শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও 'বিলাসী'।
বাংলার হৃদয়ে শরৎসাহিত্যের স্থান কোথায় তার সন্ধান দেবার আগে একটি আমার ব্যক্তিজীবনের ঘটনা বলি।
সাল ১৯৬৭। সে বছর দশম শ্রেণী (ক্লাস টেন) পরীক্ষা দিয়েছি। এগার বা ইলেভেন ক্লাসে উঠব। তখন ইলেভেন ছিল হায়ার সেকেন্ডারি। আমার স্কুল ছিল আমাদের গ্রাম থেকে ন'মাইল দূরে। মাঝে গোটা তিনেক সাঁওতাল পল্লী পেরিয়ে এক মহুলবন, তারপর অজয় নদ। 'নদী' নামটিরই চল মুখে মুখে। নদী পেরিয়ে আরও মাইল তিনেক দূরে চিত্তরঞ্জন রেলইঞ্জিন কারখানার রেল কলোনির স্কুল। নদীর পাড়েই একটি মাঝিগাঁ --- যারা, বিশেষ করে বর্ষাকালে নৌকা বায়। নদী পারাপারের একমাত্র বাহন ছিল এই নৌকা। আমাদের গ্রাম যেহেতু ছিল দক্ষিণ বিহার আর পশ্চিম বাঙলার সীমানারেখার উপর, আদিবাসীদের বস্তির একপ্রান্তে, তাই কোন এক অজ্ঞাত কারণেই, শুধু আমাদের গ্রামটিই নয়, আশেপাশের বিশ পঁচিশখানা গ্রামাঞ্চল ছিল বিদ্যা- বিদ্যালয়শূন্য। গ্রামে একটি পাঠশালা ছিল, ধনবান চাষীদের বদান্যতায়, পৃষ্টপোষকতায় সে পাঠশালাটিতে পড়ুয়াদের যত না নাম ছিল তার চাইতে বেশী সুনাম ছিল বহির্গ্রামের এক বৃদ্ধ মাষ্টার মশাইয়ের। নাম ছিল তাঁর দীননাথ চক্রবর্তী। তিনি ছিলেন একাধারে পুরোহিত-কথক-পাঠক ও পাঠশালার পণ্ডিত। একের ভিতর চার। তাঁরই একান্ত আগ্রহে আমাদের কয়েকজনের ওই নদীপারের শহরের স্কুলে ভর্তি হওয়া।
এই দীনু মাষ্টারের নাম ও পরিচয় দেবার জন্যই এতখানি ভূমিকা। যিনি ছিলেন গল্প বলার যাদুকর। গ্রীষ্মকালের দুপুর বেলায়, বর্ষায়, শীতের সন্ধ্যায় তাঁর কাছারি ঘরের (অব্যবহৃত কাছারি ঘরটিই ছিল তাঁর আস্তানা) বারান্দায় থৈ থৈ করত গ্রামের লোক। তিনি শুধু পুরাণ কাহিনী --- রামায়ণ, মহাভারত, ভাগবৎ পুরাণ --- এ সকল পুরাতন গ্রন্থের গল্পই শুনাতেন না, কখনো কখনো বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্রের বই, যেগুলি তাঁর সংগ্রহে ছিল, সেগুলি থেকেও পাঠ করে শোনাতেন। আমি যখন ক্লাস নাইনে পড়ি তখন একদিন আমার এক কাকা, যিনি প্রায় প্রতিদিনই ঐ মাষ্টারের গল্পের আসরে যেতেন, বললেন, --- চল্ আমার সঙ্গে। আজ দিনুমাষ্টার শরৎবাবুর গল্প পড়বেন।
আমার আজও মনে আছে আমি কাঁদতে কাঁদতে ঘরে ফিরেছিলাম। "কেন কাঁদছিস" --- মা জিজ্ঞাসা করেছিল। বলতে পারিনি। মা কাকাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করল, বুড়ো কাঁদে কেন ? কাকা উত্তর দিয়েছিল, কি জানি, মাষ্টারের গল্প শুনতে শুনতেই কান্না আরম্ভ করেছিল। আমি বলেছিলাম, ঘরে চলে আসতে। তাও শুনল না --- ওকে আর নিয়ে যাবই না। সেটা অবশ্য হয় নি। যেমন সে দিনের গল্পটি শুনে কেঁদেছি, তেমনি কাঁদতে কাঁদতেই কাকাকে বলেছি, 'আমি যাব'।
সেদিন কোন্ সে গল্প পড়েছিলেন মাষ্টারমশাই ? গল্পটি ছিল 'বিলাসী'। এই গল্পটির মধ্য দিয়েই আমার 'শরৎচন্দ্রের' সঙ্গে পরিচয়। তাই আজও, প্রৌঢ়ত্বের সীমা পেরিয়েও, জরাতুর জড়তার সংবেদনহীন পাথুরে বুকেও জেগে আছে 'বিলাসীরা'। আমি যেন ছিলাম 'মৃত্যুঞ্জয়', যদিও সে একই স্কুলে থার্ড ক্লাসে পড়ত। বয়সে বড় ছিল আমার চাইতে। "মৃত্যুঞ্জয়ের বাপ মা ভাই বোন কেওই ছিল না। ছিল শুধু গ্রামের এক প্রান্তে একটা প্রকাণ্ড আম কাঁঠালের বাগান।" ঐ বাগান জমা দিয়েই নিজের ভরণ পোষণই চলত এমন নয়, সহপাঠী বন্ধুদের মিষ্টি খাওয়ানো, অভাবীদের অভাব মেটানো --- সে সবও চলত ওই বাগানের উপার্জনে। "বাগানের মধ্যখানে একটা পোড়ো বাড়ি, আর ছিল এক জ্ঞাতি খুড়া। "খুড়া প্রচার করিত,--- ঐ বাগানের অর্ধেকটা তার নিজের অংশ, নালিস করিয়া দখল করার অপেক্ষা মাত্র। অবশ্য দখল তিনি একদিন পাইয়াছিলেন বটে কিন্তু সে জেলা আদালতে নালিশ করিয়া নয় ---- উপরের আদালতের হুকুমে।"
এই বাক্যটির অভিঘাত এমনই ছিল যে ঐ চোদ্দ পনের বছরের বুকটাতেও যেন কেমন এক ভয়, আমাদের বনপাড়ার সাপুড়ে তৈমুর চাচার পোষা নাগিনীটার মতন ফোনা তুলে দুলতে লাগলো। গল্পের এক একটি বাক্য শেষ হয় আর কত কি যে মনে হতে থাকে! তারপর সেই অসুখে মৃতপ্রায় মৃত্যুঞ্জয়ের সেবায় নিযুক্ত ক্ষীণপ্রাণ বিলাসী দেখা দিল, তখন থেকে বিলাসীর দিকেই মনটা ঝুঁকে রইল। "দিনের পরে দিন, রাত্রির পর রাত্রি তাহার কত সেবা, কত শুশ্রূষা, কত ধৈর্য, কত রাত জাগা"--- মৃত্যুঞ্জয়কে 'যম'এর মুখ থেকে এ যাত্রা ফিরিয়ে এনেছে। তখন মনটা কিছুটা শান্ত হোল ; কিন্তু মনে হতে লাগল এমন কথা লেখাই বা কেন --- "মৃত্যুঞ্জয় তো যে কোন মুহূর্তে মরিতেই পারিত, তখন সমস্ত রাত্রি এই বনের মধ্যে মেয়েটি একাকী কি করিত !" মরেনি তো।
এখানে আরো একটি সদ্যমৃত স্বামীর সঙ্গে তার একান্ত অসহায় স্ত্রীর করুণ কাহিনীও আছে। আমার সেদিকে তেমন আগ্রহ ছিল না, কেবলই তারপর কি, তারপরে কি --- এমনই আকুল উদ্বেগ ! একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছি যে ভালই হোল মৃত্যুঞ্জয় আর বিলাসীর বিয়ে হয়ে গেল ; কিন্তু কয়েক মুহূর্ত যেতে না যেতেই একি ! গ্রামের লোকেরা সকলে মিলে, ন্যাড়াও ছিল তাদের সাথে, মৃত্যুঞ্জয়ের ঘরে চড়াও হোল। বিলাসী রুটি গড়ছিল ; সমস্ত কিছু নষ্টভ্রষ্ট করে, মৃত্যুঞ্জয়কে ঘরের ভিতরে আটকে রেখে, বিলাসীকে মারতে মারতে, টেনে হিঁচড়ে গ্রামের বাইরে নিয়ে যাওয়া ! ন্যাড়া কেন তাদের মেরে তাড়ালো না! আমি যদি...! সে ভাবনা আমার শেষ হতে না হতেই ভেসে এল মাষ্টারমশাইয়ের কণ্ঠ হতে বিলাসীর আর্তনাদ,
"বাবুরা, আমাকে একটিবার ছেড়ে দাও, আমি রুটিগুলা ঘরে দিয়ে আসি। বাইরে শিয়াল কুকুরে খেয়ে যাবে --- রোগা মানুষ সমস্ত রাত খেতে পাবে না।"
আমার মনে আছে আমি ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেছিলাম। সবাই ঘাড় বেঁকিয়ে একবার আমাকে দেখে নিল, আবার মাষ্টারমশাইয়ের দিকে মুখ। কাকা বড় বড় চোখ করে আমাকে হাত দিয়ে ইঙ্গিত করল, বাড়ি চলে যা। আমি একচুলও নড়তে পারিনি। গল্প এগিয়ে চলে। মৃত্যুঞ্জয় সাপুড়ে হয়ে গেল, বিলাসী তার বৌ। বেশ হয়েছে, বেশ। এবার গ্রামের লোকেরা তার করবে কি ? গল্পটা মাষ্টার এখানেই তো শেষে করতে পারতেন। আবার পড়তে আরম্ভ করলেন। এবার মৃত্যুঞ্জয় আর ন্যাড়ার সাপধরা। মনে মনে আমি তখন ন্যাড়া হয়ে গিয়েছিলাম ; কিন্তু হঠাৎ এ কি ! দুটো গোখরো খরিষ ছিল এক গর্তে ! বাসা বেঁধেছিল ; সে কথা বিলাসী তো বলেছিল। ওরা শুনলো না ! একটা সাপ ধরে মৃত্যুঞ্জয় ন্যাড়ার হাতে যেমনি দিয়েছে অমনি গর্তের ভিতর থেকে অন্য সাপটা ফনা তুলে বেরিয়ে ছোবল মারল মৃত্যুঞ্জয়ের হাতে। ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে এল। নেড়ার মন্ত্র, বিলাসীর দেওয়া শেকড়-বাকড়, মাদুলি কবজ কিছুই বাচাঁতে পারলাম না তাকে। মৃত্যুঞ্জয় মরেই গেল !
"বিলাসী তাহার স্বামীর মাথাটা কোলে করিয়া বসিয়াছিল। সে যেন একেবারে পাথর হইয়া গেল।"
এই অসহনীয় ছবিটি কল্পনায় ধরে রাখতে পারছিলাম না। এরপর এই গ্রামদেশের সমস্ত মানুষেরা মিলে মৃত্যুঞ্জয়-হারা ঐ অসহায়, নিরন্ন বিলাসীর উপর আর কতই যে অত্যাচার করবে সেকথা ভাবতে ভাবতে যখন দুশ্চিন্তার কষ্ট অসহ্য হয়ে উঠছিল ন্যাড়া তখন একদিন তাদের পাড়ায় গিয়ে শুনলো, বিলাসী আত্মহত্যা করেছে।
হ্যাঁ, আমি কেঁদে কেঁদেই ঘরে ফিরেছিলাম।
দুই
চোখের জলের সঙ্গে কি সাহিত্যের গাঢ় সম্পর্ক আছে ? আর তার সঙ্গে তীব্র আকর্ষণ ? সেই যে সেদিনের চোখের জলে শরৎচন্দ্র আমার জীবনে এলেন আজও, এই সত্তরোর্ধ্ব বয়সেও, তাঁর সঙ্গে আমার আত্মীয়তার ছেদ পড়েনি। কত এদেশের, কত বিদেশের বইই-না পড়লাম ; কিন্তু ওই যে সাহিতিকের সঙ্গে পাঠকের চিরকালীন সম্পর্ক, আত্মীয়তা --- তার যেন একটা দূরত্ব থেকেই গিয়েছিল, থেকে গিয়েছিল ভালো-মন্দের বিচার। কিন্তু কেন যে শরৎবাবুর সাথে এমন আত্মীয়তা বা আত্মিকতা অচ্ছেদ্য হয়ে রয়ে গেল, তার জন্যে তাঁরই লেখা থেকে কয়েকটি আখর উদ্ধার করি, ---- আর একজন প্রখ্যাত সাহিত্য সাধক, যাযাবর সাহিত্যিক কেদারনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় (জন্ম ১৮৬৩) তখন বিহারের পূর্ণিয়ায়। তাঁর সাথে সমকালের প্রায় সকল প্রথিতযশা, জনপ্রিয় বাঙালী লেখকদের, এমনকি রবীন্দ্রনাথেরও, নিয়মিত চিঠি পত্রের আদান প্রদান হোত। শরৎচন্দ্রের সঙ্গে তো হোতই এবং বড়ই হার্দিক ছিল সে সম্পর্ক। শরৎচন্দ্র তখন হাওড়ার বাজে শিবপুরে। তিনি কেদারনাথবাবুকে লিখছেন,
"বাজে শিবপুর। হাওড়া
১১-১০-'২৪
প্রিয়বরেষু,
আজ সকালে আপনার চিঠি পেলাম। নানা কাজে ভুলে থাকি, প্রতিদিন অনেক চিঠিই তো পাই, কিন্তু কালে-ভদ্রে লেখা আপনার কয়েক ছত্র আমাকে যে আনন্দ দেয় তা সত্যেই দুর্লভ। প্রীতির মধ্যে দিয়ে আসবার সময়ে সে যেন অনেকখানি তা সঙ্গে করে আনে। কেদারবাবু, মানুষের সত্যকার ভালোবাসা আমি টের পাই --- এখানে আমার বড় বেশী ভুলচুক হয় না।" "
শরৎচন্দ্রের স্বর্ণলেখনী (তিনি কলম-সৌখিনও ছিলেন) নিঃসৃত এই সত্যবাণীর দীপ্তিতে দ্যুতিময় হয়ে আছে তার সমগ্র রচনাসম্ভার "কেদারবাবু, মানুষের সত্যকার ভালোবাসা আমি টের পাই..."।
'বিলাসী' গল্পটির রচনা ও আবির্ভাবের লগ্নটি ঐতিহাসিক। এই সময়টিও ওই '২৪ সাল ; কিন্তু সেটি বঙ্গাব্দ। শরৎচন্দ্র বাজে শিবপুরে থাকার সময়েই তাঁর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের পরিচয় হয়। বন্ধু চারু বন্দোপাধ্যায় শরৎচন্দ্রকে নিয়ে গিয়েছিলেন জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির বিচিত্রার আসরে। সেখানেই প্রথম শরৎ-রবির সম্পর্কের 'অদেখা ও অপরিচয়ের' মেঘমুক্তি। এই বিচিত্রার আসরেই রবীন্দ্রনাথের অনুরোধে শরৎচন্দ্র তার 'বিলাসী' গল্পটি পাঠ করেন, ১৩২৪ সালের ১৪ই চৈত্র।
"বিলাসী" গল্পটিতে কি আছে 'ভালোবাসা' ছাড়া ? রূপযৌবনসম্পন্না, উচ্চকুলসম্ভবা কোন নারীরত্ন তো ছিল না বিলাসী। আর তা হলে কি সে ঐ একা, নিঃসম্বল, শয্যাশায়ী, মৃতপ্রায় মৃত্যুঞ্জয়ের সেবা করতে যেত অমন আত্মসমর্পিত ভালোবাসা নিয়ে ? সেও তো এক বলহীনা, ক্ষীণপ্রাণ, জীর্ণদেহী, গ্রামসমাজের অন্তেবাসী অচ্ছুৎ, বেজাত এক সাপুড়ের মেয়ে। "ঠিক যেন ফুলদানিতে জল দিয়া ভিজাইয়া রাখা বাসী ফুলের মালার মত --- এতটুকু নাড়া চাড়া করিতে গেলেই ঝরিয়া পড়িবে।"
তবে কিসের আকর্ষণে মরণাপন্ন মৃত্যুঞ্জয়কে বাচাঁনোর জন্য দিনের পরে দিন, রাত্রির পর রাত্রি জেগে, অনাহারে অনিদ্রায় নিজেকে নিঃশেষে বিলিয়ে দিয়েছিল বিলাসী ? এ হেন নিষ্কামনার ব্রত পালন করবার শক্তির উৎস কি ছিল ? উৎস ছিল ভালোবাসা--- অহৈতুকী ভালোবাসা। যাঁরা শরৎসাহিত্যের গভীরে প্রবেশ করেছেন তাঁরা সকলে, কিছু কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া, শরৎচন্দ্রের দরদী মনের কথা, সহমর্মিতার কথা বলেছেন সাতকাহন করে। তাঁদের অগাধ পাণ্ডিত্য, সীমাহীন অধ্যয়ন ; লিখেছেনও সাহিত্যতত্ত্বের নিখুঁত বিচারে। কিন্তু আমার মনে হয়েছে মানুষকে, নারী পুরুষ নির্বিশেষে, বড়ই ভালোবাসতেন শরৎচন্দ্র --- এইটিই প্রেম-প্রণয়সিক্ত, দরদভরা শরৎসাহিত্যের মর্মকথা-অনুভবের সুলুক।
"ভালোবাসার মত এত বড় শক্তি, এত বড় শিক্ষক সংসারে আর বুঝি নাই। ইহা পারে না এত বড় কাজও বুঝি আর কিছু নাই।"
--- শ্রীকান্ত।
"মেয়েরা পুরুষের হৃদয় এক নিমিষেই চিনে নিতে পারে, এটি বিধাতার দেওয়া শক্তি. ..।"
---- নারীর মন।
মৃত্যুঞ্জয় সুস্থ হয়ে উঠল। বিলাসীর সঙ্গে ঘর বাঁধল সে। স্বাভাবিক ভাবেই তার 'জাত গেল, ধর্ম গেল।' সমাজের ঘৃণা, দুর্নামের বিষের চাইতে সাপুড়ে 'জাতের' সাপের বিষ নিয়ে খেলার পেশা --'বরং ভালো' বলে বরণ করে নিল মৃত্যুঞ্জয়। এও তো ভালোবাসার জন্যই স্বজন, স্বজাতি, 'স্বধর্ম' অকাতরে বিসর্জন দেওয়া, শুধুমাত্র এবং একমাত্র ভালোবাসার মূল্য চুকাতে হবে বলেই। "বিবাহ ব্যাপারটা যাহাদের শুধু নিছক contract, তা সে যতই কেননা বৈদিক মন্ত্র দিয়া document করা হোক্, সে দেশের লোকের সাধ্য নাই মৃত্যুঞ্জয়ের অন্ন-পাপের কারণ বোঝে। বিলাসীকে যাহারা পরিহাস করিয়াছিল তাহারা সকলেই সাধু গৃহস্থ এবং সাধ্বী গৃহিনী --- অক্ষয় সতীলোক তাহারা সবাই পাইবেন, তাও আমি জানি ; কিন্তু সেই সাপুড়ে মেয়েটি যখন একটি পীড়িত শয্যাগত লোককে তিলে তিলে জয় করিতেছিল তাহার তখনকার সে গৌরবের কণামাত্রও হয়তো আজিও ইহাদের কেহ চোখে দেখে নাই।"
প্রেম দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে, পরম বেদনায়, চরম আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে কারো হৃদয় জয় করবার 'গৌরবের' কথা শরৎচন্দ্র তো এই প্রথমবার এবং একবার বললেন, পরে আর বলবেন না --- এমন তো নয়। কতবার যে বলেই গিয়েছেন তার হিসাব করলে আরো একটি গবেষণা গ্রন্থ রচিত হবে। ভেসে ভেসে উঠবে কত নারীর মুখায়বয়ব (রাজলক্ষ্মী, অভয়া, কমললতা, কিরণময়ী, সাবিত্রী, বিরাজ, বিজয়া, রমা, ষোড়শী, অনুপমা, রাধারাণী, ললিতা ....না, থাক্। অযথা কলেবর বৃদ্ধি পাবে লেখার), কত হৃদয়দহনানলসম্ভুত চিতাগ্নিশিখা কিংবা প্রীতিস্নিগ্ধ প্রদীপালোকদীপ্তি।
আমরা ফিরে আসি 'বিলাসী'র কাছে। গল্পটি শেষ হোল ; কিন্তু রেখে গেল প্রভাত-রবিকরে পল্লবপ্রান্তে ক্ষণ-উদ্বায়ী শিশিরবিন্দুর অমোঘ সত্যবাণীর কিরণবিচ্ছুরণ। সে সবের মধ্যে একটি মর্মান্তিক নাটকীয় বিদ্রুপ (dramatic irony) :
"অবশ্য (মৃত্যুঞ্জয়ের) বাগানের দখল একদিন তিনি পাইয়াছিলেন বটে, কিন্তু সে জেলা আদালতে নালিশ করিয়া নয় ---- উপরের আদালতের হুকুমে।"
ঠিক এমনি এক আইরনি, এমনই পেলব অথচ ক্ষুরের ধারের মত তীক্ষ্ণ একটি অতুলনীয় রবীন্দ্রবাক্য :
"অবশেষে যাত্রাকালে ফটিক আনন্দের ঔদার্যবশত তাহার ছিপ ঘুড়ি লাটাই সমস্ত মাখনকে পুত্রপৌত্রাদিক্রমে ভোগদখল করিবার পুরা অধিকার দিয়া গেল।"
'ছুটি' --রবীন্দ্রনাথ।
"শুনিয়াছি নাকি বিলাত প্রভৃতি ম্লেচ্ছদেশে পুরুষদের মধ্যে একটি কুসংস্কার আছে, স্ত্রীলোক দুর্বল এবং নিরুপায় বলিয়া তাহার গায়ে হাত তুলিতে নাই ! এ আবার একটা কি কথা ! সনাতন হিন্দু এ কুসংস্কার মানে না। আমরা বলি, যাহার গায়ে জোর নাই, তাহারই গায়ে হাত তুলিতে পারা যায়।"
কি নির্মম নিদারুণ এই সত্য ! ছোটগল্পের ক্ষুদ্র পরিসরে হাজার বছরের হিন্দু সমাজ-মনস্কতার, বর্ণবিভাজিত, নারীবিদ্বেষী পুরুষের পরুষ-কঠোর মানসিকতা বিবেকদাহী চিতাগ্নির মত গনগন করে উঠেছে। উদাহরণও আছে তার। মূল গল্পটির একটি শাখা-আখ্যানভাগে এক সদ্যমৃতের স্ত্রীর উক্তি :
"....তিনি স্বেচ্ছায় যখন সহমরণে যাইতেছেন তখন সরকারের কি ? তার আর তিলার্ধ বাঁচিবার সাধ নাই, এ কি তাহারা বুঝিবেন না ?" গল্পকার যদিও এইটি প্রতিপন্ন করেছেন যে ওই কথাগুলি শোকার্তার অন্তরের কথা ছিল না ; কিন্তু তবুও বৈধব্যের নিরাশ্রয়তার অন্ধকার, এই পোড়া দেশে, এমনই নিরন্ধ্র ছিল যে চিতাগ্নিশিখার দহনালোকও কাম্য ছিল, শান্তির আশ্রয় ছিল স্বামীহারাদের কাছে।
পরিশেষে বলি, মৃত্যুঞ্জয় আর বিলাসী --- অপঘাতে মরে গেল একজন, আত্মহত্যা করল আরেকজন। সমাজের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র 'ঘৃণ্য', 'কলঙ্কিত' পাত্র-পাত্রীদুটির একজন জাত হারিয়ে, 'অন্ন-পাপে' "না পেলে একফোঁটা আগুন, না হোল (তার নামে) একটা ভুজ্জি উচ্ছুগ্যু।" আরেকজনের গতিও হয়েছিল হয়তো অমনিই। কোন এক নদীপাড়ের কবরখানায়, কয়েক কোদাল মাটির তলায় তাদের অচ্ছুৎ দেহগুলি লুপ্ত হয়ে গিয়েছে সেই কবে ! এমনি ধারা "অনন্ত বিস্মৃতিরাশি প্রত্যহ যেতেছে ভাসি" ; কিন্তু তাদের সেই প্রেম !
এখন ভাবি, আত্মহত্যা করবার প্রাকমুহর্তে কেমন ছিল মনের অবস্থা বিলাসীর ! তেমনই ছিল কি, যেমন ছিল মহাকবি, জীবননাট্যের মহাশিল্পীর জুলিয়েটের মত !
"What's here? a cup closed in my true love's hand ?
Poison, I see, hath been his timeless end ---
O Churl, drunk all, and left no friendly drop
To help me after ! I will kiss thy lips !
Haply some poison yet doth hang on them,
To make me die with a restorative."
------ Shakespeare
(Romeo and Juliet, act-5, scene-3)
মৃত্যুঞ্জয় হয়ত নিতান্তই একটা তুচ্ছ মানুষ ছিল, কিন্তু তাহার হৃদয় জয় করিয়া দখল করেছিল বিলাসী যে শক্তির দ্বারা, আর ঐ কুসংস্কারাচ্ছন্ন, সংকীর্ণ মানসপ্রবৃত্তির-বশীভূত পল্লীগ্রামের ছেলে, পাড়াগাঁয়ের তেলেজলেই মানুষ ধনঞ্জয়কে এত বড় দুঃসাহসিক কাজে প্রবৃত্ত করিয়েছিল যে শক্তি --- উভয়ই যে অপরাজেয়, দুর্দমনীয় প্রেমেরই শক্তি। বাংলা সাহিত্যে অমর, অবিস্মরণীয় করে রেখে গেলেন শরৎচন্দ্র তার স্বর্ণ লেখনীর মন্ত্রলিপিতে।
সমাপ্তিপূর্বের দু'কথা
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের রচনা সম্ভার নাতিবৃহৎ, নাতিস্বল্প। তার প্রকাশিত উপন্যাসের সংখ্যা ৩১টি, গল্প ছোট বড় মিলিয়ে ২২টি। প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস বড়দিদি ১৯১৩ সালে এবং শেষ প্রকাশ শেষের পরিচয় ১৯৩৯ সালে। নাটক ৩টি, প্রবন্ধের সংখ্যা ১২। ১৯৩৮ সালে তার মৃত্যুর পর কিছু কিছু লেখা প্রকাশিত হয়েছিল যাদের মধ্যে 'শেষের পরিচয়' উপন্যাসটি আছে।
১৯১৩ সালে 'বড়দিদি' উপন্যাস প্রকাশের মধ্যে দিয়ে যখন সাহিত্যিক হিসেবে তাঁর আত্মপ্রকাশ ঘটে তখন, বিশ শতকের প্রথম ও দ্বিতীয় দশক, বাংলা সাহিত্য-সাধনার রত্নযুগ। তখন রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যসৃষ্টির হীরকজ্যোতি বহুশাখায় বিকীর্ণ, দেশের সীমানা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের সারস্বত সমাজের কোণায় কোণায়। সাহিত্যে নোবেল এসেছে। গীতাঞ্জলির অনুবাদ হয়ে চলেছে ভারতের এবং বিদেশের বহু বহু ভাষাতেও। ওদিকে বাংলা সাহিত্যের নবতম যে শাখা 'ছোটগল্প', সেটিও তার অতিমানবীয় প্রতিভার স্পর্শে ঝলমল করে উঠেছে। অষ্টাদশ শতকে শেষ দশক থেকে যখন তিনি ছোটগল্প রচনার হাত দিলেন, তখন থেকেই তার সমসাময়িককালের, পরবর্তীকালের কেদারনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৬৩) থেকে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের (১৮৯৮) পর্যন্ত সাহিত্যসাধনার বিশেষ করে ছোটগল্প রচনার, মর্মমূলে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ --- প্রত্যক্ষে এবং পরোক্ষে ; যদিও ভাবের বৈচিত্র, বিষয়ের ভিন্নতা, আঙ্গিকের বৈপরিত্য ছিল। সর্বোপরি চরিত্রগুলিকে, নরনারীর সম্পর্কটিকে নিরাবরণ করবার প্রবনতাও দেখা গিয়েছিল কোন কোন লেখকের রচনায়। এ প্রসঙ্গে আমরা সাহিত্যিক জগদীশ গুপ্তের লেখনশৈলীর ও সাহিত্যাদর্শের উদাহরণ দিতে পারি। জগদীশ গুপ্তের (১৮৮৬-১৯৫৭) গল্পে প্রেমের স্নিগ্ধ মধুর রূপ নেই। তাঁর গল্পের যারা কুশী-লব তারাও প্রধানত নীচু তলারই মানুষ ---নিম্নবিত্ত, স্বল্পবিত্ত বা দরিদ্র। কিন্তু শরৎচন্দ্র বা বিভূতিভূষণের গল্প উপন্যাসের নীচু তলার মানুষের সঙ্গে তাদের মিল নেই। দেহগত যৌনচেতনার রূপ প্রাধান্য পেয়েছে তার অধিকাংশ রচনায়। যৌবনচিত ভাববিহ্বলতা বা রোমান্টিকস্বপ্নে তাঁর বিরুদ্ধ ভাবটি প্রকট। তিনি তাঁর রচনায় সজ্ঞানেই পরিহার করেছেন 'শরৎচন্দ্রীয় আবেগ ও কল্লোলী ভাবালুতা।
বাঙলা সাহিত্যের আধুনিক সমালোচক যাঁরা, তাঁরা এ দাবী করে থাকেন যে সাহিত্যিক জগদীশ গুপ্তের হাত ধরেই বাঙলা ছোটগল্পে আধুনিকতার বাস্তবানুগ প্রয়োগ সম্ভাবিত হয়েছে। যাই হোক্ আধুনিকতার সংজ্ঞা কালে কালে বিবর্তিত হয়, পরিবর্তিত হয়। তবে, যুগে যুগে সাহিত্যসৃষ্টির শ্রেষ্ঠতম বিচার হয় পাঠকের দরবারে। সেখানে, বিষয়, ভাব, ভাষা ও রসের আবেদনে কালজয়ী সাহিত্যস্রষ্ঠাদের অন্যতম একটি নাম শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়--- অপরাজেয় কথাশিল্পী।
(রচনাটি সম্পূৰ্ণরূপেই শরৎচন্দ্র-কেন্দ্রিক। বাংলা সাহিত্যের বৃহৎ বিপুল 'ছোটগল্পের সংসারে' উঁকি দেওয়া হয়নি। শুধু প্রাসঙ্গিকভাবে যতটুকু -- তাই নিয়েই আলোচনা।)
দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
১৪ই জুলাই, ২০২৫
ব্যাঙ্গালোর।
(এখানে পুনঃপ্রকাশিত)
___________________________________
পড়লাম, ভালো লাগলো, চালিয়ে যাও। বই লিখছনা?
উত্তরমুছুন