একটি গাথা
দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়
—---------------------------
(ভূমিকা)
পাখি, ফুল, নদী, মেঘ, পাহাড়, সাগর –- প্রকৃতির নৈসর্গিক সৌন্দর্য ও মহিমাকে বিষয়বস্তু বা ভাববস্তু রূপে গ্রহণ করে, বরণ করে বিশ্বের সাহিত্য, শিল্প ,সঙ্গীত পরিপুষ্টি লাভ করেছে মানুষের সংস্কৃতি চেতনার ঊষাকাল থেকেই। প্রকৃতির সন্তান জীবজগৎ–- মানুষ জীবশ্রেষ্ঠ। মানবেতর জীবজগৎ তার জৈবজীবনের প্রয়োজনেই প্রধানতঃ প্রকৃতিকে আশ্রয় করে বাঁচে ; কিন্তু চৈতন্যসত্ত্বার ,হৃদয়বত্তার ও মননশীলতার ঐশ্বর্যে ঋদ্ধ মানুষ জৈবিকতার প্রয়োজনে প্রকৃতি নির্ভর, একথা সত্য কিন্তু পূর্ণ রূপে বিকাশলাভ করে
প্রকৃতির প্রেমে ; তার রূপ-রস-গন্ধ-স্পর্শ আত্মস্থ করে'। এই নিসর্গ প্রেমের বিবর্তন ধারায়, হৃদয় বৃত্তির পরিব্যাপ্ততর অনুভবে অনুভূত হয়েছে ঈশ্বরপ্রেম, মানব প্রেম– যা শিল্প, ভাস্কর্য ,সাহিত্য ,সঙ্গীত –-মানুষের সকল কারু ও কলা সৃষ্টির উৎস এবং তার অব্যাহত ক্রমোন্নতির অনুপ্রেরণা।
এটুকুই ভুমিকাস্বরূপ বলা। আমার লক্ষ্য পাখি। সুন্দর এই জগৎসংসারের সুন্দরতম এই প্রাণীটি রঙে- ঢং-য়ে, আকারে-প্রকারে, স্বভাব -বৈশিষ্ঠে, কণ্ঠমাধুর্যে বিস্ময়করভাবে বৈচিত্রময়। শিল্পকলায়,সাহিত্যে তার স্থান সবার উপরে। বিশ্বসাহিত্যের পরিসর তো বিশ্বময় ; আমার স্বল্প দৃষ্টি বাঁধা পড়েছে গুটিকয়েক কবিতায়।
1.To a Skylark,
by Percy Byssy Shelley.
………………………………………………
………………………………………………
“In the golden lightning
Of the sunken sun,
O’ver which clouds are bright’ning,
Thou dost float and run;
Like an unbodied joy whose race is just begun…”
2. Ode To a Nightingale,
by John Keats.
…………………………………………………
………………………………………………….
Away! Away! For I will fly to thee
Not charioted by Bacchus and his pards,
But on the viewless wings of Poesy,...”
৩।বলাকা,
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
……………………………
…………………………….
মনে হল , এ পাখার বাণী
দিল আনি
শুধু পলকের তরে
পুলকিত নিশ্চলের অন্তরে অন্তরে
বেগের আবেগ ।
পর্বত চাহিল হতে বৈশাখের নিরুদ্দেশ মেঘ ;
তরুশ্রেণী চাহে পাখা মেলি
মাটির বন্ধন ফেলি
ওই শব্দ রেখা ধরে চকিতে হইতে দিশাহারা ,
আকাশের খুঁজিতে কিনারা।
এ সন্ধ্যার স্বপ্ন বেদনার ঢেউ উঠে জাগি
সুদূরের লাগি,
হে পাখা বিবাগী !
বাজিল ব্যাকুল বাণী নিখিলের প্রাণে —
‘হেথা নয় ,হেথা নয় ,আর কোনখানে !’...
৪। হায় চিল।
জীবনানন্দ দাশ
“হায় চিল, সোনালী ডানার চিল, এই ভিজে মেঘের দূপুরে
তুমি আর কেঁদো নাকো উড়ে-উড়ে ধানসিঁড়ি নদীটির পাশে !”
চিল
নয় ধানসিঁড়ি, আছি অজয়ের পাড়ে।
ছোটোনাগপুরের মালভূমি,
সুদূর দিগন্তরেখা, পাহাড়ের সারি,
তারও পারে ক্ষণিক দাঁড়ায়ে আছে ক্লান্ত সূর্য
দিনান্তের, ঢেলে দিয়ে সব আলো,সব তাপ
ধরিত্রীর বুকে। ঘরে ফেরা কাল।স্তব্ধতায় ঢাকা
দিগ্বিদিক। হাঁটুজল স্রোত ঠেলে, বালিরাশি চর ভেঙে
ক্বচিৎ পথিক কোন করে পারাপার। ভূমি ছেড়ে
ঊর্ধ্বাকাশে দেখি; এ কী ! একটি খন্ড মেঘ,
অস্ত রবির রঙে রাঙা, লালপেড়ে শাড়ি পরা
মেয়ের মতন, তাকে ঘিরে এক ঝাঁক চিল ,
নিস্কম্প ডানায় মেখে সন্ধ্যাস্বর্ণালোক
উড়ে নিরুদ্বেগ ! সাথে কি তাদের আছে অনন্ত সময়?
রাত্রির আঁধার যেন ঘন বরষার অজয়ের বান ,
দুপারে প্লাবন আনে – ডুবে বন,বনস্পতি, পাহাড়ের চূড়া।
ওরে চিল , ফিরে আয়, শূন্যে কোথা রাত্রির আশ্রয় ?
চিলেদের সেই দল, সোনার আঁচল ছেড়ে মেঘবালিকার
ফিরেছে কি ফেরে নাই,আজো জানা হয় নি আমার।
সেদিনের দিনান্তের পর সুদীর্ঘ আয়ুর কাল গেছে বয়ে,
বছরে বছরে, ক্ষয়ে ক্ষয়ে, যেন অজয়ের ক্ষীণ জলরেখা।
আশায় বেঁধেছি বাসা এতকাল এখানেই, এ-মাটির বুকে।
ভাবিনি তো কোনোদিন,ঊর্ধ্বাকাশে চেয়ে একবারও
এ বিপুল বিশ্বনীড় প্রাণের আলয়। খণ্ড দেশ, খন্ড কাল–
শত খন্ডে বিখন্ডিত মানব সংসার, খন্ড খন্ড ভূমি —-
হিংসা, দ্বেষ, লালসার সপ্তম নরক।
ওগো চিল, আজ ভাবি, তোমার সে মুক্ত-পক্ষ
নন্দিত উড়ান বিমূর্ত প্রাণের –- চির ঊর্ধচারী,
অনন্তবিহারী। আত্ম-পর ভেদাভেদ পৃথিবীর বুকে
অকালেই নিয়ে আসে ঘোর অমানিশা ; তাই ,
আকাশকে ভালোবাসা, অসীমের জ্যোতির্ময় আলো
ধুয়ে দেয় , মুছে ফেলে বর্ণ-গ্লানির যত কালো।
সেই সে চিলের দল, সন্ধ্যারাগে ঝলমল সোনালি ডানার
থাকুক মেঘের সাথে একাত্ম বিলীন, না আসুক আর
ধান সিড়িটির তীরে, গেছে বুঝি দূরে, আরো দূরে,
ওই সাঁঝবাতি – সায়াহ্নের তারা, আরতি করে যে নিত্য
মর্ত্য প্রাণের – ডাক দিয়ে নিয়ে গেছে অনন্তের ঘরে |
হায় চিল, অনন্তের যাত্রী তুমি, তুমি প্রাণ নিখিল বিশ্বের
দৃশ্যের বন্ধন মুক্ত তুমি সত্বা চির অদৃশ্যের |
দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়
17/12/’21
ব্যাঙ্গালোর |
অসাধারণ লাগলো আমার দাদা। আমার শুভেচ্ছা আর ভালোবাসা এবং সশ্রদ্ধ প্রনাম রইল।।
উত্তরমুছুন