কামিনী রায়ের জীবন একটি কবিতা, অকৃত্রিম
প্রথমে তাঁর কাব্য গ্রন্থগুলির (যেগুলির জনপ্রিয়তা একসময় তেমনিই ছিল, যেমন ছিল সেকালের অগ্রগন্য লেখকদের) নাম:
---আলো ও ছায়া, পৌরাণিকী, দ্রোণ- ধৃষ্টদ্যুম্ন, অম্বা(নাট্যকাব্য), দীপ ও ধূপ, মাল্য ও নির্মাল্য, একলব্য প্রভৃতি। এছাড়াও সনেট, (অশোক সঙ্গীত, জীবন পথে) , অমিত্রাক্ষর ছন্দে রচিত কবিতা এবং নাটক অম্বা। 'গুঞ্জন' নামে শিশুদের জন্য কবিতা সঙ্কলন তাঁর একটি অভূতপূর্ব প্রয়াস। বালিকা শিক্ষার আদর্শ, ঠাকুরমার চিঠি অনন্যসাধারণ লেখাগুলি।
বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ-য়ের সদস্য, সাহিত্য সম্মেলন-য়ের সহ-সভাপতির আসন অলংকৃত করেছেন। সাহিত্যে অবদানের জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের'জগত্তারিণী স্বর্ণপদক' লাভ করেছিলেন।
অবিচল সৃষ্টিশীলতা, অনলস জ্ঞানসাধনা, বিদ্যাদান এবং একই সঙ্গে অপাঙক্তেয় মানবজীবনের অঙ্গীভূত হয়ে, 'ওপাড়ায়' গিয়ে বলা,
"আমি তোমাদেরই লোক।"
'নারী কল্যান'- এই কর্মব্রতে আত্মোৎসর্গ করেছিলেন।
নারী শ্রমিক তদন্ত কমিশনের সদস্য ছিলেন।
প্রগতিশীলা, নারীবাদী, সমাজমনষ্ক ইত্যাদি বিশেষণ তাঁর নামের আগে প্রযুক্ত হয়ে আসছে এতকাল। আদর্শ শিক্ষয়িত্রী, জনহিতব্রতী এবং সুচারু গৃহাঙ্গনা--এই সমস্ত চরিত্র বৈশিষ্ট্যগুলির অন্তরালে তাঁর কবিসত্বার যে অভিব্যক্তি সেখানে রয়েছে একটি অননুকরণীয় মৌলিকতা।
বাঙলার মহিলা কবিকুল যেমন গিরীন্দ্র মোহিনী দাসী,
প্রিয়ম্বদা দেবী, তমাল লতা বসু, রাধারাণী দেবী, মৈত্রেয়ী দেবী, রাবেয়া খাতুন, মৃণালিনী গুপ্তা,অনুরূপা দেবী, কুমারী তপতী রাণী, কুমারী চম্পা ঘোষ এবং আরো অনেক "না বলা বাণীর ঘন যামিনীর" অন্ধকারে থেকে যাওয়া 'গার্গী মৈত্রেয়ী'----- তাঁদেরও সম্যক, সার্থক মূল্যায়ন হয়নি।
এখানে সামান্য প্রসঙ্গাগান্তর হলেও বলি, Virginia Woolf (1882-1941)-য়ের জীবন যুদ্ধের কাহিনী স্মরণে আসে। ইংরেজি সাহিত্যের এই স্মরণীয় উপন্যাসিক বলেছেন,
" A woman must have money and a room of her own if she is to write fiction."
"Of her own" --এই কথাটির মধ্যে নিহিত রয়েছে নারীদের মর্মান্তিক পরাধীনতার অসহায়, অশ্রুত দীর্ঘশ্বাস।
Jane Austen-(1775-1817) -য়ের বিখ্যাত উপন্যাসগুলিতে, (যেমন Sense and Sensibility, Pride and prejudice, Emma) যে সামাজিক চিত্র ফুটে উঠেছে, সেখানেও নারী-পরাধীনতার সুষ্পষ্ট উচ্চারণ --
Dependence (What a humiliation!) of a woman on marriage in the persuit of social standing and economic security.
ফিরে আসি কামিনী রায়ের কাছে। পারিবারিক প্রতিকূলতা, অর্থের অসচ্ছলতা তাঁর ছিল না, ছিল না পৃষ্টপোষকতার অভাব। পিতা চণ্ডীচরণ সেন, স্বামী কেদারনাথ রায় উভয়েই ছিলেন সমকালের বিদ্বান, ধনবান এবং বাংলার নবজাগরণের আলোকপ্রাপ্ত ব্যক্তিত্ব। কিন্তু কামিনী রায়ের দৃষ্টি ছিল আপন পরিবারের পরিমণ্ডলের বাইরে---সবার নীচে, সবার পিছে, সবহারাদের মাঝে। তাঁর কথায়,
"সুখ, দুঃখ,ক্ষুধা, তৃষ্ণা, আশা, আকাঙ্ক্ষা, গভীর আনন্দ ও তীব্র বেদনা---এই সকল দিয়ে যে মানবজীবন, তাহার একটি জাগ্রত অস্তিত্ব আছে এবং তাহার একটি সফল প্রকাশের কবিতা আছে এবং থাকবে।"
Virginia Woolfও ঠিক এমনই কথা বলেছেন তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ 'Am I a snob'--র মধ্যে, তীক্ষ্ণ ব্যাঙ্গাত্মক ভাষায়। কিন্তু কামিনী রায়ের ভাষায় কী অপূর্ব কমনীয়তা, ধন-মান-গর্বী, বর্ণাভিমানী, আত্মম্ভরী 'উচ্চকোটি'র ভাগ্যবানদের কাছে তাঁর আর্ত নিবেদন,
"পতিত মানব তরে নাহি কি গো এ সংসারে
একটি ব্যথিত প্রাণ, দুটি অশ্রুধার।
পথে পড়ে অসহায় পদে তারে দলে যায়--
দুখানি স্নেহের কর নাহি বাড়াবার ?"
মানুষের মনুষ্যত্বের দরবারে সরাসরি আবেদন।দ্রোহ-দ্বন্দ্ব, অভিযোগ নেই, আছে বিনীত অনুরোধ, শুধু সুরটি অনুযোগের।
"আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে আসে নাই কেহ অবনি পরে
সকলের তরে সকলে আমরা প্রত্যেকে মোরা পরের তরে।"
কবি সার্বভৌম রবীন্দ্রনাথের সেই উত্তঙ্গ ভাবের সঙ্গীত স্মরণ করুন:
"আনন্দধারা বহিছে ভুবনে...।"
দ্বিতীয় অন্তরা--
"পান করে রবি শশী অঞ্জলী ভরিয়া,
সদা দীপ্ত রহে অক্ষয় জ্যোতি,
নিত্য পূর্ণ ধরা জীবনে কিরণে।।"
তারপর?
"বসিয়া আছো কেন আপন মনে,
স্বার্থ নিমগন কী কারণে ,
চারিদিকে দেখ চাহি হৃদয় পসারি'
ক্ষুদ্র দুঃখ সব তুচ্ছ মানি,
প্রেম ভরিয়া লহ শূণ্য জীবনে।।"
এই আভোগে (concluding lines of a verse/song) এসে সেই মহাভাব জৈবিক কামনায়
তাড়িত মানুষের দুয়ারে দাঁড়িয়ে রইল কাতর আর্তি নিয়ে !
কেন এই anticlimax ?
উত্তর--মানবকল্যাণ।
তাঁর স্বদেশ পর্যায়ের সঙ্গীতে, নৈবেদ্য-য়ের কবিতায় প্রধান বিষয়বস্তু তো মানুষ।
"সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপর নাই।"
--–----চণ্ডীদাস
তাহলে কবি কামিনী রায়ের সীমাবদ্ধতা কোথায় ? ভাষার সাধারণত্ব ? প্রকাশ ভঙ্গিমার সারল্য ?
এইতো তাঁর অভিনবত্ব,--সমাজের অপাঙক্তেয় মানবজীবনের কল্যাণ কামনার স্তোত্রপাঠ।
এইখানেই কামিনী রায়ের কবিতার বিশেষত্ব,স্বাতন্ত্র্য।
তাঁর সৃষ্টির বিভিন্ন এবং বিচিত্র গড়ন-গঠন-য়ের দিকে দৃষ্টি ফেরাতেই দেখা যায় চেনা শব্দের অভ্যন্তরে অচেনা, অজানা ধ্রুপদী বিশ্বসাহিত্যের ঝলক। শব্দের ঝঙ্কার তোলেন নি বলেই কি ? সংস্কৃত সাহিত্যের পরিব্যপ্ত পরিমন্ডলে তাঁর বিচরণ, তবুও কী অপার সংযম। তুলে নিয়েছিলেন মাটির ভাষা। এই 'মাটির ভাষা' 'মা-টির' ভাষায় রূপ দিয়ে যে কবিতাটি তিনি রচনা করেছেন সেটির তুলনা বিশ্বসাহিত্যে বিরল :
কত ভালবাসি
--------------------------
জড়ায়ে মায়ের গলা শিশু কহে আসি
"মা, তোমারে কত ভালবাসি!"
"কত ভালবাস ধন?" জননী সুধায়।
"এ--ত।" বলি দুই হাত প্রসারি' দেখায়।
"তুমি মা আমারে ভালবাস কতখানি?"
মা বলেন, "মাপ তাঁর আমি নাহি জানি।"
"তবু কতখানি, বল।"
"যতখানি ধরে, তোমার মায়ের বুকে।"
"নহে তার পরে?"
"তাঁর বাড়া ভালবাসা পারি না বাসিতে।"
"আমি পারি।" বলে শিশু হাসিতে হাসিতে !
শব্দচয়ন, কল্প-ছবি, ছন্দ, অনুচ্চারিত বাক্যালঙ্কার--
(এ--ত........প্রসারি' দেখায় ।)
মর্ত কায়ায় অমর্ত্য শৈশব-সারল্যের নিরাবরণ ছবি!
আবারো:
"তুমি মা আমারে ভালবাস কতখানি?"
মা বলেন, "মাপ তার আমি নাহি জানি।"
মাতৃ হৃদয়ের স্নেহ-সুধাপূর্ণ, অপার্থিব রূপ মূর্তি লাভ করেছে। সত্যই তো,
"সমুদ্রের পার আছে,তল আছে তার--
অতল, অপার মাতৃস্নেহ পারাবার।"
মাইকেল মধুসূদন দত্তের, তাঁর কাব্যশৈলীর ধারায় সিক্ত কবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের আশীর্বাদধন্যা এই কবি অমিত্রাক্ষর ছন্দে দীর্ঘ কবিতা রচনা করেছেন। 'সনেট' আঙ্গিকের আদি স্রষ্টা ইতালির পেত্রার্কার 'ভাব ও রূপ' অনুসরণ করে রচনা করেছেন শতাধিক সনেট। সে সকল সনেটের Octave (অষ্টক)ও sextet/sestet (ষটক) এতোই নিখুঁত যে মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের চতুর্দশপদীর কাঠামোর সঙ্গে হুবহু মিলে যায়।
স্মরণীয় "সহযাত্রা" সনেটটি।
"গান শুনে তবে মোরে ভালোবেসেছিলে...।"
বিশুদ্ধ ইতালিয় গঠন (form). Fourteen hendecasyllabic lines in purely Petrarchan style.
আর ভাবের দিক থেকে Renaissance love.
বাংলা ভাষায়, একজন নারীর কলমে যুগান্তকারী। সেই সময় কালের কাব্যিক বিপ্লব।
সঙ্গে সঙ্গে সমকালীন প্রচলিত ছন্দ, অলঙ্কার তাঁর কবিতায় অপ্রতুল, এমন দৃষ্টান্তও নেই। প্রবহমান পয়ার, যতিপ্রান্তিক ত্রিপদী, চৌপদী, কলামাত্রিক এবং (রবীন্দ্রনাথের অনুসরণে) সমিল প্রবহমান পয়ার।
তবুও বেশিরভাগ সাহিত্য সমালোচক কামিনী কবির কবিতার বৈচিত্র্যময়তা স্বীকার করেন না। তাঁরা প্রমান করতে চান, যেহেতু তিনি পেশাগত জীবনে শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তাই তাঁর কাব্যভাব নীতিবোধ ও আদর্শকেন্দ্রিক। মূল্যায়নের এই অপূর্ণতার একমাত্র কারণ তাঁর সৃষ্টির সমগ্রতাকে অনুধাবন না করা ।
বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর শিক্ষা লাভ, (সংস্কৃত ভাষায় স্নাতক), শিক্ষকতা, অধ্যাপনা এবং ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় নিবিড় অধ্যয়নের মধ্য দিয়ে তিনি নিজের নারীসত্বাকে এমন একটি স্তরে উন্নীত করেছিলেন, যা একমাত্র বাঙলার নয়, সমগ্র দেশের নারী সমাজের কাছে ধ্রুবতারার মতো দিকদিশারী।
অন্তর-সত্বায় তিনি Virginia Woolf, Jane Austen, Marie Corelli এবং নিত্যদিনের জীবনাচরণে একাধারে গৃহিণী, জননী, সমাজহিতৈষণার কর্মব্রতে নিবেদিত -প্রাণ।
তবুও আপন অন্তর্প্রকৃতি ও বহির্প্রকৃতির কাছে চুড়ান্ত অসহায়ত্বই কী নারীত্বের বিজয়-গৌরব ? কেননা, নারীত্ব যে বহুমাত্রিক --- জায়া, জননী, ধাত্রী, 'ধরিত্রী'। আপনার অন্তরাত্মজ সৃষ্টির মুখে সুধার পাত্র তুলে ধরার ভার তারই উপর দিয়ে রেখেছেন তার ভাগ্যবিধাতা। তাই তাকে মা হতে হয়, স্বামী-সন্তান-আত্মীয়-পরিজন সমন্বিত সংসার-মন্দিরে নিত্যদিনের সেবার নৈবেদ্য-নির্মাল্য দান করতে হয়। তারপরও "আপন ভাগ্য জয় করিবার" সুদুর্গম, "ক্ষুরস্য ধারা দূরত্যয়া" পথে যে 'কামিনী' যাত্রা করেছেন তিনি কী শুধুমাত্র 'নারীবাদী' লেখিকা, সমাজকর্মী ? সৃজনশীল সাহিত্য-সাধনায় আজীবন নিমগ্ন, মানব-কল্যাণ ব্রতে উৎসর্গিত প্রাণ, আবহমান বাংলার জননী কবির উদ্দেশে শতাব্দী-পারের এক অক্ষম কবি-সন্তানের শ্রদ্ধাঞ্জলী----
স্মরণে আসে কবি কামিনী
--দুলাল চন্দ্র বন্দোপাধ্যায়
নয়নলোভন, হৃদয়হরণ, ভুলানো জীবন যাতনা
আকঁঁ নাই তুমি মেদুর এ ছবি--লেখনীর আলপনা।
মরমের কথা, নয় যদিও তা কল্পিত, মনোহর ;
তবুও রয়েছে কাব্য কলার সত্য ও সুন্দর।
ব্রাত্য যে জন সমাজে রয়েছে শতেক যোজন দূরে,
যাদের কপালে শুধু ধিক্কার, বাঁচে না কেবলই মরে।
কাব্যে তাদের দিয়েছো আসন, পূজেছ বেদনা-ফুলে।
শরমের জ্বালা, মর্মবেদনা হৃদয়ে নিয়েছ তুলে।
অবগুণ্ঠিত পুর ললনার কুণ্ঠিত কথাকলি
বাংলার বাণী-মন্দিরে নব কুসুমের অঞ্জলী--
মা হওয়ার ব্যথা, শিশুদের গাথা, স্নেহ মায়া মমতার
অশ্রুসিক্ত বাণী যেন তারা অচল মৌনতার।
ছন্দে তোমার, ধ্বনিতে তোমার, কর্মে তোমার কবি--
অবলা প্রাণের না-বলা ভাষার মুখরিত চলছবি ।।
১২/৯/২০২১
ব্যাঙ্গালোরু
১।"সমুদ্রের পার আছে......মাতৃ স্নেহপারাবার।"
'ধাত্রী পান্না' কবিতা থেকে নেওয়া।
কবি --যদুগোপাল মুখোপাধ্যায় (?)।ন
২। চলছবি, (চলৎ+ছবি=চলচ্ছবি, এমনও লেখা যেতে পারে)
দুলাল বন্দোপাধ্যায়
১৫/৯/'২১
সাধারণ/নিম্ন বর্গীয় পাঠক বা অনুসরণকারীদের জন্য কলমের ফসল চাই,,,,সক্কল কে সমগোত্রীয় ভাবতে গেলে অবিচার হবে।
উত্তরমুছুনকলমের মুখে ভিসুভিয়াস ফিট করে নিজে হয়তো নিষ্ঠুর আমোদে
ভেসে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে কিন্তু আমার মতো 'ফেলারামদের' ফ্যালফেলিয়ে তাকিয়ে অনুষ্ঠান শেষে সবাই হাততালি দিচ্ছে দেখে
হাততালি দেওয়া ছাড়া গত্যন্তর থাকে না। বাচালতা মার্জনীয় 🙏