প্রাণধাত্রী ধরিত্রী
(প্রাণের প্রথম ও আদি জন্মদাত্রী জননী বসুন্ধরা। মাতৃগর্ভচ্যুত প্রাণকণিকার প্রথম ধাত্রীও এই ধরিত্রী মাতা। আন্তর্জাতিক নারীদিবসে তারই উদ্দেশে এই কবিতাটি)।
অন্তহারা সে সুদূর অতীত হবে
বসুধার মুখে আলো পড়েছিল যবে,
প্রাণের প্রদীপ জ্বালালো বসুন্ধরা
বিশ্বভূবনে বন্ধ্যা পাষাণে ঝর ঝর জলধারা
প্রাণের অমৃতে ভরা।
কত যুগ কত যুগান্ত অবসান
স্ফটিক পাথরে মৃত্যুগরল নিত্য করিয়া পান
শাশ্বত প্রাণের মহিমা উঠেছে জ্বলে
আকাশে বাতাসে মরুময় দেশে ভূধরে জলে স্থলে।
যুগসন্ধির রহস্য আলোর সাজে
অপাপবিদ্ধ নর নারী এলো বিধাতার দেওয়া কাজে।
দেহমন্দিরে তার
আনন্দময় মানবমূর্তি বিমূর্ত চেতনার।
তারপর ? ইতিহাস কথা কয় --
যুগে যুগে এলো কত সভ্যতা, শত সভ্যতা লয়।
লয় শুধু নয়, প্রকৃতির শাপে সঞ্চিত যত শৌর্য,
ক্ষয়ে ক্ষয়ে হারা কীর্তিস্তম্ভ, দম্ভের মাৎসর্য।
পশুত্ব-স্বভাব পশুরা তো ছিল, এখনো কিছুবা আছে।
পাখীরা রয়েছে, গান গেয়ে বাঁচে, প্রকৃতির তালে নাচে।
তারা পৃথিবীর ভালোবাসা বোঝে, জ্ঞানের গরিমা-হারা
শুধু মানুষের লালসা আগুনে দগ্ধ বসুন্ধরা।
যুগে যুগে সে জ্বেলেছে আগুন, নিজেও জ্বলেছে চিতায়
দ্যুলোকের বাণী ধ্বনিত নিয়ত শোনেনি অহমিকায়।
মহাকবি বলে, "হে অতীত, তুমি কথা কও কথা কও"--
আমি বলি, "ওগো গতকাল, তুমি বিস্মৃত হয়ে রও।"
ভালো যত আছে তার চেয়ে কালো দেখি সহস্রগুণে,
অবোধ অবুঝ নিহত নিত্য কুটিল রণাঙ্গনে।
বিদ্যুৎ ঝলে ঝঞ্ঝার মেঘে তারেও অভয় মানি।
অসহায় বুকে হাহাকার আনে অস্ত্রের ঝলকানি।
সাগরের কূলে, মরুপ্রান্তরে শ্যামল সজল ধরায়
মৃত নরনারী, শিশুদের দেহ শোণিত পঙ্কে লুটায়।
মনে করে দেখ কুরুক্ষেত্র, -- মহাযুদ্ধের অবসানে
অস্তসূর্য স্থির অপলক নিষ্প্রাণ প্রাঙ্গনে।
কুরুপাণ্ডব আরো যত শব আঠারো অক্ষৌহিনী --
রথী মহারথী কুশলী সারথি অশ্ব-হস্তিবাহিনী,
সব যবে শেষ শুধু অবশেষ মূর্ত শোকের হাহারব --
ছুটে সুভদ্রা পাগলিনী মাতা খুঁজে খুঁজে ফিরে কার শব !
হঠাৎ যেখানে দাঁড়ালেন এসে -- বাহ্য-চেতন হারা --
অভিমন্যুর মৃতদেহ কোলে বসে আছে উত্তরা !
শূন্য দৃষ্টি শূন্যের দিকে, গর্ভে রয়েছে প্রাণ !
মরণের পায়ে জীবনকে রেখে নারীত্ব বলিদান !
এমনি নিযুত ভ্রাতৃহনন আত্মহনন শেষে
আজিও মানুষ নির্বিণ্ণ নয় আত্ম-সর্বনাশে।
ঝটিকা, প্লাবন, দাবানল যত প্রকৃতির তাণ্ডবে
ভেঙেছে আলয় আবার গড়েছি নব নব অনুভবে।
যে বিশ্বমারি মড়কে মরেছে লক্ষ লক্ষ প্রাণ
মানুষেরই জ্ঞানে, দুঃসাধ্য সাধনে তারও হবে অবসান।
কিন্তু যে পাখি বুকে-বেঁধা তীর আফগানি গুলবাগে
থামালো গজল হঠাৎ মরণে 'সোমেতে' ফেরার আগে।
নির্বোধ শিশু প্রাণহীন যীশু মধ্য সাগর তীরে
কোথা তার গৃহ, পিতা মাতা স্নেহ, দেখল না কেউ ফিরে।
কার পাপে হেন, কোন্ অভিশাপে নির্মম পরিণাম ?
'ফরিস্তা' চুকাবে জীবন মূল্যে অমানবিকতার দাম ?
আঁধি ব্যাধি আর দৈব বিধান সমস্ত জয় করে'
স্বকৃত পাপের তরবারি নিয়ে মানুষ মরে ও মারে।
নূতন নূতন ধর্ম-সৃজন, সেই ধর্মের অজুহাতে
দেশে দেশে যত ঘাতকের দল রক্ত-সিনানে মাতে।
মুনাফার ঘোরে উল্লাসে নাচে অস্ত্রের কারবারি
ধরাধামে সুখ স্বপ্নের ইতি, ভিন্ গ্রহে দিবে পাড়ি।
নেশাখোর আশা হয়েছে দুরাশা অন্তিম আসে ঘনায়ে --
অবলুণ্ঠিতা কুণ্ঠিতা ধরা সে কথা দিয়েছে জানায়ে।
সভ্যতা, তুমি রোগাক্রান্ত -- এখন এবার থামো।
প্রাণধাত্রী ধরিত্রী জননী, বল তারে, "নমো নমো"।
ক্ষমা কোরো মাগো সর্বংসহা, এ বিশ্ব সংসারে
তুমিই রয়েছ প্রাণদীপ জ্বেলে লোকে ও লোকান্তরে।
সকল জীবের শ্রেষ্ঠ মানব -- জন্মদাত্রী তুমি,
তোমার বিপুল স্নেহভরা কোল সবার জন্মভূমি।
যুগে যুগে এল শান্তির দূত অমৃত মন্ত্র নিয়ে,
বরণ করেছে অকাল মরণ আমাদের পাপ ধুয়ে।
শোণিত-পিয়াসী যে অসুর জাগে মানুষের অন্তরে --
মানবতাহীন ধর্ম সাধন কাপালিক উপচারে।
নরবলিদান হবেনা বন্ধ ? হবেনা কি প্রেমদান ?
নব প্রভাতের রবিকর-দীপ, নব রাগ, নব তান ? এ
একই পৃথিবী, এক মহানীড়, এক সুরে গান গাই।
সবার উপরে জননী সত্য তাহার উপরে নাই ।।
(পরিমার্জিতরূপে পুনঃপ্রকাশিত
০৮/০৩/২০২৪)
দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
০২/১২/ ২০২৩
কলকাতা।
অসাধারণ।
উত্তরমুছুন