বৃহস্পতিবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১

আধুনিক বাংলা কবিতা,বাঙলা কবিতার আধুনিকতা এবং ফরাসী কবি Charles Baudelaire .



আধুনিক বাংলা কবিতা, বাংলা কবিতার আধুনিকতা ও 
ফরাসি কবি চার্লস বোদলেয়ার। 
Charles Pierre Baudelaire (1821- 1867) 

বা পুরাতনী যা কিছু, তা নিত্য ব্যবহার্য সামগ্রী হোক বা বিমূর্ত ধ্যান ধারণাই হোক তার প্রতি  আমাদের হয় করুণা, নয় বিতৃষ্ণা থাকেই থাকে। থাকা  অস্বাভাবিক তো নয়ই, অনভিপ্রেতও নয়। বরং  অভিপ্রেত, অনেকাংশে গ্রহনীয়ও। বাঙলা আধুনিক কবিতার আমি বিরুদ্ধ সমালোচক  
নই। আধুনিক সভ্যতার চলমানতা যেমন বহুমাত্রিক, জটিল এবং সকলের কাছে সহজবোধ্য নয়,  (যন্ত্রগণকের ভাষা--- একটি উদাহরণ) ঠিক তেমনি  আধুনিক সাহিত্যের পরিভাষাও অনেক সময় অনেকের  কাছেই দুর্বোধ্য ঠেকে। এই 'অনেকের' মধ্যে আমি একজন। এই ---আজকের যে 'আধুনিকতা', বাঙলা  সাহিত্যে, বিশেষ করে কবিতায় তারও জন্মকাল আছে,  তারও জন্মদাতা বা স্রষ্টারা আছেন। তাঁদের দু-এক  জনের কথা বলা যাক্। তাঁরা কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী কালের কিংবা চন্দ্রাভিযান, গ্রহান্তর যাত্রার পরেকার, দ্বাবিংশ ত্রোয়োবিংশ শতকের কবি নন ; তাঁরা  ফরাসী বিপ্লবের সামান্য কয়েক বছর পরের উনবিংশ শতকের কাব্য রচয়িতা। যেমনঃ 


Charles Baudelaire, বিশ্বের মহান কবিদের একজন, জন্মগ্রহন করেন ১৮২১ খৃষ্টাব্দে, প্যারিসে। 
মৃত্যু ১৮৬৭ খৃষ্টাব্দে,ঐ প্যারিস শহরেই। 
তাঁর চাইতে ২১ বছরের  ছোট ছিলেন Stephane  Mallarme (১৮৪২--১৮৯৮ )।এই দুজনের নাম এক  সঙ্গে উচ্চারিত হয়, কারণ, যখন কবিতায় আধুনিকতার  কথা উঠে তখন এঁরা অপরিহার্য। যেমন ছোট গল্পের  প্রসঙ্গে Guy de Maupassant (১৮৫০-১৮৯৩)। 

এবার ভাবতে হবে ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি বা  সামান্য আগে-পরে যে কবিদের লেখনী সৃষ্টি করেছিল  অসামান্য সব কাব্য-কবিতা সেগুলি আধুনিক ! তাঁদের  সৃষ্টির চমৎকারিত্ব একবিংশ শতকের, তার পরবর্তী  কালের বঙ্গ কবিদের -ও প্রভাবিত করে ? করে বৈকি।  না  করলে এই বাঙলাদেশটার, রবীন্দ্রনাথের সমকালও পরের কালের ঝাঁকে ঝাঁকে কবি প্রাণপণ চেষ্টা করে গেছেন, প্রাণপাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন রাবীন্দ্রিক প্রভাবমুক্ত কবিতা রচনা করার প্রয়াসে। 

এবার দেখা যাক, কেমন এই ফরাসী কবিদের, বিশেষ  করে আজকের আলোচিত Baudelaire- য়ের কবিতা : 
তাঁর (ইংরেজিতে ভাষান্তরিত The Flowers Of Evils থেকে) একটি অসাধারণ সৃষ্টি--- 
 
            The Joyous Defunct 
...................................................

Where snails abound---in a juicy soil, 
I will dig for myself a fathomless grave, 
Where at leisure mine ancient bones I can coil 
And sleep--quite forgotten--like a shark 'neath  the wave. 

I hate every tomb--I abominate wills, 
And rather than tears from the world to  implore, 
I would ask of the crows with their vampire bills 
To devour every bit of my carcass impure. 

Oh worms, without eyes, without ears, black friends! 
To you a defunct-one, rejoicing, descends, 
Enlivened Philosophers--offspring of Dung ! 

Without any qualm, o'ver my wreckage spread, 
And tell if some torment there still can be wrung 
For this soul-less old frame that is dead 'mdst 
the dead ! 

                  Translated into English verse 
                                     By
                             Cyril Scott
...............…..................................................
বাঙলা অনুবাদ
অনুবাদক-- দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় 

          কবরে উল্লাস
_______________________

শামুক যেখানে গাদা গাদা, আর গদগদে কাদা, 
সেখানে খুঁড়বো আমি সপ্তনরকের গাঁড়া-- 
আমারই কবর। আহা, কী আরাম ! 
পুরাণো হাড়ের অনড় কুণ্ডলী, বিস্মৃত-অস্তিত্ব আমি, 
মাটি-চাপা মমি ; 
কিম্বা সাগরের তলে ঢোকা হাঙরের কঙ্কালের পারা। 

স্মৃতিসৌধ ? ঘেন্না করি... ঘেন্না করি আমি। 
মরণত্তর ইচ্ছাপত্র ? শুনলে আসে বমি। 
জগৎ-সংসার থেকে চেয়ে কিছু,-- কাঁদা ? 
তার চেয়ে ভালো ওই বয়স্য বায়সদের সাধা -- 
তারা রক্তচোষা ঠোঁট দিয়ে ছিঁড়ে ছিঁড়ে, 
গিলে গিলে খাবে গব্ গব্ 
আমার এই সত্বহারা, অপবিত্র শব। 

চোখ নাই, কান নাই-- 
চির-অন্ধকারে-থাকা, হে আমার কীট ক্রিমি ভাই, 
তোমাদের কাছে এই মড়া-- 
তোমাদের নব্য-দর্শনে পড়ে ধরা-- 
স্বর্গ থেকে ছুঁড়ে ফেলা পশুত্বের বিষ্ঠার সন্তান। 

সাম্রাজ্য বিস্তার কর্ এই মরা ধড়ের উপর 
নির্ভয়ে, নির্দ্বিধায়, বন্ধুরা আমার। 
শুধু একবার নিঙড়ে, ঝেড়ে দে-- 
ভিজা, ছেঁড়া কোটটার মতো, 
আত্মা-আমিত্ব-হীন দেহটাকে, 
রয়েছে যে পড়ে স্তুপাকার মৃতদের মাঝে, 
এবং বলে দিস্ মড়াটাকে 
এখনও সামান্য কিছু থাকতে পারে কি না 
কোন কান্না বিগত দিনের, 
কোন ক্ষতি, ক্ষয়, হাহাকার, ক্ষতের যন্ত্রনা ! 

                         (বায়স=কাক, crow)

ফরাসী ভাষা, চসারের সময়কাল থেকে ইংরেজি ভাষা, দান্তের সময়কালের ইতালি ভাষার মতোই আমাদের বাঙলা ভাষাও বৈষ্ণব পদাবলীর রচনাকাল থেকেই  সমস্ত রকম ভাবের, রসের, সংবেদনশীলতার পরিবাহী, নমনীয়, কমনীয় এবং ধ্বনি-অলঙ্কার সমৃদ্ধ শব্দসম্ভারে পরিপূর্ণ। 
বঙ্গভারতী সৌন্দর্যে, লাবন্যে রাজরাজেশ্বরী-- 

"হে বঙ্গ, ভাণ্ডারে তব বিবিধ রতন...।" 
তাই, বাঙলা ভাষান্তরে এই সত্যটি প্রতিষ্ঠা পেয়েছে যে  নিরীশ্বরবাদী, যুদ্ধ-দাঙ্গা, অবিশ্বাস-দ্বন্দ্ব বিধ্বস্ত বিংশ  শতকের বঙ্গকবিরাও --বুদ্ধদেব বসু থেকে  শঙ্খ ঘোষ--Baudelaire  দ্বারা প্রভাবিত। (Mallarme-র  আলোচনা পরবর্তী পর্বে )। তা সত্ত্বেও সনাতন  ভারতবর্ষের বেদ-উপনিষদীয় আনন্দবাদের মূর্ত বিগ্রহ রবীন্দ্রনাথের জ্যোতির্বলয়ের দিগন্তরেখা তাঁরা অতিক্রম  করতে পারেন নি। সেই জন্য বুদ্ধদেব বসুকে বলতে হয়, 

"রবীন্দ্রনাথ আমাদের কাছে দুর্বহ ভার।" 
কবি শঙ্খ ঘোষ মহাশয়ের আরো বড় পরিচয় তিনি  মহান রবীন্দ্র-গবেষকদের অন্যতম। 
এখন নূতন প্রজন্মের কবিদের সৃষ্টি বিস্ময়কর ভাবে  বৈচিত্র্যময়, তবুও আমার নিবেদন তাঁরা যেন (যদি কেউ  না পড়ে থাকেন) আবু সৈয়দ আইয়ুব মহাশয়ের  'আধুনিকতা ও রবীন্দ্রনাথ' গ্রন্থটি পাঠ করেন। 
 Baudelaire-য়ের জীবনের উচ্ছৃঙ্খল, তামসিক  দিকটির গভীর গহ্বরে নিহিত আছে তাঁর কাব্য সাধনার  যজ্ঞকুণ্ড। সেই অগ্নিদহনের জ্বালায় আর্ত যে কবিসত্বা  তারই  অভিব্যক্তি আছে তাঁর সৃষ্টিতে। বাঙলা ও  বাঙালির কোমল, আবেগ-আর্দ্র অন্তর্জগতে তা যে  দুর্বিসহ, অকল্পনীয় এবং অসহনীয়ও। 

তবু সমর সেন, জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী, সুধীন দত্ত, বিষ্ণু দে, জয় গোস্বামী, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, নীরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী, শামসুর রহমানদের মত বাঙলার আধুনিক কবি যাঁরা‌ তাঁদের কবিতার বিষয়, ভাব ও ভাষা উচ্ছ্বসিত ও উচ্ছল নান্দনিকতা থেকে মুক্ত। শঙ্খ ঘোষ মহাশয়ের শেষের দিকের কবিতাগুলি সমকালিক রাজনীতি, রাষ্ট্রনীতি ও সামাজনীতির তির্যক সমালোচনায় নিরলঙ্কার। মূল্যবোধের অবক্ষয়ের দিকটিও উলঙ্গভাবে প্রকাশিত তাঁর ন্যারেটিভ কবিতাগুলিতে। এই সকল কবিতাগুলি কেমন যেন তেল নুন কাঁচালঙ্কা ছাড়া মুড়ি চেবানোর মত। যুবকদের জন্য ঠিক আছে কিন্তু আমাদের, বুড়ো বাঙালিদের মুখে বড়ই বিস্বাদ লাগে। 
নান্দনিকতা ছাড়া, রসাবেশঋদ্ধ অলঙ্কার ছাড়া বাংলা কবিতা মূলছেঁড়া ফুলগাছ। আবার ঊনবিংশ শতকে বোদলেয়ার সাহেব যে আধুনিক কবিতা লিখে গিয়েছেন, একবিংশ শতকেও তেমন কবিতা লিখবার হিম্মত বঙ্গ কবিকুল দেখাতে পারেননি, পারবেনও না -- এ কথা আমি হলপ করে বলতে পারি। বোদলেয়ার-য়ের 'A Carcass' কবিতাটির দুটি স্তবক, উদাহরণ স্বরূপ তুলে ধরছি : 

A Carcass 

"Remember my love, the object we saw 
That beautiful morning in June: 
By a bend in the path a carcass reclined 
On a bed sown with pebbles and stone ; 

Her legs were spread out like a lecherous whore, 
Sweating out poisonous fumes, 
who opened in slick invitational style 
Her stinking and festering womb. ..." 

কোন বঙ্গকবির লেখনী কী এতখানি উলঙ্গ বাস্তবতাকে নিরাবরণ ভাষায় কাব্য সুষমা দিতে সক্ষম হবে ? 
এই কবিতার বাংলা অনুবাদ পরে আমার ব্লগ (blog)-য়ে  দেওয়া হবে। 

(বোদলেয়ারের কবিতাগুলি মূল ফরাসী ভাষা থেকে ভাষান্তরিত। ফরাসী ভাষা অনেকের কাছেই অজানা, তাই ইংরেজি অনুবাদটি দেওয়া হোল। বাংলায় ভাবানুবাদ মৎকৃত)। 
(পরিমার্জিত ও পুনঃপ্রকাশিত।) 

দুলাল বন্দোপাধ্যায়
০১-১০-২০২৪
ব্যাঙ্গালোর ।

২টি মন্তব্য:

Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...