বুধবার, ১৭ জুলাই, ২০২৪

অমাদিন


অমাদিবস

হে রাত্রি, তোমার আধাঁরের মায়া জানি, 
মানিও তোমার ভীষণা রূপের লীলা ; 
কিন্তু যদি ওই কালিকালো আবরণ 
গায়ে ঢেকে আসে দিন --- 
আসে সূর্যবিহীন, শশীতারাহীন বেলা ! 
আসে ঊষা-আশাহারা ভীষণামূর্তি কাল, 
এমন লগ্ন যখন হবে না পূজা, হবে না সন্ধ্যা-আরতি, 
হবে না শঙ্খ বাজানো কিংবা অর্ঘ্য সাজানো, 
ভৈরবী সুরে সানাইয়ের সাথে 
বৈতালিক গান গাওয়া। 
চারিদিকে শুধু বেঘোরে রয়েছে 
অঘোরপন্থী নিশা, 
শুধু শ্বাপদের বিকৃত স্বরে 
সত্যমিথ্যা গুলানো, 
মানবতা-কাটা-রক্তের দাগ মোছানো 
কোন হাসি-তাতাদের অশ্রু গলানো বেদনা 
ভাগিরথী তীরে প্রশ্ন করেনা, "এতো রক্ত কেন ?" 
রবিকরস্নাত, শিশিরধৌত, মেঘছায়াঢাকা দেশে 
শ্যাম তৃণাসনে শোয়ানো রয়েছে 
শতাব্দীজুড়ে শতকোটি শব -- 
(স্বর্গলাভের অকাল মরণ-সাধনা!) 
সকলই কি তার নিয়তির লাঞ্ছনা‌ ? 
কুরু পাঞ্চাল যদুবংশের বীভৎস পরিণাম --- 
আত্মহনন ভ্রাতৃনিধন আজও অব্যাহত। 
দেশ কাটা হোল, দাঙ্গা ফুরালো, জুড়াইনি ক্ষতদাহ। 

এখনো হিংসা রক্তের খোঁজে অবিরাম সিঁধ কাটে 
মাতৃজঠরে, প্রিয়ার বক্ষে --- শান্তির গৃহনীড়ে। 
 বঙ্গ, তোমার ললাট লিখনে শুধু কি শোণিতরেখা ? 
রবিকরসুধাসিঞ্চিত-প্রেম কখনো যাবে না দেখা ? 
___________________________________________

এই কবিতাটি লেখার পটভূমিকায় আছে বাঙলার (অবিভক্ত বাঙলা) শতাব্দীব্যপ্ত ইতিহাস আর মননে আছে অশ্রুসজল বেদনার আশাহত আর্তনাদ। বাঙলা ভালো নেই, ভালো নেই কয়েক 'শ বছর। ১৭৭৬ বা ৭৬-য়ের মন্বন্তর থেকে ১৯৪৬ বা  '৪৬--'৪৭-য়ের দাঙ্গা, দেশভাগ, দুর্ভিক্ষ --- এই দুই থেকে আড়াই শতাব্দীব্যাপী বাঙলার অন্তরাত্মার ক্রন্দন থামেনি। যদিও তার আগেও, দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের  (১৯৪৯ --১৯৪৫) পৃথিবী-পোড়ানো আগুনের লেলিহান শিখা ঝলসে দিয়েছিল ভারতসহ বিশ্বের সমস্ত ইউরোপীয় উপনিবেশগুলিকে।
সভ্যতার মহাসঙ্কটের সেই বিপুল বিরাট অধ্যায়ে প্রবেশ করলে একটি মহাভারত সৃষ্টি হবে ; এস্থলে তার প্রয়োজন নেই। আমরা, আমাদের জীবদ্দশার কিছু পূর্ব হতে যা পড়েছি, শুনেছি এবং যা স্বচক্ষে দেখছি বাঙলার সেই ইতিহাস সামগ্রিকভাবে অহিংস থাকেনি কোনদিনও। এই ইতিহাস বার বার হি়ংসার তান্ডবে রক্তরঞ্জিত। স্বাধীনতার পরে চল্লিশ পঞ্চাশের দশক দেখেছে গঙ্গায় পদ্মায় রক্তের স্রোত, দেশছাড়া গৃহহারা উদ্বাস্তুদের দিশাহারা, অসহায় হাহাকার, "ফেন দাও মা" -- আর্তনাদ, ক্যাম্পে ক্যাম্পে পাশব জীবন, শিশু-বৃদ্ধ -- সহস্র সহস্র নরনারীর অকাল মৃত্যু। তারপর ষাটের দশকের শেষভাগ থেকে আজ পর্যন্ত , অর্ধ শতাব্দীর অধিক কাল ধরে  --- কি দক্ষিণ পন্থী, কি বামপন্থী --- সমস্ত চরিত্রের শাসকের শাসনকালে সংঘঠিত হয়েছে সংগঠিত হত্যালীলা, কখনো গোপনে কখনো প্রকাশ্যে। এ সকলই ঘটেছে আমার বর্তমানতায়।
আজ আবার এই বাঙলার বহু জাতিসত্ত্বা ও ধর্মধারণার জনসমাজে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের অমানবিক প্রবনতা প্রকটভাবে দৃশ্যমান। মহাপ্রভু চৈতন্যেদেব থেকে শ্রীরামকৃষ্ণ --- এ সকল যুগাবতার, চন্ডীদাস থেকে রবীন্দ্র- নজরুল -- এই সব প্রেমাবতারদের "আজি দুর্দিনে ফিরানু তাদের ব্যর্থ নমস্কারে।"
তাই একবুক হতাশার গর্ভ থেকে জন্ম নিয়েছে আমার এই কবিতাটি --- 'অমাদিন'।
(কবিতাটি গদ্য কবিতা এবং সংস্কৃত ছন্দশাস্ত্রের একটি বিশেষ ছন্দে লেখা হয়েছে কবিতাটি। পড়ুন,পড়ান এবং আপনাদের মতামত লিখুন।)

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
জুন ১৭, ২০৩৪
ব্যাঙ্গালোর।‌ 
___________________________________________











1 টি মন্তব্য:

  1. আপনার এই কবিতাটি আমার মনে গভীর নাড়া দিয়েছে ধন্যবাদ কবিবর

    উত্তরমুছুন

Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...