শনিবার, ৬ এপ্রিল, ২০২৪

রামায়ণে অবিচার (দুই)

রামায়ণে অবিচার (দুই) 


পরমারাধ্যা, মাতৃসমা বৈদেহীকে বিসর্জন দেওয়ার কর্মটি তাঁকে দিয়েই কেন করালেন রাম ! জানতেন কি তিনি যে যত কঠোর, যত অসাধ্য কাজই হোক না কেন লক্ষ্মণ রামচন্দ্রের অবাধ্য হতে পারবেন না। লক্ষ্মণের প্রতি এই বিশ্বাসের বশে এমন নির্দয় ভাবে এমন মর্মবিদারী আদেশ দেওয়া কি চিরশরণাগত, চির অনুগত ভক্তের প্রতি ভক্তবৎসল রামচন্দ্রের শেষ 'উপহার' !

যাই হোক্, ওদিকে আশ্রমবাসী মুনি কুমারদের দ্বারা শোকাকুলা, সঙ্গীহীনা, সীতাদেবীর সংবাদ যখন ত্রিকালজ্ঞ মহর্ষি বাল্মীকির কর্ণগোচর হোল তখন তিনি স্বয়ং সীতার নিকট গিয়ে উপস্থিত হলেন। তিনি অতি সুমধুর কণ্ঠে দশরথের পুত্রবধূ, জনকনন্দিনী, শ্রীরামভার্যা সীতা দেবীকে বললেন, মা, তুমি কেন এখানে  এসেছ আমি তপোবলে তা জেনেছি। হে পতিব্রতা, অপাপবিদ্ধা, তুমি আমার আশ্রমে স্বাগত। আশ্রমের অদূরে তাপসীগণ থাকেন, তাঁরা তোমাকে কন্যার ন্যায় প্রতিপালন করবেন।
দূর থেকে লক্ষ্মণ সে দৃশ্য দেখে সামান্য হলেও দুশ্চিন্তামুক্ত হলেন। ভারাক্রান্ত হৃদয়ে সারথি সুমন্ত্রকে বলেছিলেন, রাম সীতার এই বিচ্ছেদ যদিও মনে হয় দৈবাধীন, তবুও বলি, অন্যায়বাদী পৌরজনের কথা শুনে রাম এই যে যশোনাশক কর্ম করলেন তাতে তাঁর কোন্ মহদ্ধর্ম সাধিত ও সম্পাদিত হবে ?
যাই হোক্, শোকসন্তপ্তচিত্ত লক্ষ্মণ প্রত্যাবর্তনের পথ ধরে কৌশিনী নদীর তীরে এক রাত্রি যাপন করে অযোধ্যায় ফিরে এলেন। রাজা রামচন্দ্রের বিরহকাতরতা দেখে লক্ষ্মণ তাঁকে এই বলে প্রবোধ দেওয়ার চেষ্টা করেন,

-------- সর্বে ক্ষয়ন্তা নিচয়াঃ পতনাত্মাঃ সমুচ্ছ্রয়াঃ।
সংযোগা বিপ্রয়োগান্তা মরণান্তং তু জীবিতম্।।

দেখুন, সঞ্চয় ক্ষয়ে, উন্নতি পতনে, মিলন বিচ্ছেদে, জীবন মরণে বিলয় হয়। এই সত্য স্বীকার করতেই হবে। আবার এখন আপনি যদি মৈথিলীর জন্য শোক বিহ্বল হয়ে পড়েন তবে যে অপবাদের ভয়ে ( কলঙ্কিত স্ত্রীর প্রতি অত্যাসক্ত রাম) আপনি তাঁকে ত্যাগ করলেন, সেই অপবাদ লোকমুখে প্রচারিত হবে।
অতএব রামচন্দ্রের নীরবে অনুতাপ ভোগ করা ছাড়া আর কোন উপায় আর রইল না।
রামচন্দ্র বিষ্ণুর অবতার -- এই লোকায়ত পুরাণপ্রবাদ অবলম্বন করেই মহাকবি বাল্মীকি রাম চরিত্র অঙ্কন করেছেন এবং তিনি এস্থলে একটি অতীত কাহিনীর উল্লেখ করেছেন।
মহর্ষি বশিষ্ঠের আশ্রমে একদা রাজা দশরথ এবং মুনি দুর্বাসার কথোপকথন হয়। তাঁর বংশের গতি ও পরিণতি কী হবে এই প্রশ্নের উত্তরে দুর্বাসা রাজা দশরথকে বলেন যে, দেবতাদের দ্বারা নির্যাতিত ও নিপীড়িত হয়ে দৈত্যগণ যখন দৈত্যগুরু ভৃগুর পত্নীর নিকট আশ্রয় লাভ করেন তখন বিষ্ণু অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠেন এবং আপন চক্রে ভৃগুপত্নীর শিরশ্ছেদ করেন। নিহত পত্নীর শোকে ভৃগুমুনি মুহ্যমান হয়ে পড়েন। বিষ্ণুকে অভিশাপ দেন এই বলে যে,  

তোমাকে মানবজন্ম নিতে হবে এবং বহুবর্ষব্যাপী পত্নীর বিচ্ছেদযন্ত্রনা ভোগ করতে হবে।

সেই অভিশাপের ফলেই রাম রূপে বিষ্ণু মর্ত্যে অবতীর্ণ হয়েছেন এবং ওই পূর্বজন্মের অভিশাপ বহন করতে তিনি বাধ্য। নিয়তি নির্ধারিত জীবন তাঁরও।
এখানে মহাকবি একটি গূঢ় দার্শনিক মতবাদ প্রতিষ্ঠা করেছেন। দেবতাদেরও তিনি চারিত্রিক কলুষমুক্ত, সর্বগুণসমন্বিত সত্ত্বা বলে স্বীকার করেন নি। তাঁদের অন্তরপ্রকৃতিতে মানবোচিত দোষ গুণের অস্তিত্ব ছিল এবং তা নিষ্ঠুর ভাবেই ছিল। নইলে দেবশ্রেষ্ঠ বিষ্ণু কিভাবে একজন দয়াময়ী, সহানুভূতিসম্পন্না নারীর মুন্ডচ্ছেদ করতে পারেন ?
রামের রাজ্যে স্বয়ং রাজা রামচন্দ্রের দ্বারাই আরো এমনি এক 'অমানবিক' দেবস্বভাবের মতোই নির্মম হননক্রিয়া অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এক বৃদ্ধ গ্রামবাসী ব্রাহ্মণের একমাত্র পুত্রের মৃত্যু হয়। ব্রাহ্মণের বক্তব্য ছিল "রাজার দোষেই ওই বালকের অকাল মৃত্যু ঘটেছে।" রাজা রামচন্দ্র বশিষ্ঠাদি ঋষির একতরফা বিচার শুনলেন।
"মহারাজ, তোমার রাজ্যে কোন দুর্বুদ্ধি শূদ্র তপস্যা করছে, সেই পাপেই এই বালক মরেছে।" 


রাম রথারোহনে তাঁর সাম্রাজ্যের সর্বত্র অনুসন্ধান করে অবশেষে দক্ষিণ দিকে গিয়ে দেখলেন শৈবাল পর্বতের উত্তরে এক সুবিশাল সরোবরের তীরে অধোমুখে লম্বমান হয়ে এক তপস্বী তপস্যা করছেন। রাম তাঁর পরিচয় জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলেন যে তিনি একজন শূদ্র, নাম শম্বুক। তিনি জানালেন তিনি দেবত্বলাভ এবং দেবলোক জয় করার জন্য এমত কঠোর তপস্যায় ব্রতী হয়েছেন।
তাঁর কথা শোনা মাত্র রাম খড়্গাঘাতে তাঁর দেহ হতে মস্তক ছিন্ন করে দিলেন।
এই নৃশংস, "পাপাচার" করার পর স্বর্গ হতে পুষ্প বৃষ্টি হতে লাগল। দেবগণ বললেন, রাম, তুমি আমাদের প্রিয় কার্য সাধন করেছ। তোমার জন্যই শূদ্র স্বর্গাধিকারী হোল না এবং দেবতাদের বরে, এই শূদ্রের নিধনের সঙ্গে সঙ্গেই সেই ব্রাহ্মণের সন্তান জীবন লাভ করেছিল।

(মনে রাখতে হবে আজ থেকে আড়াই হাজার বছর আগে এই ভারতবর্ষের সমাজ জীবনে যে  হৃদয়হীন ব্রাহ্মণ্যবাদ প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল, আর তার  প্রভাব যে রামচন্দ্রের মত রাজাকেও প্রভাবিত করেছিল মহাকবি কী অপূর্ব সূক্ষ্ম ঔপন্যাসিক বুননে তার বর্ণনা উপস্থাপিত করেছেন। তাই রামায়ণ একটি আদিমতম বিরাট সাহিত্যসৃষ্টি রূপে বিবেচিত হোক্, দুই তিন হাজার বছর পরে আধুনিক মানবতাবাদী চিন্তনে তার প্রভাব না পড়ুক, এমনটি কামনা করি।)

আজ এ পর্যন্তই। আবার পরের পর্বে। একটি বিয়োগান্তক মহাপরিণাম ! অপেক্ষা করুন।
______________________________________________


1 টি মন্তব্য:

Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...