সোমবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫

ধর্মসংকটের বলি মানবতা --পর্ব ৬

ধর্মসংকটের বলি মানবতা ---পর্ব ৬ 


কেন উপনিষদ বলছেন -----
"ইহ চেদবেদীৎ অথ সত্যমস্তি
   ন চদিহাবেদীৎ মহতি বিনষ্টিঃ ;
ভূতেষু ভূতেষু বিচিত্য ধীরাঃ
     প্রেত্যাস্মাৎ লোকাৎ অমৃতা ভবন্তি।।" 
যিনি এনাকে (আত্মাকে) ইহ জগতেই উপলব্ধি করেন, তাঁরই জীবন সত্য। এই জীবনেই উপলব্ধি করতে না পারা  ---- জীবনে বিপুল ক্ষতি। বিবেকী ব্যক্তি প্রতিটি জীবে আত্মানুভূতি করে, এই জগতের কাছে (ইন্দ্রিয়ানুভূতির জগৎ) মরণ বরণ করেও অমর হয়ে যান। 'অমৃতা ভবন্তি'।
এই হোল ভারতীয় ধর্মধারণার সত্যোপলব্ধি। এই জগতের প্রতিটি জীবের মধ্যে যে অদৃশ্য অথচ প্রাণময় আত্মা বিরাজ করেন তাঁর সঙ্গে একাত্মতা বোধ করলে ব্যক্তি-আত্মার মৃত্যু হয় না। এবং এই বোধ বা উপলব্ধি ঐহিক জীবনেই হওয়া চাই।

আমরা ভারতবর্ষীয় ধর্মধারণা, যা হিন্দুধর্ম বা সনাতন ধর্ম নামেও পরিচিত, সেই বেদ-উপনিষদ-পুরাণ আলোচিত আকাশসদৃশ সুগভীর, সীমা-সীমান্ত-হারা মানবতাবাদী ধর্মের অতি সামান্য আলোচনা করার পূর্বে আরো একটি সুপ্রাচীন ধর্মমত নিয়ে দু'কথা বলবার চেষ্টা করব। সেই ধর্মবোধের কী মারাত্মক অপব্যাখ্যা করা হয়েছিল তাও অনুসন্ধান করেছেন ধর্মতাত্বিক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা।

জরাথুষ্ট্রের প্রচারিত ধর্ম 

এর পূর্বে আমরা আব্রাহামীয় ধর্মধারণা প্রসঙ্গে ইহুদী, খ্রীষ্টান ও ইসলামের সম্মন্ধে সংক্ষিপ্ত আকারে আলোচনা করেছি। এই একেশ্বরবাদী ধর্মসমুহের ইতিহাসগত ধারাবাহিকতা আছে। দক্ষিণপূর্ব এশিয়া --- ভারত চীন জাপান, শ্রীলঙ্কা, ওদিকে দক্ষিণদিকের শেষাংশ অষ্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড প্রভৃতি ভূখন্ডের, বিশেষ করে উপজাতীয় অঞ্চল বাদ দিলে বাকী পৃথিবীর সমস্ত দেশগুলিতে এই তিনটি প্রধান ধর্মধারণারই আধিপত্য।
ধর্মপ্রবক্তা বা অবতার প্রবর্তিত বৃহৎ ধর্মমতগুলির মধ্যে পারসিক ধর্মধারণাও একটি এবং অন্যতম।

পারসিক ধর্ম, প্রবর্তক জরাথুষ্ট্র ; তাই এই ধর্মধারণাকে জরাথুষ্ট্রবাদ বা Zarathustraism বলা হয়ে থাকে। মধ্য এশিয়ায় বিকাশিত এটি প্রাচীনতম ধর্ম। ইহুদী এবং খ্রীষ্টানধর্মের অনুসারিগণও জরাথুষ্ট্রকে ঈশ্বরের প্রেরিত দূত মনে করেন। এমনকি ভারতের  প্রধান ধর্মধারণা আর্য-ধর্মের যা 'হিন্দু' সনাতন ধর্ম নামেই প্রচলিত তার সঙ্গেও জরাথুষ্ট্র প্রচারিত ধর্মধারণার মিল আছে বলে ধর্মতাত্ত্বিকগণ প্রমাণ দাখিল করেছেন। আমাদের বেদ ও উপনিষদসমুহ, পরবর্তী কালের পুরাণ কাহিনীগুলির মধ্যেও সুর্যদেব বা সবিতা এবং অগ্নি যেমন এক অত্যুচ্চ বন্দনীয় স্থানে বিরাজ করেন, পারসিক ধর্মধারণার ক্ষেত্রেও তাই। 

"When Zarathustra was thirty years old, He left his home and the lake of his home and went into the mountains.  There He enjoyed His spirit and solitude. And for ten years did not weary of it. But at last His heart changed, ---and rising one morning with the rosy dawn he went before the sun and spake thus unto it :

'Thou great star ! What would be thy happiness if thou hadst not those for whom thou shinest ! For ten years hast thou climbed hither unto my cave : thou wouldst have wearied if thy Light and of the journey,  had it not been for me,  mine eagle and my serpent.'
                               ---------Friedrich Nietzsche.
("রবীন্দ্রনাথের 'আমি' কবিতায় এই বাণীর প্রতিধ্বনি শুনি যেন -------
আমারই চেতনার রঙে‌ পান্না হোল সবুজ, 
চুণি উঠল রাঙা হয়ে।
আমি চোখ মেললুম আকাশে
জ্বলে উঠল আলো। .....)"। 


বর্তমান ইরান অঞ্চলে এই ধর্মের উদ্ভব। জরাথুষ্ট্রের সময়কাল নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতবিরোধ আছে। তবে সাধারণ সহমতের নিরিখে তাঁর‌ অভ্যুদয়ের সময়কাল খ্রীঃ পূঃ দ্বিতীয় সহস্রাব্দ। অবশ্য অন্য একদল ইতিহাস গবেষক মনে করেন জরাথুষ্ট্রের জন্মকাল খ্রীঃ পূঃ ৬০০-র কাছাকাছি কোন এক সময়ে, যেটির প্রামাণ্যতা সিদ্ধ এই কারণেই যে পারস্য অঞ্চলে যে 'আকামেনিয়া' (Achaemendis) রাজবংশ এক সুবিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল। সেই বংশের সম্রাট দারিয়ুস  (খ্রীঃ পূঃ ৫২২--৪৮৬) এবং সম্রাট জেরেক্সেস (খ্রীঃ পূঃ ৪৮৬--৪৬৫) জরথ্রুস্টবাদকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করেছিলেন।
এই পারস্য সভ্যতার আদি পুরোহিত সম্প্রদায়, যাদের বলা হোত ম্যাজাই (Magi), তাঁরা জরাথুষ্ট্রবাদী ছিলেন (এই বিষয়েও ঐতিহাসিকদের মতানৈক্য আছে)। এই প্রসঙ্গে একটি পুরাণ কাহিনীও প্রচলিত।

Gift of the Maji
ঈশ্বর সন্তান যীশুর জন্মবৃত্তান্তের সঙ্গে পারস্যের এই আদি পুরোহিত সাম্রদায়ের সম্পর্কটি এক মহান দৈবযোগরূপে খ্রীষ্টীয় পুরাণকথার সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
রাজা হেরোদ ছিলেন রোম সাম্রাজ্যের জুডিয়ার মক্কেল রাজা। (King Herod the great, a client king)
তাঁর‌ আমলে যুদেয়ার বেথলেহেম নগরে যীশুর জন্ম হয়। তাঁর জন্মের কিছু পরেই প্রাচ্যদেশ থেকে কয়েকজন জ্যোতির্বিদ পণ্ডিত জেরুজালেমে এসে উপস্থিত হলেন। সেস্থানে এসে তাঁরা জিজ্ঞাসা করলেন, "ইহুদীদের যে রাজা এখানে জন্ম নিয়েছেন তিনি কোথায় ? এই পুন্যস্থানের আকাশমণ্ডলে একটি উজ্জ্বল তারকার উদয় দেখে, সেই তারাটিকে অনুসরণ করে আমরা এখানে এসেছি। আমরা গণনা করে দেখেছি এই নবজাতক ইহুদীদের 'রাজা' যিনি মানুষের পাপ হরণ করতে ঈশ্বর কর্তৃক প্রেরিত হয়েছেন। আমরা এসেছি তার চরণে প্রণাম নিবেদন করতে।
এই কথা শুনে রাজা হেরোদ ভয়ঙ্কর উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন। হেরোদ তখন গোপনে পণ্ডিতদের ডেকে জানতে চাইলেন ঠিক কোন্ সময়ে তাঁরা ঐ নক্ষত্রটিকে উদিত হতে দেখেছিলেন। তারপর তিনি এই বলে তাঁদেরকে বেথলেহেম পাঠিয়ে দিলেন, "আপনারা গিয়ে ভাল করে শিশুটির খোঁজ নেবেন। খোঁজ পেলেই আমার কাছে খবর পাঠাবেন, আমিও গিয়ে শিশুটিকে প্রণাম নিবেদন করে আসব।" রাজার আদেশ পেয়ে সেই পণ্ডিতগণ যাত্রা করলেন। আর সেই যে উজ্জ্বল নক্ষত্রটি তাঁরা উদিত হতে দেখেছিলেন সেটি তাঁদের আগে আগে চলতে আরম্ভ করল যতক্ষণ না তাঁরা সেই স্থানে উপনিত হলেন যেখানে শিশুটির জন্ম হয়েছে। নক্ষত্রটির সঞ্চরণ স্থির হয়ে গেল। পণ্ডিতেরা আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠলেন। ঘরে প্রবেশ করে তাঁরা মা মেরীর কোলে শিশুটিকে দেখতে পেলেন। দেখলেন শিশুটিকে পরিবেষ্টন করে আছে এক স্বর্গীয় জ্যোতির্বলয়। তারা শিশুটিকে প্রণাম নিবেদন করলেন এবং রত্নপেটিকা খুলে উপহার দিলেন সোনা, ধূনো ও গন্ধনির্যাস।
পরে আশ্চর্যজনকভাবে তাঁরা স্বপ্নাদিষ্ট হলেন, রাজা হেরোদের কাছে তাঁরা ফিরে যেন না যান। অন্য পথ ধরে সেই পূর্বদেশের পণ্ডিতগণ নিজেদের দেশে ফিরে গিয়েছিলেন।
এই পুরোহিতরা, পারসিক ধর্মতাত্ত্বিকদের মতে, জরথ্রুস্টবাদী ছিলেন। (যীশু সেমেটিকভাষী সভ্যতার পয়গম্বর, অন্যদিকে ম্যাজাইগণ পারসিকভাষী আর্য।)
এই পুরাণ কাহিনীর কিছু বিষয়ের উপর খ্রীষ্টান ধর্মতাত্ত্বিকগণ টিকা করেছেন। 


১। রাজা হেরোদ ( খ্রীঃ পূঃ ৩৭--৪) চতুর হিংস্র প্রকৃতির রাজা ছিলেন। প্রতিদ্বন্দ্বিতার ভয়ে তিনি বহু বিশিষ্ট মানুষকে হত্যা করেছিলেন। এমনকি তাঁর স্ত্রী, তিন পুত্র এবং অনেক আত্মীয়দেরকেও নিষ্ঠুরভাবে পৃথিবী থেকেই সরিয়ে দিয়েছিলেন। তাই যখন তিনি শুনালেন, "ইহুদীদের রাজা জন্মেছেন", তিনি এমনই উদ্বিগ্ন ও ভয়ার্ত হয়ে উঠলেন যে সম্ভাব্য সেই রাজাকে ধংস করবার জন্য বেথলেহেমের, সেই সময়ে জন্ম নেওয়া কুড়ি পঁচিশ জন শিশুকে হত্যা করবার আদেশ দিয়েছিলেন। 

(রাজা কংশ ও কৃষ্ণ উপাখ্যানের সঙ্গে মিল পাওয়া যায় যেন)।

২। উপহার -- খ্রীষ্টধর্মাবলম্বী প্রাচীন মহাচার্যদের মতে ঐ প্রাচ্যদেশীয় পণ্ডিতমণ্ডলী (তিন জন, অন্যমতে একটি দল)। ছিলেন পারসিক পুরোহিত যাদের বলা হোত ম্যাজাই।
একেশ্বরবাদী পারসিক ধর্মে ঈশ্বরকে আহুর বা আহুরা মাজদা বলা হয় এবং ধর্মগ্রন্থের নাম আবেস্তা বা জেন্দাবেস্তা।
গবেষকদের মত অনুযায়ী ভারতবর্ষে ঋকবেদ এবং আবেস্তার লেখকদের পূর্বপুরুষগণ ছিলেন একই নৃগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। জেন্দাবেস্তার ভাষাও (এবেস্থিয়ান ভাষা) বৈদিক ভাষার মতই প্রচীন। পারসিকরা বিশ্বাস  করেন জেন্দাবেস্তার বাণীগুলি স্বয়ং জরাথুষ্ট্রের মুখনিঃসৃত। এই বাণীসমুহ প্রথমে শ্রুতি ও পরে লিখিত আকারে আবেস্তায় সংকলিত হয়েছে। শুধু তাই নয়, জেন্দাবেস্তার মধ্যেও ভারতবর্ষে রচিত ঋকবেদের দেবতাদের নাম পাওয়া যায় ; যেমন ইন্দ্র, মিত্র, বরুণ প্রভৃতি। ঐতিহাসিকদের মতে, প্রোটো-ইন্দো-ইরানীদের  আদি বাসভূমি ছিল মধ্য এশিয়া --- উত্তর পশ্চিম ইরাক ও আনাতোলিয়ার পূর্ব অংশ। খ্রীষ্টপূর্ব চার থেকে পাঁচ হাজার বছর আগে, আদি তাম্রযুগে ঐ প্রাচীন মানবগোষ্ঠী, বিশেষত চারণভূমির সন্ধানে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। তাদেরই একটি দল ভারতবর্ষে প্রবেশ করেছিলেন, যাঁরা ঋগ্বেদীয় আদি সুক্তগুলির রচয়িতা। ইতিহাসবিদ রোমিলা থাপার এই মতের সমর্থক। তার মতে "ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাভাষীদের মূল আবাসস্থল ছিল মধ্যেই এশিয়া এবং সেখানকার অভিবাসীরাই ইরানে আবেস্তা ও ভারতে বেদ রচনা করেন।" 

ভারতবর্ষের পারসি সম্প্রদায় 

ভারতীয় উপমহাদেশর পারসিক বা পার্সিগণ ঐ প্রাচীন জরথুষ্ট্রীয় সম্প্রদায়। তারা পারস্য উদ্বাস্তুদের বংশধারা। সপ্তম শতাব্দীতে ইরানে আরবীয় ইসলামের আক্রমণ ও সমস্ত ইরান ভূখন্ডে ইসলাম ধর্মের প্রচার, প্রসার ও ধর্মান্তরিতকরণের সময় নির্যাতিত হয়ে ও নিজস্ব ধর্মের সংরক্ষণের তাগিদে জরাষ্ট্রীয়ানরা ভারতে পালিয়ে এসেছিলন। তাঁদের ভাষা, সংস্কৃতি ও সমাজসংস্কার ইরানীয় ইসলামের চাইতে সম্পূর্ণ ভিন্ন। ১৬, ষোড়শ শতকে লিখিত পার্সি মহাকাব্য কিসসা-ই-সঞ্জান থেকে জানা যায় অষ্টম শতাব্দী থেকে দশম শতাব্দীর মধ্যে বৃহত্তর ইরান হোতে তাঁরা ভারতে আসেন এবং সঞ্জানের রাজা জাদি রানার বদান্যতায় তাঁরা বর্তমান গুজরাটের হিন্দু সম্প্রদায়ের সঙ্গে বসবাস আরম্ভ করেন। অগ্নিপূজক এই পারসিক ধর্মবিশ্বাসী দের মন্দিরও Fire Temple নামেই পরিচিত। গুজরাটের সাঞ্জান অঞ্চলে এমন একটি মন্দির আছে। 


পারসিকদের মৃতদেহ সৎকারের সংস্কার ছিল ভিন্নপ্রকার। মৃত্যুর পর তাঁরা মৃতদেহটিকে উন্মুক্তভাবে একটি নির্দিষ্ট স্থানে (শান্তিমঞ্চ বা Peace Tower) রেখে দিতেন যাতে শকুন জাতীয় শবভুকেরা সেটি খেয়ে ফেলতে পারে। বর্তমানে এই পদ্ধতিটির পরিবর্তন করে তাঁরা হিন্দুমতেই দাহ করার সংস্কার অবলম্বন করেছেন। পারসিকদের ধর্মধারণা, সামাজিক সংস্কার 'হিন্দু'মতের কাছাকাছি হলেও ধর্মতাত্ত্বিক ঐতিহাসিকদের মতে,

"Significant elements of Judaism, Christianity, and Islam may be of Zarathustrian origin. These elements include beliefs in Angels and in  Devils, in a Final Judgement and in a Resurrection of the Dead." 


পারসিকরা বরাবরই সংখ্যালঘু। বর্তমানে সমগ্র পৃথিবীতে তাদের সর্বমোট সংখ্যা অল্পবিস্তর ১৫ লক্ষ। ১৯১১সালের আদমসুমারী অনুযায়ী ভারতবর্ষে তাদের সংখ্যা ৫৭২৬৪ জন। তাদের এই ক্ষীয়মান অস্তিত্বের জন্য নৃতাত্বিক বিজ্ঞানীরা দুটি কারণ উদ্ঘাটন করেছেন। প্রথমটি অভিবাসন সমস্যা এবং দ্বিতীয়টি সন্তানহীনতা। 

পারসিয়ানরা ধর্মভীরু, নিরীহ কিন্তু অত্যন্ত বুদ্ধিমান।
May their tribe increase !
তাঁরা যেন ধনে, জনে, প্রাণে ঐশ্বর্যসমন্বিত হয়ে ক্রমবর্ধিষ্ণু হয়ে ওঠেন। 

জরাথুষ্ট্র প্রচারিত যে ধর্মধারণা তার বিশদ আলোচনা আছে জেন্দাবেস্তায় এবং সেই ধর্মগ্রন্থে লিখিত জরাথুষ্ট্রের বাণী অবলম্বন করে দার্শনিক নিৎসে (Friedrich Nietzsche) একটি ঐতিহাসিক পুস্তক রচনা  করেন --- 'Thus spake Zarathustra'.
তিনি যে ভাবে জরাথুষ্ট্রকে ঈশ্বরের সমতুল্যরূপে পুনর্নিমাণ করেছে তাতে একটি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র দার্শনিক মতবাদের সৃষ্টি হয়েছে। "ঈশ্বর মৃত" এবং "মৃতরা সকলেই  ঈশ্বর"----- নীৎসের এমন সব উপপাদ্য পরবর্তী কালে রাজনৈতিক ও‌ রাষ্ট্রনৈতিক ক্ষেত্রে এক ভয়ঙ্কর প্রভাব বিস্তার করছিল। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে, ১৯৩২ সালে নীৎসের বোন এলিজাবেথ ফোরষ্টার নীৎসে, যিনি নীৎসের সমস্ত পাণ্ডুলিপি প্রকাশ করেন। যার মধ্যে 'ইচ্ছার স্বায়ত্বশাসিত শক্তি ' ---- নীৎসের এই মতামতটিকে  যে ভাবে উপস্থাপিত ও ব্যাখ্যা করেছিলেন তার প্রভাব পড়েছিল  সমকালীন  ইউরোপের রাষ্ট্রাদর্শে, বিশেষ করে  ইতালি, ফ্রান্স ও জার্মানীতে। রোমান ফ্যাসেসের মতই  একক এক শক্তি ও ঐক্যের প্রতীক রূপে ফ্যাসিবাদ ও নাজিবাদের জন্ম হয়েছে।  তাই নীৎসেকে Godfather of Fascism বলা হয়।  The will of Power  বইতে  নীৎসে  যুদ্ধ ও যোদ্ধাদের শ্রেষ্ঠত্বের প্রসংশা করে ছিলেন যার  উৎস তিনি আহরণ করেছিলেন  জরাথুষ্ট্রের  'অতিমানবতা ' ব্যাখ্যা করে। ফলস্বরূপ  বিংশ শতাব্দী পেয়েছিল ইতালিতে বেনিটো মুসোলিনি এবং জার্মানীতে হিটলারের মত সর্বধংসী একনায়কতন্ত্রী শাসকদের। কিন্তু  সুপ্রাচীন এই পারসিক সম্প্রদায়ের‌ মতে এ-জগত শুভাশুভ দুই শক্তির দ্বন্দ্বক্ষেত্র, মানুষকে তাঁরা আহ্বান করেছিলেন শুভ দেবতার পক্ষে যোগ দেবার জন্যে। ফল হোল বিপরীত। 


যাই হোক্, এটি একটি গুরুতর প্রসঙ্গ যা স্বতন্ত্র প্রবন্ধে উপস্থিত করবার ইচ্ছা রইল। প্রসঙ্গটির ইঙ্গিত এই কারণেই যে জরাথুষ্ট্রের উপর লেখা "Thus Spake Zarathustra" গ্রন্থে জরথুষ্ট্রীয় ধর্মধারণাকে ধংসাত্মক রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কী ভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল এবং করা হয়ে থাকে সেটি বলার জন্যই এই প্রসঙ্গের অবতারণা। 

এতদূর পর্যন্ত আলোচনা করে আমরা এই সত্যটি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছি যে ধর্ম যখনি রাজার পৃষ্টপোষকতা লাভ করেছে, যখনি ধর্ম আগ্রাসী শক্তিতে পর্যবসিত হয়েছে, যখনি ধর্মের সঙ্গে  খড়্গের যোগ ঘটেছে তখনই ধর্ম রক্তপিপাসু। ধর্মের হাঁড়িকাঠে মানবতা বলি প্রদত্ত হয়েছে সুদূর অতীত থেকে বর্তমান সময়কাল পর্যন্ত নিরন্তর, অবিরাম। 

                             (ক্রমশঃ)
দুলাল চন্দ্র বন্দোপাধ্যায়
১৬/০২/২০২৪
শিলিগুড়ি।







1 টি মন্তব্য:

Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...