পর্ব ১
"পাঠক, কতকগুলি আনাড়িতে রটান, হুতোমের নক্সা অতি কদর্য বই, কেবল পরনিন্দা, পরচর্চা, খেউড় ও পঁচালে পোরা। শুদ্ধ গায়ের জ্বালা নিবারণার্থে কতিপয় ভদ্রলোককে গাল দেওয়া হয়েছে।"
বস্তুত ১৮৬৩- ১৮৬৪ সালে, কালীপ্রসন্ন সিংহ যখন তাঁর হুতোম প্যাঁচার নক্সা প্রকাশ করেছেন তখন কলকাতার সমকালীন স্বল্প শিক্ষিত, শিক্ষিত এবং আত্মমন্যতা-গর্বী শিক্ষিত সমাজের গলায় পাঁঠার মাংসের কাঁটা আটকে গেল ; না যায় গেলা, না যায় ফেলা।
আসলে এই সময়কালের বাঙলার, বিশেষ করে কলকাতার --- গ্রাম্যতা-দোষ লালিত নাগরী শহরের --
সমাজ সংস্কৃতির যে ছবি আঁকা হয়েছে এই নক্সাটিতে তার পটখানি বেশ কৌতুহলোদ্দীপক। রাজা রামমোহন রায় তখন সবে (১৮৩৩ সাল) গত হয়েছেন। ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের বিদ্রোহী চিন্তা- চেতনা উজাগর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮-'৯৪) বাঙলা সাহিত্যের ( উপন্যাস, প্রবন্ধ, গীতাভাষ্য) যুগান্তকারী সৃষ্টিকর্মে নিমগ্ন। মাইকেল মধুসূদন দত্ত (১৮২৪-'৭৩) বাঙলা কাব্য সাহিত্যের কান্তকোমল গীতধর্মীতা ভেঙে অমিত্রাক্ষর ছন্দের শঙ্খস্বরে মত্ততা জাগিয়ে তুলেছেন। সিপাহী বিদ্রোহের তপ্ত তাপ, নীল বিদ্রোহীদের অসম যুদ্ধের মরণপণ হুঙ্কার কলকাতায় ধেয়ে আসছে। হিন্দু ধর্মের নবরূপায়ণের সাধনা চলেছে দুই দিক থেকে। এক দিকে রামমোহন রায় প্রতিষ্ঠিত ব্রাহ্ম সমাজের দুই কান্ডারীর (দেবেন্দ্র নাথ ঠাকুর, ১৮১৭-১৯০৫, কেশব চন্দ্র সেন ১৮৩৮-'৮৪) সাধনপথের দ্বন্দ্ব ; অন্য দিকে দক্ষিনেশ্বর মন্দির প্রাঙ্গনে শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের ভবতারিণী আরাধনা।
পর্ব - ২
এই সময়টিকে আমরা বাঙলার 'নবজাগরণের কাল' নামে অভিহিত করে থাকি। পূর্ব আলোচিত সমস্ত ঘটনা সত্য এবং তার প্রভাব জনমানসে বিপ্লবাত্মক বিবর্তন এনেছিল -- নূতন উন্মাদনা ও উত্তেজনার সৃষ্টি করেছিল, একথা অস্বীকার করবার কোন উপায় নেই। কিন্তু এই সকল নবচেতনার আলোকবর্তিকার তলার অন্ধকারে, নবায়িত নগরী কলকাতার সামাজিক রুচি, রীতিনীতি, সংস্কারাচ্ছন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালনের যে বিকৃতি, বিচ্যুতি সংঘটিত হোত তার বিচিত্র চিত্রগুলি ধরা পড়েছে নিশি জাগরণে অভ্যস্ত হুতোম প্যাঁচার। যেমন দেখছেন, তেমনি লিখছেন।
আর যদি সেই লেখায় বিদ্যাসাগরী, বঙ্কিমী, দেবেন ঠাকুর বা কেশব চন্দ্রীয় কলমের আঁচড় দেওয়া হোত তবে তো নক্সাটি কাল্পনিক রেখাচিত্রের 'পেইন্টিং' হয়ে উঠতো। সেখানে তো আমরা সমকালীন আসল কলকাতাকে হারিয়ে ফেলতাম চিরকালের জন্য। এই চিরকালের জন্যই একটি ঐতিহাসিক সাহিত্য গ্রন্থ রেখে গিয়েছেন সল্পায়ু কালীপ্রসন্ন সিংহ।
কিন্তু তাঁর লেখনীর সে ক্ষমতা ছিল যে ঐ চিত্রপটে সমকালের উচ্চবর্গীয় সাহিত্য রচয়িতাদের মত সাধু বা সুমার্জিত ভাষার রঙ বুলাতে পারতেন। তিনি বইয়ের গৌরচন্দ্রিকায় বলছেন,
"জগদীশ্বরের প্রসাদে যে কলমে হুতোমের নক্সা প্রসব করেছে, সেই কলমই ভারতবর্ষের নীতি প্রধান ধর্ম্ম ও নীতিশাস্ত্রের প্রধান উৎকৃষ্ট ইতিহাসের ও বিচিত্র বিচিত্র চিত্তোৎকর্ষ বিষয়ক, মুমুক্ষু, সংসারী, বিরাগী ও রাজার অনন্য অবলম্বনস্বরূপ গ্রন্থের অনুবাদক (এখানে তাঁর অনন্য কীর্তি মহাভারত অনুবাদের কথা উল্লেখ করেছেন) ; সুতরাং এটা আপনি বিলক্ষণ জানবেন অজগর ক্ষুধিত হলে আরসুলা খায়না ও গায়ে পিঁপড়া কামড়ালে ডঙ্ক ধরে না। হুতোমে বর্ণিত বদমাইশ ও বাজে দলের সঙ্গে গ্রন্থকারের সেই সম্পর্ক।
তবে বলতে পারেন, কেনই বা কলকেতার কতিপয় বাবু হুতোমের লক্ষ্যান্তর্ব্বতী হলেন ; কি দোষে বাগাম্বর বাবুকে, প্যালানাথকে, পদ্মলোচনকে মজলিসে আনা হল ; কেনই বা ছুঁচো শীল প্যাঁচা মল্লিকের নাম করলে ; কোন দোষে অঞ্জনা রঞ্জন বাহাদুর ও.... হুজুর আলি, আর পাঁচটা রাজা রাজড়া থাকতে আসোরে এলেন ? এর উত্তর এই যে হুতোমের নক্সা বঙ্গ সাহিত্যের নূতন গহনা ও সমাজের পক্ষে নূতন হেঁয়ালি।"
মহাভারত অনুবাদক তো মহাকাব্যের আঙ্গিক, শৈলী জানতেন এবং সংস্কৃত ভাষায় পারঙ্গমও ছিলেন। তৎসম শব্দ-প্রধান বিদ্যাসাগর বা বঙ্কিমচন্দ্রের রচনার ন্যায় কিছু অনন্যসাধারণ সৃষ্টি আমাদের দিয়েও যেতে পারতেন কিন্তু তিনি সেই পথ স্বেচ্ছায় পরিত্যাগ করে বাঙলার সাহিত্য ভান্ডারে যা রেখে গিয়েছেন তা সত্য সত্যই নূতন গহনা। বাঙলা চলিত ভাষারীতির, বাঙলার কৃত্রিমতা- হীন রসসাহিত্যের উদ্বোধন হোল তাঁরই হাতে। আর তাঁর ব্যবহৃত যে শব্দগুলির প্রতি অশ্লীলতা, রুচিহীনতার কলঙ্ক আরোপিত হয়েছে সেগুলি তো তাঁর নক্সায় যথাযথ, সামান্য পরিমার্জিত হলে রসভঙ্গ হোত।
" কোথাও পাদরী সাহেব ঝুড়ি ঝুড়ি বাইবেল বিলুচ্ছেন, কাছে ক্যাটিকৃষ্ট সুবর্ব্বন চৌকিদারের মত পোশাক --- পেন্টুলেন, ট্যাংট্যাঙে চোপকান, মাথায় কালো রঙের চোঙাকাটা টুপী --- আদালতী সুরে হাত মুখ নেড়ে খ্রীষ্ট ধর্মের মাহাত্ম্য ব্যক্ত করছেন ---- হঠাৎ দেখলে বোধ হয় যেন পুতুল নাচের নকীব। কতকগুলা ঝাঁকাওয়ালা মুটে, পাঠশালের ছেলে ও ফ্রিওয়ালা একমনে ঘিরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ক্যাটিকৃষ্ট কি বলছেন কিছুই বুঝতে পারছেন না। পূর্বে বওয়াটে ছেলেরা বাপ মার সঙ্গে ঝগড়া করে পালিয়ে যেতো, নয় খ্রীষ্টান হোত, কিন্তু রেলওয়ে হওয়াতে পশ্চিমে পালাবার বড় ব্যাঘাত হয়েছে, আর দিশী খৃষ্টানদের দুর্দশা দেখে খ্রীষ্টান হোতেও ভয় হয়।" ---
- এই যে নগরীর গলিতে গলিতে, রাজপথে, পাড়ায় পাড়ায়, মহল্লায় মহল্লায় বিচিত্র, চিত্তোৎকর্ষক চিত্র প্রদর্শনী, তার জন্য হুতোমী ভাষা একমাত্র, যোগ্যতম, একমেবাদ্বিতীয়ম্।
এই ঐতিহাসিক সময়কালের পর বাংলা সাহিত্যের মন্দির প্রাঙ্গনে নবযৌবন-সমুদ্ভাসিত বিশ্বকবির আবির্ভাব। বাংলা ভাষা ও বাংলা শব্দ সৃজনের দেবদূত রবীন্দ্রনাথের পরিশীলিত, পরিমার্জিত সাহিত্য --- কাব্য, প্রবন্ধ, উপন্যাস, নাটক, গীতিকবিতা --- পাঠের রুচি, রসানুভূতির নিরিখে বিচার করে হুতোমের নক্সাকে 'নিম্নরুচির রচনা' আখ্যা দিয়ে, সাহিত্যের ঐতিহাসিকতাকে, সর্বত্রগামীতাকে অস্বীকার করবার প্রয়াস সাহিত্যিকের প্রতি শ্রদ্ধাহীনতার নামান্তর।
আমি ঝাড়খণ্ডের মানুষ।
______________________________________________
অসাধারণ
উত্তরমুছুন