আলী সাহেব -- মৃৎশিল্পী জীবনশিল্পী
ছেলে মেয়ে বড় হয়েছে। আমরা বুড়ো হয়েছি। সন্তানদের সংসার হয়েছে। আমরা তাদের সংসারে আত্মসমর্পণ করে দিয়েছি। ছেলেদের, বৌমাদের, নাতি নাতনীদের সেবা পাই, বকাঝকা খাই, দেখি শুনি সবই কিন্তু 'মন নাই মোর কিছুতেই'। কাজ কম্ম, দায় দায়িত্ব কিছুই নাই। এসব নাই বলেই শরতের শ্যামল সতেজ তৃণ-প্রাচুর্য-পরিপূর্ণ চারণভূমি পরিভ্রমণ করার পর কৃষকের বৃদ্ধ বলদ যেমন দিনান্ত বেলায় গাছের ছায়ায় বসে থাকে, রোমন্থন করে আধবোজা চোখে, আমার আজকের অবস্থা তেমনি। স্মরণের পথ পাড়ি দিয়ে মন চলে গেল সুদূর অতীতে, সত্তর বছর আগে, উনিশ শ' বাষট্টি তেষট্টি সালে, এমনি এক দুর্গোৎসবের ষষ্ঠীর দিনের পড়ন্ত বিকাল বেলায়।
অজয় নদের (আমরা নদীই বলি) উজান বেয়ে যতই পশ্চিমে যাবে ততই ছোটনাগপুরের আদিমতামাখা মালভূমির রূপ -- পাথুরে পাহাড়, ঢিপি, টিলা, ঝোঁপ- ঝাড়, বন-জঙ্গল। এমন এক রুক্ষ শুষ্ক দেশে, অজয় নদীর পাড়ে আমার জন্ম। বাল্য, কৈশোর কেটেছে সেখানেই। আমাদের গ্রাম, 'পাথর ডিহি', ছিল ছোট একটি বসত। চাষা ভুষাদের বাস। মাঝখানে আমাদের পাঁচঘর বামুন। সামনে নদী, ডাইনে বাঁয়ে শাল মহুয়ার বন, পিছনে দিগন্তজোড়া মাঠ, পাথুরে পাহাড়ের সীমানা দিয়ে খণ্ডে খণ্ডে বাঁধা। চাষের জমির ধান ছিল, পুকুর ডোবার মাছ যৎসামান্য হলেও ছিল কিন্তু বিদ্যার বালাই মোটেও ছিল না। একটি পাঠশালা ছিল। একজন মাষ্টারও ছিল। একটি ভাঙা কাছারি ঘরে তিনি থাকতেন, সেখানেই পড়াতেন। সে পাঠশালায় গেলে যাও, না গেলে না যাও। বর্ষাকালে সেও থাকত বন্ধ।
হঠাৎই গ্রামজুড়ে কী যেন চঞ্চলতা, কানাকানি। ''খুব ভালো, খুব ভালো", "না না ঠিক নয়, ঠিক নয়" -- এমনি নানা কথা বলাবলি। কারণটা জানতে পারলাম যখন একদিন সন্ধ্যা বেলায় একজন নূতন মানুষ আমাদের উঠোনে এসে দাঁড়ালেন। অনেক লম্বা। যেমন লম্বা তেমন ঝোলা সাদা জামা, মাথায় সাদা টুপি। বাবা এগিয়ে গেলেন। কি সব কথা হোল। তারপর জোড়হাত। মাথা নোয়ালেন, চলে গেলেন।
বাবা মায়ের কথাবার্তার সমস্তটা সেদিন বুঝতে পারি নি, তবে জেনেছিলাম তিনিও একজন মাষ্টার। নূতন এসেছেন। এখানকার পাঠশালা আর থাকবে না। ইস্কুল হবে। বড় ইস্কুল। গ্রামের সকল ছেলেদের পড়তে যেতেই হবে। মেয়েদেরও।
মা বলেছিল,
--- তবে আর বিবেককে বীণপুর পাঠিয়ে কি লাভ ?
--- এখানে পড়াশুনার চাষ কোনদিনও হবে না। কলু, বাউরি আর মুসলমান ছেলেরা করবে লেখাপড়া ?
বলেছিলেন বাবা।
সে বছরই, আমাকে, আমার মামাবাড়ি, বর্ধমান জেলার দামোদর নদের পাড়ে বীনপুর গ্রামে পাঠিয়ে দেওয়া হোল। বড় গ্রাম, বড় ইস্কুল। আমি যেহেতু বাবার কাছে বর্ণপরিচয় প্রথম ভাগ, দ্বিতীয় ভাগ পড়েছিলাম, যোগ বিয়োগ গুণ ভাগ শিখেছিলাম, তাই আমি দ্বিতীয় শ্রেণীতে ভর্তি হয়ে গেলাম। এখানে শুধু নিয়মিত ইস্কুলে যাওয়া, পড়া আর পড়া। মেজ মামার ভয়ে পুতুলের মত থাকা। একা একা বাইরে যাওয়া মানা।
এমনি চলতে থাকে। বছর বছর কেটে গেল। আমার পাথর ডিহিতে ফেরা হয়নি। মা আর বোন মাঝে মাঝেই আসে, থেকেও যায় বেশ কিছুদিন ধরেই। চার বছর পর, ষষ্ঠ শ্রেণীতে উঠেছি, পূজার সময় খুব জিদ ধরলাম, আমি পাথর ডিহি যাবই। মেজ মামার কি জানি কি হোল, বলল,
--- চল, আমিও যাই। শুনছি নাকি তোদের গ্রামেও গত বছর থেকে দুর্গা পূজা হচ্ছে।
অস্থির হয়ে উঠলাম ভিতরে ভিতরে। দিন আর কাটে না। রাতে ঘুমাতে পারি না। কতদিন পর অজয় নদী দেখব, বন্ধুদের দেখব। আর ওই যে নূতন মাষ্টার !
দুর্গা পূজার ষষ্ঠীর দিন সন্ধ্যায় পোঁছে গেলাম। মনে হচ্ছিল তখনি বেরিয়ে পড়ি গ্রামের এ-প্রান্তে, ও-প্রান্তে। বাবা আর মেজ মামার ভয়ে তা হোল না। রান্না ঘরে মায়ের কোলের কাছে গিয়ে বসলাম। মা বুকে ধরে এক হাতে জড়িয়ে রইল আমাকে, অন্য হাতে খুন্তি। মা আপন মনে কত কিছুই যে বলে গেল। সারা গাঁয়ের খবর। আমি আর থাকতে না পেরে ওই চার বছর আগের দেখা মাষ্টারের কথা জানতে চাইলাম।
বলছি সে গল্প। তুই তো এখন বড় হয়েছিস, বুঝবি।
ওই মাষ্টারকে নাকি সরকার পাঠিয়েছিল। এক বছর ধরে ছেলে মেয়ে জোগাড় করে পড়াতে হবে। তবেই সরকার ইস্কুল করে দেবে। মাষ্টার সে কথা বলেছিল। মুসলমান পাড়ার লোকেরা ছেলেদের পাঠালো না। তারা তাদের পাঠশালা, মাদ্রাসা খুলেছিল আগেই।
বাকিরা --- বামুন, বাউরি, কলু, গোয়ালা , সকলে বলে দিল মুসলমান মাষ্টারের কাছে তারা ছেলে মেয়ে পড়াবে না।
মাষ্টার কিন্তু গেল না।
মাষ্টার কি করল, পাড়ায় পাড়ায় ঘুরতে আরম্ভ করল। সবার ঘরে যায়। উঠানে গিয়ে বসে। খাবার চেয়ে খায়। মুসলমানদের পাড়ায় গিয়ে নামাজ পড়ে, আজান হাঁকে। আমাদের ঘরে এসে সত্য নারায়ণ পূজার সিন্নি, বাতাসা খায়। যেন ঘরের মানুষ। মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে, গলা ছেড়ে গান গায়। মাটি দিয়ে একটি ঘরও বানাতে লাগল নিজে নিজেই। এমনি করে অনেক দিন কাটানোর পর গত বছর, একদিন সবাইকে ডেকে বলল,
--- আপনাদের গাঁয়ে তো দুর্গাপূজা হয় না। দুর্গাপূজা করুন। আমি প্রতিমা গড়তে জানি।
'না' বলতে পারল না কেউ। অল্প বয়সের ছেলেরা আনন্দে লাফাতে শুরু করল। বামুনদের বুড়োরা খুব রেগে গেল। বলতে লাগল,
--- এবার কি ম্লেচ্ছ দুগ্গার পূজা করতে হবে ?
--- তাই হবে, তাই হবে', বলে চিৎকার করে উঠল সবাই।
মাষ্টার কী সুন্দর ঠাকুর গড়েছিল বাবু ! তোর দাদুই তো পূজার সমস্ত অনুষ্ঠান করেছিলেন পরে। মাষ্টার কত যে খরচ করেছিল। শহর থেকে কিনে এনেছিল এতো এতো গেঞ্জি আর গামছা। গাঁয়ের সকল ছেলেদের একটি করে গেঞ্জি, মেয়েদের একটি করে গামছা বিলি করেছিল নিজের হাতে। মুসলমান পাড়ার ছেলেরাও এসেছিল। খুব আনন্দ হয়েছিল।
এ বছর আরো জমকালো পূজা হচ্ছে শুনছি। ধুতি শাড়িও দেওয়া হচ্ছে। কাল ভোর বেলা সপ্তমী পূজা। তোদেরও নিয়ে যাব।
হ্যাঁ, পরের দিন খুব সকালবেলায়, ভাঙা নয় এখন, সাজানো গোছানো নিকানো কাছারি ঘরের উঠানে গিয়ে দেখি মা দুর্গা, সঙ্গে কার্তিক গণেশ লক্ষ্মী সরস্বতী। অসুর হাঁটু গেড়ে বসে আছে নিচে। এক হাতের কনুই তার সিংহের মুখে, অন্য হাতে তলোয়ার। দুর্গা মায়ের ত্রিশূল তার বুকে বিঁধে আছে। পেট ফাটা মহিষ। রক্ত ঝরছে, রক্ত গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ছে। এসব গুলো মনে ধরেছে না। চোখ চলে যাচ্ছে দুর্গা মায়ের মুখের দিকে। কি সুন্দর, কি যে সুন্দর। আমার মায়ের মতই। হঠাৎই চমকে উঠলাম। পেছনে কার হাতের ছোঁওয়া। পেছনে ফিরে দেখি লম্বা জামা গায়ে, মাথায় সাদা টুপি একটি আমার বয়সের ছেলে।
--- এসো আমার সঙ্গে।
কাছারি ঘরের পিছনেই নতুন ঘর। রঙ দিয়ে লেখা, পাথর ডিহি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এখনো পুরোটা হয় নি। তার বারান্দার শেষে গিয়ে দেখি মাষ্টার। অমনি ঝোলা জামা, সাদা টুপি মাথায়, বুক পর্যন্ত লম্বা ছুঁচলো দাড়ি। দাঁড়িয়ে আছেন। সামনে, বড় একটি চৌকিতে গাদা-করা নূতন কাপড়।
---- বিবেক বাবু, (আমার ভালো নাম বিবেকানন্দ), কাল সন্ধ্যায় এসেছো ? শুনেছি। এসো, তোমাদের পাওনাগুলি নিয়ে যাও।
এই বলে আমার হাতে এক থাক কাপড় তুলে দিলেন।
আয়ুষ্কাল থেকে সাড়ে তিন কুড়ি বছর বিদায় নিয়েছে। উৎসভূমি অগম্য, দুরত্যয়া। জীবনের পাকদন্ডী পথ বেয়ে আজ ক্ষণকালের আরো এক পান্থশালায় আশ্রয় পেয়েছি, যেখান থেকে আমার ওই পাথরডিহি গ্রাম হাজার যোজন দূরে। মা বাবা আত্মীয় স্বজন, সে গাঁয়ের সেদিনের সে সকল প্রাণ, ভালো মন্দ, সুখ দুঃখ, কথা ও কাহিনী আজ শুধুই স্মৃতি। যে কয়েকটি মুখ, শরতের নির্মল আকাশে প্রভাত কিরণে সমুজ্জ্বল খণ্ড খণ্ড মেঘের মত ভাসে তাঁদেরই একটি ওই আলী মাষ্টার--- শামসুর আলী। মাটির ঘর, মাটির মূর্তি গড়েছিলেন অপূর্ব।
দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
২১/১০/২০২৩
মহাসপ্তমী,১৪৩০।
অতি সুন্দর(বেশসৃষ্টি)
উত্তরমুছুনApurbo......smriti satotoi Sukher...sei sukhe abar harabar bedona ta o khub mochor dey.....".fele asa din guli amay je pichu dake"....
উত্তরমুছুন