রবিবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২৫

"এরে ভিখারি সাজায়ে"

এরে ভিখারি সাজায়ে  


বহিরাবরণ অলঙ্করণের অন্তরালে আন্তরমূর্তির বাঁশ-খড়ের কাঠামোটি যখন নিরাবরণ হয়ে যায় তখন দেবতা যিনি, যিনি এতদিন মুগ্ধচিত্ত ভক্তদের ভক্তির আসনে অধিষ্ঠিত দিলেন, তাঁর আপন করুণ পরিণতি দেখে করুণা জাগে কি না জানিনা (জানবার উপায় বা অধিকার কোনটিই নেই), তবে 'যশোলাভের' অক্ষম আকাঙ্ক্ষা যদি সারস্বত মন্দিরের দীনাতিদীন, জীর্ণ কোন সোপান-সম্মার্জনীর অন্তরে জেগে থাকে তবে সেই লজ্জাহীন ভিখারিত্বের উলঙ্গ চিত্তটি তার নিজের কাছেই বড়ো করুণার ! আপনার অন্তরসত্তার এমন ভিক্ষুকদশা আবিষ্কার করে‌ সে কবির মাথা নত হয়ে আসে মহতের চরণপ্রান্তে যিনি দৈবসৃষ্ট কবি, যিনি বীণাপানির আশীর্বাদধন্য স্রষ্টা, যিনি বাণীর সাধনায় সিদ্ধি লাভ করেছেন। 'বাণীই' মানবের আত্মচৈতন্য জাগরণের প্রেরণা। বাণীই প্রকাশিত বিশ্বের 'শোভনতমা' বিদ্যা। 

"সর্বেষাং হি শোভমানানাং শোভনতমা বিদ্যা।
তথা বহু শোভমানা ইতি বিশেষনম্ উপপন্নং ভবতি।" 

(ইন্দ্রের সত্যের প্রতি ভক্তি দেখে ...'কেন' উপনিষদের একটি উপাখ্যান ) অধ্যাত্মজ্ঞান স্বয়ং, দেবী উমারূপে উপস্থিত হলেন তাঁকে আশীর্বাদ করতে।
এখানে উমাকে বহুশোভমানা, স্বর্গীয় উজ্জ্বলারূপে বর্ণনা করা হয়েছে।
ভগবান শঙ্করাচার্য তাঁর টিকায় লিখছেন, "বিদ্যা বা আধ্যাত্মিক জ্ঞান -ই সমস্ত উজ্জ্বল বস্তুর মধ্যে উজ্জ্বলতম।" 

 জ্ঞানভিখারীই মানবসংসারের শ্রেষ্ঠতম ভিক্ষুক। আর বাক্ বা বাণীই পরম ঐশ্বর্য জ্ঞানের বাহক।

তাই অনুজ কবি মহাকবির নিকট নিয়ত ভিক্ষা করেন বাণী। কবিগুরু বাল্মীকির কাছে প্রার্থনা আর এক মহাকবির, 

"গাঁথিব নূতন মালা, তুলি সযতনে 

তব কাব্যোদ্যানে ফুল ; ইচ্ছা সাজাইতে 

বিবিধ ভূষনে ভাষা ; কিন্তু কোথা পাব 

(দীন আমি) রত্নরাজী, তুমি নাহি দিলে 

রত্নাকর --- কৃপা প্রভু কর আকিঞ্চনে।" 

              ('মেঘনাদ বধ') মাইকেল মধুসূদন দত্ত। 


আমাদের শ্রীমদ্ভাগবৎ গীতা এও বলছেনঃ

ধৃত্বা যয়া ধরায়তে মনঃপ্রাণেন্দ্রিয়ক্রিয়াঃ।
যোগেনাব্যভিচারিণ্যা ধৃতিঃ সা পার্থ সাত্ত্বিকী।। 

যে আকাঙ্ক্ষা মন, প্রাণ ও ইন্দ্রিয়গুলির ক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে, সমভাবে তাদের তেজকে অন্তর্নিহিত ঈশ্বরাত্মার দিকে ফিরিয়ে দেয়, সেই আকাঙ্ক্ষাই , হে পার্থ,  'সাত্ত্বিকী আকাঙ্ক্ষা' -- তাই জেনো। 


কিন্তু এই 'ভিখারি' শব্দটির উচ্চারণে যে কল্পমূর্তি আমাদের মানসচক্ষে উপস্থিত হয় তা বড়ই বেদনার। এই দীর্ঘ জীবনকালে তেমন মর্মভাঙা দৃশ্য দেখেওছি অগনন। জীবনের বিস্মৃত পথের ছায়াচ্ছন্ন বিচ্ছিন্ন প্রান্ত থেকে মূর্ত রূপ ধরে দাঁড়ালো কত যে 'ভিখারি' দেব-দেবী--- যাঁদের,-- 


"একটি শুধু পয়সাদিয়ে বকেছিলাম কত,
আজকে তাহা বিঁধছে বুকে কুশাঙ্কুরের মত।
কথা সে তো কয়নি কিছু, 
ছিল করে মুখটি নীচু,
জনম ভরে রয়ে গেল নিজের দেওয়া ক্ষত।" 

                      ------- কুমুদরঞ্জন মল্লিক। 


ওই কড়ি-কপর্দকশূন্য, নিরন্ন ভিক্ষাজীবী ব্যতিরেকেও আমার মত জন্মভিখারিও তো আছে। 'দাও, দাও' -- 

"আয়ুর্দ্দেহি যশো দেহি ভাগ্যং ভগবতী দেহিমে।
পুত্রান দেহি ধনং দেহি সর্বান কামাংশ্চ দেহি মে।।" 

সেই কবে, চেতনোন্মেষের প্রথম প্রভাত থেকেই, দু'হাত প্রসারিত করে আছি। শুধু চেয়েছি, শুধুই চেয়েছি। কিন্তু পেয়েছি যা, জীবনভর জীবনের রস ও রসদ পেয়েছি যত, চাওয়ার বহর বেড়েছে ততই। অতৃপ্তি বেড়েছে অপরিমেয়। এই অপরিতৃপ্তির মোহ এমনই যে তার থেকে মুক্তি নিলে, মনে হয়, রইল কি, কি রইবে বাঁচবার অবলম্বন ? সাধক যাঁরা, পরমের ধনে ধনি যাঁরা, পার্থিব চাওয়া-পাওয়ার আকাঙ্ক্ষার বন্ধন ছিন্ন করে পরমার্থের ধ্যানে মগ্ন যাঁরা তেমন কোন পূজার্হ মানুষের সংস্পর্শে আসার সৌভাগ্য আমার হয়নি। যাদের সঙ্গ পেয়েছি, জীবনপথের সহযাত্রী ছিলেন যাঁরা (তাঁদের অনেকেই আজ পঞ্চভূতে লীন), এখনো রয়েছেন যাঁরা সবার মাঝে নিজেকে যখন দেখি তখন আমার সত্তার 'ভিখারি' রূপটি প্রকট হয়ে ওঠে। মনে ভাবি, এঁদের কাওকেই কিছুই তো হোল না দেওয়া, শুধু নিতে চেয়েছি ঝুলি ভরে, পাত্র ভরে। যাঁরা নেই তাঁদের ছায়া ছায়া মূর্তিগুলি, যারা আছেন তাঁরা স্বকায়ে এসে দাঁড়িয়ে রয়েছেন আমাকে ঘিরে ; বিদ্রুপের অট্টহাস্যে ভরে উঠেছে চরাচর। 

রবীন্দ্রনাথের একটি গানে কায়া ধারণ করেছে যেন এই চির-ভিখারির সংসার-ভর্ৎসিত রূপ ---
"এরে ভিখারি সাজায়ে কি রঙ্গ তুমি করিলে।
হাসিতে আকাশ ভরিলে।।
পথে পথে ফেরে দ্বারে দ্বারে যায়   ঝুলি  ভরে রাখে যাহা কিছু পায় ----
কতবার তুমি পথে এসে হায়   ভিক্ষার ধন হরিলে।।
ভেবেছিল চির কাঙাল সে এই ভূবনে   কাঙাল মরণে জীবনে।
ওগো মহারাজা, বড়ো ভয়ে ভয়ে  দিন শেষে এল তোমারি আলয়ে ---
আধেক আসনে তারে ডেকে লয়ে  নিজ মালা দিয়ে বরিলে।।" 


"গানটির শেষ দুই পংক্তি (আভোগ) আমারও মনের কথা" --- এমন বলার ক্ষীণমাত্র আস্পর্ধা থেকে বিধাতা যেন আমাকে চির-বঞ্চিত রাখেন। জীবন দেবতার কাছে, জগৎসংসারের মানবদেবতার কাছে এই আলয় তাঁর জন্য, এই জনমভিখারির স্বীকৃতি তার জন্য, এই বরণের মালা তাঁর‌ জন্যে যিনি ত্রিলোক (ভূঃ, ভূবঃ, স্বঃ) ভূলোক, দ্যুলোক, স্বলোক--জুড়ে পরিব্রজ্যা করেছেন। ঝুলি ভরে চেয়েছেন 'আনন্দ' -- সুখে, দুঃখে, শোকে ; মিলনে, বিরহে খুঁজেছেন জীবনের রস এবং সে রসে ভোগ করতে চেয়েছেন সৃষ্টির আনন্দকে। কারণ তিনি যে স্রষ্টার মতই ত্যাগের দ্বারা ভোগ করেন (তেন ত্যক্তেন ভুঞ্জিথা), আর নিশ্চিত জানেন, 

"রসো বৈ সঃ
রসং হ্যেবায়ং লব্ধানন্দী ভবতি
কো হ্যেবান্যাৎ কঃ প্রাণ্যাৎ
যদেশ আকাশ আনন্দো ন স্যাৎ ---" 

তিনি আনন্দস্বরূপ ; এই মানবপ্রাণ সেই আনন্দ লাভ করতে চায়। কেই বা (মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী জেনে) জীবনধারণ করত, কেই বা শ্বাসক্রিয়ার জন্য নিরন্তর প্রয়াসী হোত, যদি না 'আকাশ-আনন্দ' --- সীমাহীন, অনন্ত আনন্দ এখানে থাকত ? 

সেই আনন্দাভিপ্সু 'ভিখারি'র জন্য তো তাঁর 'ব্রহ্ম' আছেন, যিনি পূর্ণ, মহারাজ। ভিক্ষা করতে করতে তো তিনি তার রাজার আলয়ে এসে উপস্থিত হলেন। 

"যং লব্ধা চাপরং লাভং মন্যতে নাধিকং ততঃ ।
যস্মিন্ স্থিতো নঃ দুঃখেন গুরুনাপি বি চাল্যতে।।"

যে পাওয়া অন্য কোন পাওয়া থেকে অধিক নয়। কিন্তু  সেখানে স্থিত হলে সুখই বা কি দুঃখই বা কি ! কি বা তার অভাব ! 'ভিক্ষাবৃত্তির' চির অবসান। 


আমার জীবনদেবতার এই পরম প্রাপ্তির জন্যেই পরিব্রজ্যা ছিল। সে ছিল তাঁর তপস্যা। কিন্তু আমাদের 'ভিক্ষুকদশা' একটি নিখাদ আত্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে আত্মপ্রবঞ্চনা। তাই স্বঘোষিত 'কবিদের' উলঙ্গ এই রূপটি' উপস্থাপিত করবার জন্যই  কবি নীরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী মহাশয় এমন একটি কবিতা তাঁর পাঠকদের উপহার দিয়ে গিয়েছেন। 

কবি যদি 

"কবি যদি লোভী হয় 

তাহলে সে কবি নয়, 

তা হলে সে পথের কাঙাল। 

ভিক্ষাবৃত্তির কথা যখন উঠলই তখন আমার একটি জীবনাভিজ্ঞতার কথাবলি,  

চিত্তরঞ্জনে থাকার সময়ে জয়দেব কেন্দুলির অজয়ের ঘাটে মাঝে মাঝেই যেতাম। যেতাম মেলার সময় ছাড়া অন্য সময়েও, আমার এক বাউল দাদার  সঙ্গে। ('পেশায়' নয়, 'নেশায়' বাউল‌ ছিলেন তিনি)। তা একবার চৈত্রমাসের সংক্রান্তির দিন তিনি বললেন,
--- চল হে ক্ষেপা, কাল জয়দেবে যাই। আমাদের সুধীর বাবার আশ্রমে কাল ছোটখাট এক মচ্ছব আছে।
গেলাম। পোঁছেছি এই সকাল দশটা নাগাদ। চৈতন্য পুরের ঘাটে নেমে, বিশীর্ণ জলধারার শুষ্ক অজয়ের বালিরাশির তপ্ত চড়া পেরিয়ে যখন ওপারের বাউলদের আখড়ায় পোঁছালাম তখন রোদে আধমরা। নদীর একেবারে পাড়ের কয়েকটি আখড়া পেরিয়ে তমালতলা --- সুধীর বাবার আশ্রম। এও আখড়াই, তবে বেশ বড়পারা। আমার বাউল দাদার হাঁকডাক শুনে এক সাদাচুলের অতি বৃদ্ধা রমণী --- একা উঁঁকি দিলেন।  একখানি লালপেড়ে সাদা শাড়ী, মড়াপোড়ানো কাঠের মত তাঁর‌ অস্থিচর্মসার দেহটিকে জড়িয়ে আছে। তিনি সেই কাপড়েরই একটুকরো আঁচল কোনক্রমে মাথায় তুলবার চেষ্টা করতে করতে, কিছুটা ঝুঁকে, তালপাতার ছাওনি দেওয়া কুঁড়ে ঘরটার ফুট-তিনেকের দুয়ার থেকে বরিয়ে এলেন। উপরের গোটা তিনেক হবে হয়তো, জর্দাপোড়া, আধকালো দাঁত-শুদ্ধো এক হৃদয়-খোলা হাসি।
কণ্ঠভাঙা স্বর, কিন্তু যেন ছেলে ফিরেছে ঘরে এমনি সেই বলার ভঙ্গিটি,
---- কখন থেকে পায়ের 'শবদ যে পাছি।' ভাবছি কেষ্টক্ষেপা আজ আসবেই। আর এটি আবার কে ? সুবল ?
---- না, না, আমি....
---- ওই হল রে ক্ষেপা।
আমি চুপ করে গেলাম, বিস্ময় মাখানো দুটি চোখ ওই রমণীর মুখের উপর। 

চোখ নামাতেই দেখি আমার দাদাটি উবুড় হয়ে তাঁর দু' পায়ের ধূলা হাতে নিয়ে মাথায় মাখছে।
---- ওঠ রে ক্ষেপা, জিরো (জিরিয়ে নে)। তারপরে বাতাসা জল খাবি।
দেখাদেখি আমিও প্রণাম করতে গেলাম। না, কিছুতেই প্রণাম নেবেন না। কেবল আমার মাথায় হাত রাখলেন। 

সময় অনেক বয়ে গেল। আমরা নদীতে স্নান করে এলাম। বাউল'মা মুড়ির সঙ্গে পাকা কাঁঠালের কোয়া দিলেন এক এক বাটি। পাকা আম, বেল -- তাও এল।
ভরপেট খেয়ে তমালগাছের ছায়ায়, বিকট আকারের দড়ির খাটিয়ায় বসে আছি একা। দাদা আর বাউল'মা মিলে, কলসি আর বালতি নিয়ে জল আনতে গেল নদীতে। ভাবছি কোথায়‌ মচ্ছব, কোথায়‌ বা সুধীরবাবা ; আর এই বাউল'মা-ই বা কে ? এমন জীর্ণ, রুগ্ন দেহ ; তবু কী অপার প্রসন্নতা, কী প্রাণ-জুড়ানো কথা, কী স্নেহের আপ্যায়ন ! ইনি যেন সেই তপোবন-ভারতের কবি কৃত্তিবাস বর্ণিত অত্রিমুনিপত্নী, 

"তপস্যা করিয়া মূর্তি ধরেন তপস্যা।
জ্ঞান হয় গায়ত্রী কি সবার নমস্যা।।" 

দারিদ্র্যের তপস্যার মধ্যে দিয়ে মূর্তিমতী 'সেবা'-র প্রতিমায় উত্তোরণ ! কেন যে আমার প্রণাম নিলেন না ?
একথা ভাবতে ভাবতে ওই দড়ির খাটিয়ায় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎই কয়েকজনের কলকণ্ঠে ঘুম ভেঙে গেল। দেখি পাঁচ জন মূর্তিমান কিম্ভুত ! চিত্র বিচিত্র আলখাল্লা পরা, কাঁচাপাকা দাড়ির ঝোঁড়ে ঢাকা মুখ, কাঁধে লম্বা লম্বা গেরুয়া রঙের ঝোলা, এক হাতে একতারা, অন্য হাতে খঞ্জনী। কারো আবার পেটের কাছে ঝুলছে ছোট ডুগি। 

সে দিনের মাধুকরী সেরে ফিরে এল সবে।
গোবরলেপা উঠোনটায় তাদের গাত্রাবরণ সহ সমস্ত অস্থাবর সম্পত্তি সম্পদ নামিয়ে নামিয়ে রাখছে আর বলছে,
---- দেখ্ ক্ষেপিমা, কী সব এনেছি।
----- এতো রোদে রোদে ঘুরেছো বাবারা, জিরোও, আমি সরবত করে রেখেছি। সেই এক -ই কথা 'জিরোও'।
(আহা! জীবনের সকল দুঃখ-ক্লান্তিহরা মাতৃকণ্ঠনিঃসৃত বাণী, 'বাবারা জিরোও')।
সবার শেষে এলেন সুধীর বাবা। ওই একই বেশবাস, কিন্তু বুক জুড়ে মালার বোঝা আর সাদা চুলের একটি বিপুল চূড়া মাথার মাঝখানটিতে বাঁধা। শরীর তাঁরও মেদহীন হাড়ের মেড়। থলি ছিল আরেক কম বয়সী বাউলের কাঁধে। নির্দন্ত মুখের হাসিতে সমস্ত আখড়াটি ভাসিয়ে দিয়ে বলে উঠলেন,
-- ও ক্ষেপি, তুর ঘরে আজ গোবিন্দের মেলা যে গো, সেবা দিয়েছিস্ তো ?

দেখতে দেখতে উৎসবের পরিবেশ। দুটো উনুন জ্বলছে। ওদিকে কেও সংগৃহীত আনাজপাতি কাটছে, কেও মসলা পিসছে, কেও কেও আবারো জল আনছে নদী থেকে।
সূর্যদেব অস্ত যাবার আগেই সাঙ্গ হোল সেবা। সকলের ভোজন শেষে সুধীর বাবা আর বাউল'মা বসলেন। এক থালাতেই খাওয়া আর খাওয়ানো। সে এক অপূর্ব দৃশ্য। মা ভাত মেখে মেখে বাবার মুখে একগাল দেন, একগাল নিজে খান।
তারপর তামাক। কত যে গল্প, কথা, কথকথা এবং বাউল গান। আমার দাদাটি কিছুক্ষণ পরে পরেই আমার কাছে,
---- কি, কেমন দেখছ সব ?
আমি রুদ্ধবাক, হাসি দিয়ে জানিয়ে দিচ্ছি, 'বেশ'।
ধীরে ধীরে কলতান মন্দীভূত হয়ে এল। খাটিয়া নিয়ে এদিক ওদিক ঘুমাতে গেল সবাই। আমি যেখানে ছিলাম সেখানেই। কিছু পরে, বেশ রাত হয়েছে তখন, দাদা দুটো তেলচিটে বালিশ নিয়ে আমার খাটেই এসে বসলেন। বিড়ি ধরালেন। একটা প্রলম্বিত দীর্ঘশ্বাস। তারপর বললেন,
---- এখানে, এমনি করেই যদি কয়েকটা দিনের জীবন কাটাতে পারতাম।
আমি এবার মুখ খুললাম। জিজ্ঞাসা করলাম,
--- কেন, কি আছে এখানে।
দাদা বললেন,
--- প্রেম। 

আমি যে সে উত্তরে সন্তুষ্ট হতে পেরেছিলাম তেমনটি নয়। তবে পরে বুঝেছিলাম দাদা এমন এক প্রেমের কাঙাল ছিলেন যা হয়তো আমাদের বোধগম্যতার বাইরে। আর এও বুঝেছিলাম অন্তরসত্তায় আমিও তো ভিখারিই।‌‌ হয়তো বা আমার 'ভিক্ষার ধন' ---- অভীপ্সিত ও অভিলষিত দ্রব্যাদির আকার প্রকার, গুনমান ভিন্ন। 

 ভিক্ষুকত্ব মানব অস্তিত্বের আদীম প্রবনতা। জীবন যাপনের জন্যে প্রয়োজনীয় বস্তুর প্রার্থনার মধ্য দিয়েই প্রকাশিত হয়েছে, অভিব্যক্ত হয়েছিল মানুষের প্রথম ধর্মবোধ, ধর্মাচরণ এবং তারই ক্রমোত্তরণের, ক্রমবিবর্তনের রূপ জ্ঞানমার্গীয় আধ্যাত্মিকতা। 

আমাদের ঋকবেদের মন্ত্রগুলিতে কোন কোনটিতে যেমন সুগভীর প্রজ্ঞার, অপরূপ কবিত্বের দ্যোতনা আছে, তেমনই বেশিরভাগ মন্ত্রে আছে জীবনে বেঁচে থাকার জন্য নিত্যদিনের ভোগ্যদ্রব্যের জন্য প্রার্থনা। আদিমতম এই 'শ্রুতি'র ষষ্ঠ মণ্ডলের (৬. ৩৯. ৫) একটি মন্ত্র উদ্ধার করে আমরা দেখব আজ থেকে প্রায় দশ হাজার বছর আগে কেমন ছিল আমাদের আদি পিতাদের যাচনা --- 

"নৃ গৃণানো গৃণতে প্রত্ন রাজন্নিষঃ বসু দেয়ায় পুর্বীঃ। 

অপ ওষধীরবিষা বনানি গা অর্বতো নৃনৃচসে রিরিহি ।।" 

হে পুরাতন রাজা (ইন্দ্র), তুমি স্তবে স্তুত হয়ে তোমার দেয় যে ধনসমূহ এবং অন্নসমূহ শীঘ্র আমাদিগকে দাও। বৃষ্টি দাও, ওষধীসমূহ দাও, নির্বিষ বৃক্ষগুলি, গরুগুলি, অশ্বগুলি এবং মনুষ্যগুলি আমাদিগকে দাও। 

আমরা চাই বলেই পাই ; আর পাই, তাই বাঁচি --- বেঁচে আছি জন্মের পর জন্মের মধ্য দিয়ে অন্তহীন প্রাণের বিকাশতীর্থে যাত্রা করেছি পরিপূর্ণ চৈতন্যসত্তার সন্ধানে। 

দুলাল চন্দ্র বন্দোপাধ্যায়
১৩-০৪-২০২৫
ব্যাঙ্গালোর।
______________________________________________

২টি মন্তব্য:

  1. রচনা টি কি কনফেশন নাকি অবসেশান?...-_-_চাপ নেই, রাজাসনে থাকবে তুমি

    উত্তরমুছুন
  2. অসাধারণ উপলব্ধি।

    উত্তরমুছুন

Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...