ক্ষী। বিচিত্রবীর্যের মৃত্যুর পর ভীষ্মের পরামর্শে সত্যবতীর উদ্যোগে ব্যাসদেবের আগমন ঘটে এবং তাঁর ঔরসে বিচিত্রবীর্যের বিধবা পত্নীদের (অম্বিকা, অম্বালিকা) গর্ভে ধৃতরাষ্ট্রের, পাণ্ডুর (ও দাসী গর্ভে বিদুরের) জন্ম সম্ভব হয়েছিল এবং কুরু মহাজনপদের রাজবংশ নির্বংশ হয়ে যায় নি। মহামতি ভীষ্ম নিজে সংসার না করে কুরু রাজবংশের সংসার রক্ষার জন্য দীর্ঘ দীর্ঘ কাল ধরে যে নিষ্কামনায় আত্মত্যাগ করে গিয়েছেন সেই কাহিনী মহাভারতের আদ্যোপান্ত, সারাটি মহাভারত জুড়ে --- শান্তনু, বিচিত্রবীর্য এবং ধৃতরাষ্ট্র-পাণ্ডু --- তিন পুরুষের সময়কালের বিঘ্ন-বিপদের ত্রাণকর্তা তিনি। কত কত রাজ্যজয়ের মাধ্যমে কুরুরাজভাণ্ডার ধনে-সম্পদে পূর্ণ করেছেন তিনি। এহেন সর্বত্যাগী পিতামহের রুধিররঞ্জিত যে রাজত্বলাভ তাতে সুখ কোথায় ? কোথায় চরিতার্থতা ?
অপরদিকে অস্ত্রগুরু দ্রোণাচার্য। যাঁর অস্ত্রশিক্ষায় কুরুবংশের রাজকুমারেরা দুর্বিজয়, যাঁর স্নেহার্দ্র পক্ষপাতের আনুকুল্য এই ফাল্গুনী আজ গাণ্ডীবধন্বা, তাঁকে হত্যা !
না মধুসূদন, (এই চিত্তবৈকল্য নিয়ে) তাঁদের উদ্দেশে তাঁদের বক্ষবিদারী শরক্ষেপন আমার দ্বারা অসম্ভব। তা ছাড়াও উচিত্য অনৌচিত্য বোধেও আমি দ্বিধাগ্রস্ত। আবার দ্বিধাগ্রস্ত এই কারণেও যে জয়ী কি আমরা হবই, নাকি প্রতিপক্ষ জয়ী হবে ! জয়লাভ আমাদের হয়ও যদি তবে এই কৌরব বংশ ও তাদের মিত্রপক্ষকে বধ করেই তো সেই জয় আসবে। না না, তাঁদের হত্যা করে আমরা জীবিত থাকতে চাই না।
যানেব হত্যা ন জিজীবিষাম।
স্তেহবস্থিতাঃ প্রমুখে ধার্তারাষ্ট্রাঃ।।
হে সখা, হে প্রাণসখা, আমি শোকবিহ্বল, আমি মানসিক দ্বন্দ্বে কাতর, কর্তব্য অকর্তব্য বিষয়ে আমি মোহিতচিত্ত --- ধর্মসংমূঢ়চেতাঃ। হে দিগদিশারী, (হে বন্ধু, হে প্রিয়,) দিশাহারা আমি তোমাকে প্রশ্ন করছি, আমার পক্ষে যা নিশ্চিত করা উচিত, যা শ্রেয়স্কর তাই আমাকে বল, আমাকে শিক্ষা দাও।
"যচ্ছ্রেয় স্যান্নিশ্চিতং ব্রূহি তন্মে।
শিষ্যস্তেহহং শাধি মাং তাং প্রপন্নম্।।"
কেননা, আমার মনে হচ্ছে এই পৃথিবীতে আমি যদি ধন-অন্ন-সমৃদ্ধ, শত্রুহীন, দেবতাদের আশীর্বাদধন্য (একমাত্র দেবতাদেরই আধিপত্যসমন্বিত) রাজ্য লাভও করি তবু আমার ইন্দ্রিয়গুলির উচ্ছ্বাস-বিনাশী (উচ্ছোষনম=উৎ +শোষণম্=সম্পূর্ণ শোষণকারী) শোককে প্রশমন করতে পারে এমন কোন উপায় দেখছি না।
হে পরন্তপ, হে রাজন --- এই ভাবে ধৃতরাষ্ট্রকে সম্বোধন করে সঞ্জয় বললেন, যুদ্ধে (সম্ভাব্য মারণান্তিক পরিণামের কথা ভেবে), ''হে গোবিন্দ, আমি যুদ্ধ করব না'' -- এই কথা বলে নিদ্রাজয়ী ধনঞ্জয় নির্বাক, নিশ্চুপ হয়ে রইলেন।
হে রাজন, (ধৃতরাষ্ট্রের প্রতি সঞ্জয়), অর্জুনের এই শোকাকুলতা লক্ষ্য করে অন্তর্যামী হৃষিকেশ উভয়পক্ষের সৈন্যবাহিনীর মাঝখানে, তিরস্কার-মিশ্রিত কণ্ঠস্বরে (প্রহসন্নিব) বলতে লাগলেন, 'হে অর্জুন, তুমি শোক করবার অযোগ্য বিষয়ে শোক প্রকাশ করছ, এবং সর্বজ্ঞাতা প্রাজ্ঞজনোচিত বড় বড উক্তি করছ, কিন্তু জান কি, যারা বিগত হয়েছে এবং যারা এখন জীবিত অবস্থায় আছে সত্যিকারের পণ্ডিতগণ তাদের জন্যে শোক করেন না।'
এবার, শ্রীমদ্ভগবতের এই দ্বিতীয় অধ্যায়ের ১১তম শ্লোক থেকে আরম্ভ হোল শোকার্ত, মায়ামোহে আচ্ছন্ন, যুদ্ধে অনীহ, হৃদয়াবেগে দুর্বল রথী অর্জুনের প্রতি সারথি শ্রীকৃষ্ণের উপদেশবাণী। দ্বিতীয় অধ্যায় সাংখ্যযোগ।
যুদ্ধ কুলনাশী, আত্মীয়-বন্ধু বিনাশের কারণ এবং যুযুধান তরুণদের মৃত্যুর পরিণতিতে বংশনাশ, অনাথা নারীদের অন্যভোগ্যা হবার সম্ভাবনা এবং পরিণামে বর্ণসঙ্করতার ফলে পূর্বপুরুষগণের নরকপ্রাপ্তি--- মহারথী পার্থ যখন এই যুক্তিগুলি সখা শ্রীকৃষ্ণের কাছে উত্থাপন করে অস্ত্রধারণ করতে অস্বীকার করলেন তখন শ্রীকৃষ্ণ তাকে ভর্ৎসনাই করলেন না, সম্পূর্ণ এক ভিন্ন পথ অবলম্বন করে তাঁকে বোঝাতে চাইলেন 'হত বা নিহত হওয়ার' ঘটনাটি ঘটে দেহের সঙ্গে, আত্মার সঙ্গে নয়। কাজেই স্বজনদের সম্ভাব্য মৃত্যুজনিত শোক অনুচিত।
ন ত্বেবাহং জাতু নাসং ন ত্বং নেমে জনাধিপাঃ।
ন চৈব ন ভবিষ্যামঃ সর্বে বয়মতঃ পরম।।
দেখ পার্থ, এমন নয় যে অতীতের কোন কালে আমি ছিলাম না, তুমি ছিলে না, তোমার প্রতিস্পর্ধী এই রাজারা ছিলেন না ; আবার এমনো নয় যে পরে, ভবিষ্যতে আমরা থাকবো না। দেখ, জীবাত্মার যে দেহরূপ তার মধ্যে যেমন 'কৌমারম্ যৌবনম্ জরা' আসে (প্রকৃতির ধর্মেই আসে), তেমনই অন্য দেহরূপেও (দেহান্তর প্রাপ্ত হলে) একই রূপান্তর ঘটে।
এখানে শ্রীকৃষ্ণ জন্মান্তরবাদের কথা বলছেন। তিনি বলতে চাইছেন আত্মা ও স্থূল শরীর ভিন্ন। শরীরের অবস্থান্তর ঘটে। জন্ম হয়, বাল্য ও কৈশোর, যৌবন, বার্ধক্য প্রাপ্তি এবং অবশ্যম্ভাবী মৃত্যু। অর্থাৎ জীবদেহ বিকার প্রাপ্ত হয়। জ্ঞানহীনতাহেতু শরীরের এই বিকার আত্মাতে প্রতিভাসিত হয় যেহেতু শরীর এবং আত্মাকে একাকার ভাবে দেখি। কিন্তু আত্মা অবিকার ও অমর। তত্ত্বজ্ঞানী ধীরপুরুষ তাই এ বিষয়ে (দেহান্ত প্রাপ্তিতে) মোহাচ্ছন্ন হন না।
(ক্রমশঃ)
অসাধারন লেখা
উত্তরমুছুন