শনিবার, ১৪ ডিসেম্বর, ২০২৪

বাঙলা ও বাঙালীর চিরন্তন দুর্গতি। ---- পর্ব দুই। বাঙালী কি সনাতনী ?


বাঙলা ও বাঙালীর চিরন্তন দুর্গতি ---পর্ব দুই। 

বাঙালী কি 'সনাতনী' ? 

(পরিমার্জিত সংস্করণ)

বঙ্গবধূ, পোড়ামাটির ফলক, চন্দ্রকেতুগড়। 
সৌঃ বাঙালীর ইতিহাস/ নীহার রঞ্জন রায়।

সমগ্র হিন্দুধর্মকে সনাতন বলা যায় কি ?
এই প্রশ্নের উত্তরে প্রথমে আমরা দেখি সনাতন শব্দের আভিধানিক অর্থ। সনাতন শব্দের অর্থ যা চিরন্তন, শাশ্বত, নিত্য, চিরস্থায়ী, অক্ষয় বা অপরিবর্তণীয়। এই শব্দার্থের নিরিখে বিচার করলে দেখা যাবে হিন্দুধর্ম শাশ্বতও নয়, অপরিবর্তনীয়ও নয়। কাজেই সামগ্রিকভাবে হিন্দুধর্মকে সনাতন ধর্ম বলার মধ্যে অনেকখানি ভ্রান্তি আছে।
বাবরি মসজিদ ধ্বংসের (৬ ডিসেম্বর, ১৯৯২) পরে পরেই তৎকালীন দেশ পত্রিকার একটি বিশেষ সংখ্যায় সুপণ্ডিত অমলেশ ত্রিপাঠী মহাশয় লিখেছিলেন, 

"সমগ্র হিন্দুধর্মকে সনাতন বলা অনৈতিহাসিক।‌ তা দীর্ঘদিনের, চিরকালের নয়। অনার্য, প্রাগার্য্য, আর্য, বাহ্লিক, গ্রীক, মধ্য এশিয়ার যাযাবরদের নানা জাতিগোষ্ঠি, নানা ভাষাভাষী, নানা প্রগতিশীল এবং অনগ্রসর সংস্কৃতির যে মিলনের ছবি রবীন্দ্রনাথ দেখেছেন, তা গভীর ঐতিহাসিক দৃষ্টির পরিচায়ক।"
ঐতিহাসিক সমাজবিবর্তনের ফলেই গড়ে উঠেছে জাতিভেদ, জন্মান্তরবাদ, কর্মতত্ব ---- বৃক্ষ, যক্ষ, নাগ থেকে বিষ্ণু, শিব, শক্তি। এসেছে গৌতম বুদ্ধের ধর্মধারণার নিরীশ্বরবাদী তত্ত্ব। প্রচলিত হয়েছে নানা দেবতার পূজা, তন্ত্রমন্ত্র ? উপনয়ন, বিবাহ, শ্রাদ্ধের মত মন্ত্রপুত, আচারসর্বস্ব অনুষ্ঠান। পরবর্তীকালে সেই বিধি বিধান নিয়ন্ত্রিত অনুষ্ঠানগুলি লোকাচারে কৌলিক ও সামাজিক হয়ে দাঁড়ালো। ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলি যেমন যাগযজ্ঞ, পূজা, উপাসনা, ব্রত, পার্বণ, বিধিবিধান পালন। অনার্য বা মূল দ্রাবিড়ীয় ধর্মধারণার সঙ্গে মিলন ও মিশ্রণের (assimilation) ফলে বিভিন্ন দেব দেবীর বিগ্রহ --- মূর্তি, প্রতিমার সৃষ্টি হোল। সে সকল বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা, রক্ষা, ধর্মালোচন পূজার্চনার জন্য গড়ে উঠল মন্দির, আশ্রম, আখড়া। ইসলামের মসজিদ, খ্রীষ্টানদের গীর্জা এবং বৌদ্ধ-জৈনদের স্তুপ, প্যাগোডা, মঠের কাহিনী অন্যরকম ; অন্য সময় সে কাহিনী বিস্তারে আলোচনা করা যাবে। 


এবার ধর্ম নিয়ে দু'কথা বলে আমরা হিন্দুধর্মে ফিরে যাব। বুৎপত্তিগতভাবে ধর্ম হোল তাই যা ধারণ করে। কাকে ধারণ করে, ব্যক্তি মানুষকে না মনুষ্য সমাজকে ? শুধুমাত্র তাদেরকে, যারা ধর্ম শব্দটির প্রথম আমদানি করেছে, অর্থাৎ ভারতবর্ষের প্রাচীন আর্যদের, নাকি সমগ্র বিশ্বচরাচরকে ? প্রাচীন আর্যদের শ্রুতি বলে, ধর্ম হোল 'ঋত', শাশ্বত সত্য, (পরমাত্মা বা ব্রহ্ম) যা বিশ্বকে --- ভূতরূপ ব্রহ্মাণ্ডকে নিয়ন্ত্রণ করে অর্থাৎ যা বিশ্ববিধান, যা চিরসত্য। যাকে লাভ করতে হলে তপস্যা ও ধ্যানের পথ অবলম্বন করতে হবে এবং যাকে লাভ করলে অন্তরাত্মা একাধারে  চিদানন্দ ভোগ করবে ও মোক্ষ লাভ করবে। জীবাত্মার তাইই শেষ উদ্দিষ্ট ও পরম গতি। প্রথমত তার উপলব্ধির মধ্যে এই সত্য প্রতিভাত হবে যে প্রাণের উৎসে আছে সৃষ্টির আনন্দ এবং শেষ সঙ্গমেও আছে আনন্দ। 


"আনন্দাদ্ধেব খল্বিমানি ভূতানি জায়ন্তে
আনন্দেন জাতানি জীবন্তি
আনন্দং প্রয়ন্তাভিসংবিশন্তি।।"
                   -----তৈত্তিরীয় উপনিষদ। 

এই আনন্দই জীব চৈতন্যের উ্যৎস, আনন্দেই তার স্থিতি এবং আনন্দেই তার বিলয়।
ধর্মের এই সংজ্ঞা (defininition) কি খ্রীষ্টান, মুসলিম বা ইহুদীদের মত বড় বড় ধর্মপ্রতিষ্ঠানগুলি মানবেন? হিন্দুরাই(?) মানবেন কি ? বেদবাদী মীমাংসকরা তো বেদে নির্দেশিত ক্রিয়াকর্ম মানে, ঈশ্বরে বিশ্বাস করে না। এদিকে গীতা-প্রবক্তা স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন ধর্ম লোকহিতে, ধর্ম বেদে নেই। 
এবারে পাশ্চাত্য পণ্ডিত দার্শনিকদের কাছে ধর্মের সংজ্ঞা তো বিচিত্র, বিভিন্ন। স্পিনোজা ঈশ্বরে ব্যক্তিত্ব-আরোপন মানেন না কিন্তু ঈশ্বরে নিবেদিতপ্রাণ। এইভাবে কান্ট বললেন ধর্ম হোল 'লক্ষ্যস্থল' (জীবনের চরিতার্থতার চুড়ান্ত স্থান) ; কিছু নীতি (principles) এবং নৈতিকতাবোধ (morality), যেগুলি মানুষকে ঐ লক্ষ্যস্থলে পৌঁছে দিতে সাহায্য করে। এইরপর ফ্রয়েড, রুডলফ অটো, ব্রাডন, আঁদ্রে মনরো, সার্ত্রে, কার্ল মার্কস প্রভৃতি দার্শনিকরা ধর্মের নানাবিধ ব্যাখ্যা দিয়েছেন।  সকলেই শেষ সিদ্ধান্তে নীতিবাদী। তারই মধ্যে ফ্রয়েড মহাশয়, মার্কস মহোদয় এবং ব্রাডন স্যারের সিদ্ধান্ত একটু আলাদা আলাদা।
"ধর্ম হচ্ছে একটা কাল্পনিক আশ্বাস, একটা যৌথ বিকার, মরীচিকার ছলনা।"---সিগমুন্ড ফ্রয়েড।
"ধর্ম হোল বিচ্ছিন্ন মানুষের (alienated) জাতিসত্তার  কল্পনা, আফিং জাতীয় নেশার বস্তু।" ----কার্ল মার্কস।
(আফিংয়ের সঙ্গে, এই লেখকের  মতে, গাঁজা বা hashis যোগ করলে ভালো হোত কেননা এই পোড়া দেশে আমার মতো বাউলবাবা ও আমার বন্ধুর মতো ভষ্মমাখা সাধুবাবারা তাহলে বেজাই খুশী হোতাম)। 

"ধর্ম হচ্ছে মানুষের শঙ্কিত মৃত্যুচেতনার প্রতিক্রিয়া।"
                               ---এস জি এফ ব্রাডন। 


মহান অস্তিত্ববাদী গ্রীক দার্শনিক, পিথাগোরাসের গুরু থেলিস আমাদের উপনিষদের ঋষিদের মতই বলেছেন,
"ধর্ম হোল মানুষের নিজেকে অতিক্রম করে পরমের  (ultimate) অভিমুখে যাত্রার আকুতি।"  

এগুলি তো হোল ধর্ম নামক একটি বিমূর্ত আদর্শের দিক। কিন্তু ধর্ম বলতে আমরা ঐ বিমূর্ত আদর্শকে পালন করি না। পালন করি, লালন করি কিছু অনুষ্ঠান, কিছু  প্রচলিত সংস্কার, কিছু অভ্যস্ত রীতি। হিন্দুদের যাগযজ্ঞ পূজা উপাসনা ব্রত পার্বণ, জন্ম বিবাহ শ্রাদ্ধের সময়ে কিছু কৌলিক ও সামাজিক সংস্কার। তেত্রিশ কোটি না হলেও অন্তত গোটা তেত্রিশটি বা গোটা পঞ্চাশেক দেব দেবীর ভিন্ন ভিন্ন মন্ত্র-তন্ত্র উচ্চারণ করা, দেব দেবীদের পছন্দ মাফিক (individual choice) নৈবেদ্য নির্মাল্য জোগাড় করাও ধর্মাচরণের মধ্যে পড়ে। সমস্ত অনুষ্ঠান, সামাজিক কৌলিক এবং কখনো কখনো ব্যক্তিক যেগুলি ভারতের অ-মুসলমান, অ-খ্রীষ্টানরা পালন করেন -- সমস্তই ধর্ম। সমবেতভাবে দুর্গাপূজার অঞ্জলি দেওয়া যেমন ধর্ম তেমনি একজন পৈতেধারীর (স্বঘোষিত ব্রাহ্মণ) একান্তে গায়ত্রীমন্ত্র জপ করাও ধর্ম। (মুসলমান, খ্রীষ্টান, বৌদ্ধ বা আদিবাসী সম্প্রদায়ের ধর্মাচরণ ভিন্ন প্রসঙ্গ)। 

বাঙলার লোকায়ত ধর্মের সঙ্গে মৌলিক আর্য-ধর্মের, (যে পুরাতন ধর্মধারণা ও ধর্মাচরণ বেদ-বিহিত, ব্রাহ্মণ-উপনিষদ গ্রন্থ এবং সাংখ্য-মীমাংসা-স্মৃতিশাস্ত্র  অনুমোদিত) কোন সাদৃশ্য নাই। মনসা মঙ্গল, চণ্ডীমঙ্গল, অন্নদা মঙ্গলের দেবতারা আর যাই হোন আর্যদের দেবদেবী নন। 

পৌরাণিক কাল থেকে আরেকটি ধর্মধারণার চিন্তা প্রাধাণ্য লাভ করে এবং শ্রেষ্ঠতম ধর্ম বলে বিবেচিত হয়। সেটি সর্বমানবের ধর্ম---মনুষ্যধর্ম বা মানবধর্ম। এই ধর্ম সম্পূর্ণ অ-প্রাতিষ্ঠানিক, অসাম্প্রদায়িক এবং অনুষ্ঠান বর্জিত। মহাভারতে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধারম্ভের প্রাককালে জয়াকাঙ্ক্ষী দুর্যোধন মাতা গান্ধারীর নিকট আশীর্বাদ প্রার্থনা করলে দেবী গান্ধারী বলেছিলেন, "যতো ধর্মস্ততোজয়ঃ।" ব্যাসদেব তাঁর ঔরসপুত্র ধৃতরাষ্ট্রকে যুদ্ধ থেকে নিবৃত্ত করার বিফল চেষ্টায় হতাশ হয়ে শেষে ঐ একই কথা বলেছিলেন। এ কোন গ্রন্থনির্ধারিত ধর্ম নয়। কোন religion নয়। গীতায় শ্রীকৃষ্ণের বাণীর প্রতিধ্বনি করে বঙ্কিমচন্দ্রও বলেছেন, ধর্ম লোকহিতায়--লোকের হিতসাধনই ধর্ম। এই ধর্ম কোন শাস্ত্রীয় ধর্ম নয়। মানুষের, সমাজের হিতসাধন ধর্ম না হোক্, অহিতসাধন যে অধর্ম তা কোন ধর্মধারণাই অস্বীকার করতে পারে না। 

 মিথ্যাচার, হিংসা, বিদ্বেষ, স্বার্থপরতা, শঠতা --- এই সব অপগুণগুলি নৈতিকতার পরিপন্থী এবং অবশ্যই 'অধর্ম'। একই প্রকারে হনন, লুণ্ঠন, নারী নির্যাতন, শিশুনিধন, ধর্ষণ -- এগুলিকেও তো মানবিক বিবেক, মানব সমাজের বিচার অনুমোদন করে না। তা হলে এই সিদ্ধান্তে উপনিত হওয়া যায় যে ধর্ম হোল তাই যা বিশ্ব-মানবজাতির মঙ্গল বিধান করবার জন্যে আচরণীয় সংস্কার। যে সংস্কার বা সংস্কারগুলি আচরণীয় তা হোল কর্ম। এই কর্মের নিরিখে ধর্মের বিচার হোক্ সমাজবিবেক তথা বিশ্ববিবেকের আদালতে।‌ সেই বিচার নরবলি, নারীঘাতী শিশুঘাতী, কৃষ্টি-সংস্কৃতি-ধংসকারী যুদ্ধ, দাঙ্গার মত বীভৎসাকে অনুমোদন করবে না। পরিবর্তে প্রেম, অহিংসা মৈত্রী করুণার মত মানবোচিত সদ্গুণের পক্ষেই রায় দান করবে --  (deliverance of supreme Verdict)। এটিকেই 'মানব সভ্যতার ধর্ম' রূপে গ্রহণ ও লালন করার মধ্যে দ্বন্দ্ব থাকবার কথা নয়।

                                দুই 

বাঙলার জাতিতত্ত্ব ও মিশ্রিত জাতিসত্তা।


"বাঙালী জাতির যুগে যুগে আগত সুদীর্ঘ জাতিপ্রবাহের ইতিহাস আলোচনায় একটি সুস্পষ্ট তথ্য‌ ধরা পড়ে। সেটি এই : নরত্ত্বের দিক হইতে বাঙলার জনসমষ্টি মোটামুটি দীর্ঘমুণ্ড, দীর্ঘ ও মধ্যোন্নতনাস মিশর-এশীয় বা মেলানিড, বিশেষভাবে গোলমুণ্ড, উন্নতনাস আলপাইন বা পূর্ব-ব্রাকিড, এই তিন জনের সমন্বয়ে গঠিত। নিগ্রবটু রক্তের স্বল্প প্রভাবও উপস্থিত, কিন্তু তাহারা সমাজের খুব নিম্নস্তরে এবং সংকীর্ণ স্থান- গণ্ডির মধ্যেই আবদ্ধ। মঙ্গোলীয় রক্তের কিছুটা প্রভাব আছে, কিন্তু তাহাও উত্তর ও পূর্বদিকে সংকীর্ণ স্থানগণ্ডির সীমা অতিক্রম করে নাই। আদি-নর্ডিক বা খাঁটি 'ইণ্ডিড্' রক্ত প্রভাবও অস্বীকার্য, কিন্তু সে ধারা অত্যন্ত শীর্ণ ও ক্ষীণ। মোটামুটিভাবে ইহাই বাঙলা ভাষাভাষী জনসৌধের চেহারা এবং এই জনসৌধের উপরই বাঙালীর ইতিহাস গড়িয়া উঠিয়াছে। এই বিচিত্র সংকর-জন লইয়াই বাঙলার ও বাঙালীর ইতিহাসের সূত্রপাত।"

       - 'বাঙলার ইতিহাস'-- নীহার রঞ্জন রায়। 


গবেষক নীহার রঞ্জন রায় আরো একটি সাহসী ও সত্যকথা লিখেছেন যে, বস্তুত বাঙালী ব্রাহ্মণ- বৈদ্য-কায়স্থ জনতত্ত্বের দিক হইতে একই (বর্ণসংকর)গোষ্ঠীর লোক বলিলে কিছু অবৈজ্ঞানিক কথা বলা হয় না।
বাংলায় সেন রাজাদের আগে প্রায় তিন'শ বছর পাল রাজবংশ রাজত্ব করে। পাল রাজারা ছিলেন বৌদ্ধধর্মের পৃষ্টপোষক। বেদবাদী, ব্রাহ্মণ্যবাদী উত্তর ভারতের উন্নাসিক উচ্চবর্ণের লোকেরা বৌদ্ধ ধর্মকে 'সনাতন' আখ্যা দিতে চায়না। কারণ বৌদ্ধধর্ম বর্ণবিভেদ স্বীকার করে না। কাজেই সেন রাজত্বের আগে বঙ্গদেশে 'সনাতনী' ধারণার অস্তিত্বই ছিল না। এবং সেই জন্যই সেন বংশের (দক্ষিণ ভারতীয় দ্বিজরাজ ওষধিনাথ বংশের উত্তরাধিকারী) দ্বিতীয় রাজা বল্লাল সেন উত্তর ভারতের 'উপাধ্যায়' গোষ্ঠীর কিছু লোককে এনে ব্রাহ্মণ্য সংস্কারের  প্রচলন করেন এবং পরবর্তী সময়ে কৌলিণ্য প্রথা প্রচলিত হয়। 


"আচারো বিনয়ো বিদ্যা প্রতিষ্ঠা তীর্থদর্শনম। 

নিষ্ঠা বৃত্তি তপো দানম্ নবধা কুললক্ষণম্।।" 


এই গুণভিত্তিক কৌলিণ্য প্রথা পরে বংশভিত্তিক হয়ে যায় এবং কিছু অমানবিক, নিষ্ঠুর সামাজিক সংস্কারের জন্ম দেয়। তারি ফলস্বরূপ বাল্য বিবাহ, বহুবিবাহ,‌ সহমরণ, অনুমরণ এবং অন্তর্জলী যাত্রার মত নারকীয় ও বীভৎস সামাজিক অবশ্যকৃত্যগুলির প্রবর্তন হয়েছিল। কাজেই এমনতর একটি ব্রাহ্মণ সমাজকে সনাতনী হিন্দু সমাজ বললে 'সনাতন' শব্দটির কোন গরিমা থাকে কি ? 

আবার বর্তমানে সনাতনপন্থী 'হিন্দু' -- এরূপ একটি সাম্প্রদায়িক ধারণার উদ্ভব ঘটেছে এবং সেটির প্রচার চলেছে আগ্রাসী তৎপরতায়। প্রথমত হিন্দু শব্দটি বৈদিক বা সংস্কৃত শব্দ নয়। যদিও পণ্ডিতদের মতে এটি সিন্ধু শব্দের অপভ্রংশ। শব্দটি, গ্যাভিন ফ্লাডের মতে ফার্সী উচ্চারণ ( অর্থ -- বৃহৎ জলের আধার, অর্থাৎ সিন্ধু নদের পারে যারা থাকে)। এবারে 'হিন্দু' বলতে আমরা যদি ধরেও‌ নি 'প্রাচীন, পরিশুদ্ধ, অবিমিশ্র আর্য জাতি', তবে তারা এখন কোথায় ? সুদূর অতীতের, প্রায় পাঁচ থেকে দশ হাজার বছর পুর্বেকার একটি জাতিগোষ্ঠি যারা মধ্য এশিয়া থেকে দলে উপদলে বিভক্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল ইউরোপে, এশিয়াখণ্ডের বিভিন্ন স্থানে --- যুগ যুগান্ত পরে কি আমরা দাবি করতে পারি  আমাদের রক্তের সেই সুপ্রাচীন অবিমিশ্র পরিশুদ্ধতা ? আমাদের পুরাণ কাহিনীগুলির উদাহরণ দিয়ে দেখানো যায় কতকাল আগে থেকে আমরা আর্য ও ন-আর্যর  মিলিত, মিশ্রিত রক্ত বহন করে চলেছি। তারপর তো এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে 'শক্ হুনদল, পাঠান মোগল এক দেহে হোল লীন'। আবার দু'শ বছরের ইংরেজ আধিপত্য (সর্বক্ষেত্রেই) এখনো অর্বাচীন, অমলিন।‌ আর বাঙলা ? সে তো ছিল 'ডাচ-ফরাসী-মগের মুলুক'।
তাহলে সনাতনী হিন্দু কাদের বলব ? নিরামিষাশী  বৈষ্ণবদের নাকি  আমিষাশী শাক্তদের ? (খাদ্যাখাদ্য নিয়ে বেশী কথা এখানে নয়, সে কথা রামায়ণের রামচরিত  আলোচনায় সবিস্তারে বিবৃত করেছি।)
তাই বেদ, ব্রাহ্মণ (বেদেরই অংশ), পুরাণ মন্থন করে এই মীমাংসকরা, নির্দিষ্ট করে‌ ধর্মধ্বজীরা বলতে পারবেন না, ভারতবর্ষে সনাতন কারা। বাংলায় তো, আমার মতে, সনাতনী সুদুর্লভ। 


                      (ক্রমশঃ)
(পরবর্তী পর্ব তিন। সে পর্বে রবীন্দ্র দর্শনে 'মানুষের ধর্ম ' ও বঙ্গবাসী।)
দুলাল চন্দ্র বন্দোপাধ্যায়
২৩/০৫/ ২০২৬
কলকাতা ।
_____________________________________

  





1 টি মন্তব্য:

  1. অসাধারণ একটি উপস্থাপনা । আপনার লেখা আপনার অন্তহীন ধীশক্তির পরিচয় দেয় । আপনি আরও লিখতে থাকুন । শুভকামনা রইলো

    উত্তরমুছুন

Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...