বুধবার, ৩ মে, ২০২৩

বৈশাখী পূর্ণিমা

বৈশাখী পূর্ণিমা

(পরিবর্ধিত ও পরিমার্জিত)


বিষণ্ণ সায়াহ্ন বেলা, ক্ষীণ জলধারা অজয়ের।
পাড়ে আছি বসে। রৌদ্র-দহন-দগ্ধ পাথরের টিলা,
আধ-ডোবা পানসির ভাঙা হালে দিনান্তের বক,
দেখি ওই হোথা, বালির চড়ায় শিখা-মরা চিতাগ্নির
জ্বলন্ত আঙার ! 
 তৃষাতুর ধরিত্রীর জ্বরাতুর শ্বাস—
বইতে পারেনা আর শোকাতুর বৈশাখী বাতাস।

ওপারে সন্ধ্যা আসে বিলম্বিৎ লয়ে।
এপারে বহুদূর পশ্চিমের দিগন্তরেখায়,
এ-নদের উৎসমুখে পাহাড় চূড়ায়,
অস্তগামী দিবাকর, রক্তনেত্র রক্তাম্বর,
এখনো আসীন, যেন এক তন্ত্রসিদ্ধ তাপস ব্রাহ্মণ ! 
প্রাণহীন বিপন্নতা ছেয়ে আছে জগৎ-জীবন।

অকস্মাৎ উদ্ভাসিত পূবের আকাশ
গেরুয়া বসন, স্মিতহাস্য দিব্যদ্যুতি, প্রসন্ন আনন,
মূর্তি তাঁর দৈব করুণার,
দৃষ্টি তাঁর ক্ষমা, শান্তি, শান্ত-সান্ত্বনার।
প্রবল নৈরাশ্য মাঝে প্রচণ্ড আশ্বাস—
মরণ আঁধার মুখে আলো পরিহাস।

আমি স্বপ্নাহত—
আজ কি আবার সমাগত—
সেই পুণ্য তিথি, সেই জন্মব্রত,
লুম্বিনী কানন, বিশ্বপ্লাবী জ্যোৎস্নার প্লাবন,
হিমাদ্রী-শীতল মৃদু সমীরণ— পুষ্পগন্ধে ভরা। 
মায়াদেবী— গর্ভযন্ত্রনা-ভাঙা আনন্দের আসীম ক্রন্দন?

 

“ যদা যদাং হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারতঃ।
অভ্যুত্থানম্‌ ধর্মস্য তদাত্মানম্‌ সৃজাম্মহম্‌।।“

  মন্দ্রিত আকাশবাণী, অবতীর্ণ দেব তথাগত ! 

এলো নবযুগ, পশুতে-মানুষে-মেশা যে চেতনা
ছিল বিশ্বময়, হবে তার ক্ষয়,
হবে হবে জয় মানব-আত্মার।
দুঃখ-দীর্ণ, জরা-জীর্ণ, মৃত্যু-বিদ্ধ জীবনে কি 
দেখা দিবে সত্যের আলোক।   

বিলয়ের হাত ধরে সৃষ্টি আসে,
স্থিতি হাসে ক্ষণপ্রভা বিদ্রুপের হাসি,
জয় লয় থাকে পাশাপাশি।
জিঘাংসার আস্ফালন লীন হয় মহাসর্বনাশে।
রাজার প্রাসাদ হতে ভিখারীর ঘর—
নিশ্চিত প্রলয় ঝড়ে কাঁপে থর থর।

ঐশ্বর্য-সম্পদ-বিত্ত, জীবন সংসার
যুদ্ধ ভেরি, জয়ডঙ্কা, রক্তভেজা শস্ত্র-তরবারি,
বিজয়ীর অট্টহাসি, পরাভূতের আর্ত হাহাকার—
ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ সমুদ্রের ফেনপুঞ্জ— তরঙ্গ লহরি
নিমেষে বিলীন হয় মহাস্তব্ধতায়।

নরমেধ সঙ্কল্পের শেষে—
অশ্বমেধ, হস্তিমেধ, রাজসূয় মহাযজ্ঞ,
অহংকার, অসূয়ার অভ্রভেদী শিখা—
তৃষ্ণাবিদ্ধ মরুদেশে মিথ্যা মরীচিকা।

চণ্ডালিকা হতে রাজরাণী,
স্বরাট সম্রাট হতে পথের ভিখারী,
পথভ্রষ্ট পথিকের কামনার পরম প্রসাদ—
মহাসত্য, মহাবাণীঃ-- "মৃত্যু নিত্য-শুদ্ধ, নয় সে প্রমাদ।

‘সব্বম দুঃখম’— শোন, জগতের প্রাণ,
দুঃখ আছে, কারণও আছে, আছে আছে
নিবৃত্তি উপায়— সে সাধন তোমাতেই আছে বিদ্যমান।
মা মা হিংসি— রক্ত নয়, আত্মত্যাগ সুধা কর পান।“

 

“বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি  
সঙ্ঘং শরণং গচ্ছামি
ধম্মং শরণং গচ্ছামি”

 

বিদিশা, শ্রাবস্তী, উজ্জয়িনী, দশার্ন প্রদেশ -- 
জনপদ অসংখ্য অশেষ, উথাল পাথাল।
শ্রমণ শ্রমণা কত ভিক্ষু-ভিক্ষুণী দলে দলে
অমিতাভ, তোমার চরণ প্রান্তে নিয়েছিল ঠাঁই। 
গেয়েছিল গান মার্গ অষ্টাঙ্গিক -- 
সৎ বাক্য-চেষ্টা-শ্রম-সংকল্প-দৃষ্টি-জীবিকা-শ্রবন 
আর মহাসমাধির মাঝে নিষ্কাম বিলয় 
যা কিছু নশ্বর, যা কিছু ঐহিক। 
পারত্রিক কিছু নাই। শূন্য হতে জাগে সৃষ্টি, 
শূন্যেতে বিলীন। বিপুল বিরাট 'নাস্তি' 
অস্তিত্বের শেষের আশ্রয়।

এতক্ষণ স্বপ্নাবিষ্ট মন ছিল সেথা, যেথায় বৈশালী
রাজগৃহ, সারনাথ, মগধ, কোশল। সাথে ছিল
বিম্বিসার, সারিপুত্ত, অশোক, মল্লিকা, আম্রপালি।
ছিল বুদ্ধ গয়ায় বোধিবৃক্ষ ছায়ে, কৌশাম্বির অমর কাননে,
যমুনার তীর হয়ে জাহ্নবীর ঘাটে ঘাটে, 
সিন্ধু হতে সিন্ধুনদ পারে, 
কৃষ্ণা, কাবেরী, নর্মদার তরঙ্গ ধারায়, 
দিক হতে দিগন্তরে, দেশে দেশান্তরে, 
মায়া-মোহ-বিনির্মুক্ত চৈতন্যের জ্যোতিঃপারাবারে। 

ঘোর কাটে, দেখি আচম্বিতে
মধ্য গগনে চন্দ্রদেব—
জগৎ সংসার ভাসে আলোর জোয়ারে।
আমি একা বসে আছি অজয়ের পাড়ে—
নিশুতি রাতের শান্তি এপারে ওপারে। 

পেরিয়ে এলাম যেন হাজার বছর,
পেরিয়ে এলাম কত জন্ম-জন্মান্তর,

আজও আছেন চেয়ে সে মহা শ্রমণ—
অক্ষয়, অব্যয় সত্য বুদ্ধ-নিরঞ্জন।

অহো মৃত্যুঞ্জয়, মন্ত্র করো দান—
আত্মত্যাগ আত্মাহূতি আত্মমুক্তি—  
ক্ষমা, ক্ষেম, মহামোক্ষ—মহাপরিনির্বাণ। 
ঝরুক শীতল জ্যোৎস্না জীবনের চিতাভস্ম 'পরে, 
কোলাহল স্তব্ধ হোক্ প্রশান্তির মহাপারাবারে।।


দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় 
০১-০৫-২০২৬




৫টি মন্তব্য:

Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...