বৃহস্পতিবার, ৩ এপ্রিল, ২০২৫

স্বামী রঙ্গনাথানন্দ ও বর্তমান ভারতবর্ষে তাঁর মতাদর্শের অপরিহার্যতা - ৪

                                           চার 


প্রথমে উপনিষদ সম্মন্ধে আমাদের ধারণা স্বচ্ছ হওয়া প্রয়োজন। আর্য জাতি, তাঁরা বহিরাগত না কি এই ভারতভূমিই তাঁদের ধাত্রী ও ধরিত্রী --- ইতিহাসের এযাবৎকালের গবেষণায় এখনো তা পূর্ণরূপে নির্নায়িত হয়নি। তবে মানব সভ্যতার ক্রমবিবর্তনের এক পর্বে, আসমুদ্রহিমাচল এই ভারত যে তাঁদের শাসনে এবং অনুশাসনে নিয়ন্ত্রিত ও শৃঙ্খলিত ছিল এ-সত্য সুপ্রতিষ্ঠিত। এ-সত্যের প্রমাণরূপে সাক্ষ্য দেন বেদ, ব্রাহ্মণ, উপনিষদ, পুরাণ গ্রন্থগুলি এবং বৈদিক, সংস্কৃত ও পালি ভাষায় রচিত প্রাচীন মহান অজস্র সাহিত্যসম্ভার। এই সাহিত্য --- লোক পরম্পরায় 'শ্রুতি' আকারে 'শ্রুত' বা 'পুঁথি' আকারে লিপিবদ্ধ। বৃহত্তর ভারতবর্ষে বা ভারতীয় উপমহাদেশে, যে মহাদেশ উত্তরে হিমালয় থেকে দক্ষিণে ভারত মহাসাগর, পশ্চিমে সিন্ধু নদের উপত্যকা হতে পূর্বে  ব্রহ্মপুত্র নদ পর্যন্ত বিস্তৃত। এ-হেন মহাদেশের সর্বত্রজুড়ে যে ঐতিহাসিক বা প্রাগৈতিহাসিক কোন যুগে কখনো একটি নির্দিষ্ট সভ্যতা গড়ে উঠেছিল --- এমন কল্পনা করা ঘোর অযুক্তিক। তবে এই 'ভারত' নামের এই বিপুল ভূমিখণ্ডে আর্য 'জাতি' বা জনগোষ্ঠী ধীরে ধীরে পশ্চিম থেকে পূর্বে এবং পরবর্তী কালে ক্রমান্বয়ে দক্ষিণের উপদ্বীপ (Decan Peninsula)-পেরিয়ে আরো দক্ষিণে ও দক্ষিণপূর্বের দ্বীপময় ভারতেও ছড়িয়ে পড়ে, আধিপত্য বিস্তার করে। কিন্তু আর্যজাতি কোন একটি নির্দিষ্ট ধর্মধারণা প্রবর্তনার  (-- যেমনটি ঘটেছে আব্রাহামীয় ধর্মগুলির যথা জরাথুষ্ট্রিয়ান, ইহুদী, খ্রীষ্টান ও স্বতন্ত্রভাবে ইসলাম ধর্মের ক্ষেত্রে ) চেষ্টা করেনি। অধিগৃহীত দেশে বা বিজিত জাতিগোষ্ঠির উপর শাসনক্ষমতার সঙ্গে ধর্মের অনুশাসন আরোপন করবার জন্য অস্ত্রের প্রয়োগ করেনি (পৌরাণিক কালের পূর্ববর্তী সময়ে) বরং ন-আর্য জাতির লোকায়ত ধর্মের আদর্শ ও সংস্কারগুলিরও আর্যায়ন ঘটিয়েছিল।
(এই 'লোকায়ত ধর্মধারণা' বিষয়টি আবার এমনই জটীল এবং ব্যপ্ত যে তার জন্য আরও একটি স্বতন্ত্র আলোচনা প্রয়োজন)। 

আপাতত আমাদের আলোচনার বিষয় স্বামী রঙ্গনাথানন্দজীর 'উপনিষদের সন্দেশ' গ্রন্থ। 'আর্য জাতির ক্রমবিকাশ, ক্রমবিস্তার এবং ন-আর্য জাতির আর্যায়ন ও লোকায়ত ধর্মধারণার' প্রসঙ্গটির উপস্থাপনা এই কারণেই যে বেদ, বেদাঙ্গ ও ব্রাহ্মণ গ্রন্থগুলির পরবর্তী অধ্যায়ে যখন বেদান্ত বা উপনিষদের যুগে এসে 'আর্য সভ্যতা' স্থিতিলাভ করল তখন আর্যত্ব ও অনার্যত্বের মধ্যে এক মহাসম্মিলন (great assimilation) সংঘটিত হয়েছে ; বিশেষ করে ধর্মতাত্ত্বিক ও দার্শনিকতার পরিমণ্ডলে। এই বৌদ্ধিক পরিমণ্ডলের তখন দুটি ভাগ স্পষ্টরূপে প্রতীয়মান ছিল ---- আস্তিক্যবাদ ও নাস্তিক্যবাদ। প্রথম ভাগের অন্তর্ভুক্ত এই উপনিষদ বা ঔপনিষদিক ধ্যানধারণা এবং দ্বিতীয় ভাগের মধ্যে পড়ে বৌদ্ধিক ক্ষেত্রে লোকায়তিক ধ্যানধারণা -- যার চরম বিকাশ, প্রকাশ বা অভিব্যক্তি গৌতম বুদ্ধ ও বর্ধমান জৈনমুনি মহাবীর-প্রচারিত ধর্মধারণায় | 

এইভাবে ভারতীয় আর্য-ধর্মের বিভিন্ন প্রকার বিবর্তনের কালে ভিন্ন ভিন্ন মতবাদ গড়ে উঠেছে ঠিকই কিন্তু তা সত্ত্বেও সমস্ত রকমের মতবাদ, ন-আর্যদের গোষ্ঠীকেন্দ্রিক স্বতন্ত্র স্বতন্ত্র মতবাদ, লোকায়তিক মতবাদ --- সকলের অন্তিম মীমাংসা যেন এই উপনিষদের মধ্যেই প্রাপ্তব্য। সনাতন ভারতাত্মার জ্ঞানালোকের জ্যোতির্ময় বিগ্রহ এই উপনিষদগুলি, প্রধানত প্রথম পর্বের বা প্রাচীনতর  উপনিষদগুলি, যেমন ঈশা, কেন, কঠ, প্রশ্ন, ঐতরেয়, তৈত্তিরীয়, ছান্দোগ্য, বৃহদারণ্যক, মুণ্ডক ও মাণ্ডুক্য ---- যেগুলির ভাষ্য রচনা করেছেন শঙ্করাচার্য, নবম শতাব্দীর প্রথম দিকে। 

ভাবতে গেলে বিস্ময়ে অভিভূত হতে হয় খ্রীষ্টপূর্ব হাজার হাজার বছর আগে কি এমন জীবনবোধের আকাঙ্ক্ষা ভারতের তপোবনের মানুষদের (ঋষি, মুনি, ঋষিকা, মুনীপত্নী নামে যাঁরা সম্বোধিত হতেন) প্রাণিত করেছিল যার জন্য জৈবিক প্রবনতাগুলিকে লালন করার পরেও আত্মিক এবং পরমাত্মিক জীবনবোধের সাধনায় তাঁরা নিমগ্ন হতে পেরেছিলেন ? এবং সাধনার সেই সূক্ষ্ম ও সুকঠিন পথের, সাধনার সেই পরম প্রাপ্তির বিবরণ এবং বর্ণনা দিতে গিয়ে কেমন করেই বা আবিষ্কার করে‌ গেলেন এক সুন্দর মধুর, যুগপৎ জঠীল ও গভীর ব্যঞ্জনাধর্মী ভাষার ! (বৈদিক না হলেও আমরা সংস্কৃত রূপে যা পেয়েছি। বৈদিক অর্থাৎ যে ভাষায় 'বেদ' স্ফুরিত হয়েছে, আর 'সংস্কৃত' অর্থাৎ যে ভাষায় পরবর্তী কালে বেদ, ব্রাহ্মণ, পুরাণ ও সাহিত্য রচিত হয়েছে, এই দুটি ভাষা কিন্তু এক নয়। বেদের ক্ষেত্রে 'স্ফুরিত' শব্দটির প্রয়োগ করা হোল এই কারণে যে ঋষিদের মুখনিঃসৃত বাণী যা লিখিত ছিল না। শ্রুত ও শিষ্যপরম্পরায় বাহিত। তাই বেদ শ্রুতি নামেও আখ্যাত। যদিও সারস্বত সমাজে এ বিষয়ে ঘোর দ্বন্দ্ব আজও বিদ্যমান)। 

যাই হোক্, আমরা উপনিষদে বিধৃত জীবনবোধের আলোচনার ফিরে আসি। স্বামী রঙ্গনাথানন্দ উপনিষদগুলির আরম্ভকালেই যে কথা বলছেন তা তাঁর আজন্ম অধ্যাত্মসাধনা ও সুগভীর শ্রদ্ধা-সমন্বিত মণীষার পরিচয়বাহী। তিনি লিখছেন, ---- 

"উপনিষদের বাণীগুলি মহান সঙ্গীতের মতো, যার সুরমূর্ছণা শত শত বছর ধরে সংবেদনশীল মানুষের হৃদয়কে আবিষ্ট করে রাখার শক্তি ধারণ করে। শ্রদ্ধার সঙ্গে, অনুসন্ধিৎসু মন নিয়ে, নারী পুরুষ নির্বিশেষে, যিনিই উপনিষদগুলি অনুশীলন করবেন, তিনিই উপলব্ধি করবেন,স্পষ্ট ,গভীর কাব্যময় ও উদাত্ত ভাষায় উচ্চারিত বাণীগুলির অতলস্পর্শী, মহিমময় মনোহারিত্ব। অধ্যাত্মসাধক উপনিষদ পাঠ করলে অনুভব করবেন, তিনি অনুশীলন করছেন এমন একটি বিষয় নিয়ে, যা তাঁর  নিজের জীবন ও ভবিতব্যের অতি ঘনিষ্ট, এমন এক সত্তা নিয়ে, যা আপন অন্তরে, আবার বহির্বিশ্বে সমান বিদ্যমান।"
এর পরই তিনি ঈশোপনিষদের সেই মহা মন্ত্রটির ( যে মন্ত্রটি আমরা যজুর্বেদীয় উপনিষদের শান্তি পাঠেও উচ্চারণ করে থাকি) উল্লেখ করেছেন, 


ওঁ পূর্ণমদঃ পূর্ণমিদং পূর্ণাৎ পূর্ণমুদচ্যতে
পূর্ণস্য পূর্ণমাদায় পূর্ণমেবাবশিষ্যতে।
ওঁ শান্তিঃ ওঁ শান্তিঃ ওঁ শান্তিঃ----।। 


স্বামী রঙ্গনাথানন্দ তাঁর ব্যপ্ত ও গভীর প্রজ্ঞার আলোতে এই মধুর, আপাত সরল অথচ গূঢ় ব্যঞ্জনাধর্মী মন্ত্রটির ব্যাখ্যা করেছেন। ঈশ্বরপ্রতিম আচার্য শঙ্করের ভাষ্যের অবতারণা করেছেন। পাশ্চাত্য মণীষীদের, যেমন William James, Fred Hoyle, Pierre Teihard de Chardin, Julian Huxley-র মতামতের সঙ্গে এই মন্ত্রের অন্তর্নিহিত ভাবের সামঞ্জস্য খুঁজেছেন। কিন্তু আমাদের মত সাধারণের বোধগম্যতায় যতটুক ধরে তার‌ জন্যও করুণাপরবশ হয়ে সচেষ্ট থেকেছেন।

মন্ত্রটির শব্দার্থ এই রকমঃ
'অদঃ' শব্দের অর্থ ঐ, দূরের বস্তু। 'ইদম' অর্থে এই, চোখের সামনে যা দেখা যায়, স্পর্শ করা যায়। 'পূর্ণ' এখানে ব্রহ্ম, চৈতন্যসত্তা। 


'পূর্ণস্য পূর্ণমাদায় পূর্ণমেবাবশিষ্যতে।। মহাচৈতন্যের (ব্রহ্মের) পূর্ণতা থেকে বিশ্বের 'পূর্ণতা', পূর্ণ থেকে পূর্ণ নিলে পূর্ণই অবশিষ্ঠ থাকে।
আরাধ্য শঙ্করাচার্য, স্বামী বিবেকানন্দ এবং বর্তমান ব্যাখ্যাতা স্বামী রঙ্গনাথানন্দ -- সাধনালব্ধ প্রজ্ঞায়‌‌ এই সাধকগণ উপনিষদের মহামন্ত্রের গভীরে প্রবেশ করেছেন এবং বলতে চেয়েছেন সৃষ্টির চৈতন্যসত্তা একটি অক্ষয় অব্যয় অদৃশ্য অস্তিত্ব। আপনাতে আপনি পূর্ণ। সেই 'পূর্ণ' থেকে আগত এই দৃশ্যমান জগতও পূর্ণ। আমরা এই জগতের (ইদম্) ক্ষয়, ক্ষতি, লয়--- যা লোকচক্ষুতে দেখি তা সত্য নয়। পূর্ণ হতে‌ কিছু নিলে বা পূর্ণে কিছু অর্পণ করলে পূর্ণের কোন বিকার ঘটে না। জীবাত্মা মোহের বশবর্তী হয়ে ধন, জন, মান, অহংকার ----- যা কিছু আগলে রাখতে চায় সে সবের ক্ষতি বা ক্ষয় মানতে পারে না। মায়া মোহে আচ্ছন্ন প্রাণ হাহাকার করে ওঠে। কিন্তু উপনিষদ বলছেন, এই অজ্ঞানতাপ্রসূত শোক বৃথা। 

আমাদের ঋষিকবি রবীন্দ্রনাথ বলছেনঃ
"হে পূর্ণ  তব চরণের কাছে
যাহা কিছু সব আছে আছে আছে।
নাই নাই ভয়, সে শুধু আমারই
নিশি দিন কাঁদি তাই।।" 

কিন্তু আমাদের মত ইন্দ্রিয়সর্বস্ব মানুষদের তবে কি 'ভয়ে'র দ্বারা ("হারাই হারাই সদা মনে হয়....") নিত্য নিগৃহীত হওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। ইন্দ্রিয়ানুভূতির যে জগৎ তার কি কোন যথার্থতা নেই ? উপনিষদ বলছেন আছে। তাও আছে। তবে সেই ইন্দ্রিয়ালুতা যেন চৈতন্যরূপ চিদাকাশটিকে আচ্ছন্ন করে না ফেলে। ইন্দ্রিয়-ভোগ-স্পৃহার সঙ্গে যদি বিবেক ও হৃদয়বত্তার যোগ থাকে তবে পরম সত্তার করুনা লাভ করা যায়। স্নেহ, প্রেম, দয়া এবং সেবা মানব ধর্মের শ্রেষ্ঠ অভিব্যক্তি।‌তার দ্বারা পরমের (ultimate) সঙ্গে মিলন অবশ্যম্ভাবী।‌
এ-স্থলে ভগবান শঙ্করাচার্য তাঁর একটি অপূর্ব স্তোত্রে মানুষের উদ্দেশ্যে বলছেন,---- 

মূঢ় জহীহি ধনাগমতৃষ্ণা, কুরু সদবুদ্ধিং মনসি বিতৃষ্ণাম।
জল্লভসে নিজ কর্মোপাত্তং বিত্তং তেন বিনোদয় চিত্তম।।

হে মূর্খ, অত্যাধিক আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ কর, তোমার মনকে শুভচিন্তায় ও সত্যে বাঁধ। অনাসক্তি অনুশীলন কর। তবেই মনে ও প্রাণে আনন্দ লাভ করবে, (বিনোদয় চিত্তম্ )‌

একথা মায়াবাদী, ব্রহ্মবিদ শঙ্করাচার্য বলতেই পারেন, আমাদের ইন্দ্রিয়প্রাবল্যকে ভর্ৎসনা করতেই পারেন কিন্তু জলের মধ্যে থেকে মাছ যেমন জলের প্রতি আসক্তি অস্বীকার করতে পারে না, আমরাও তেমনই এই জগৎ প্রপঞ্চের মধ্যে থেকে ভোগাসক্তি স্বীকার করতে বাধ্য।
তবে উপায় ?
                 

1 টি মন্তব্য:

Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...