দুই
স্বামী রঙ্গনাথানন্দ তার 'উপনিষদের সন্দেশ' গ্রন্থটির ভূমিকায় ভারতীয়দের সনাতন ধর্ম, যা হিন্দুধর্ম (Hinduism) নামেই বিশ্বসমাজে সুপরিচিতি, তার ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে প্রাচ্যদেশ ও পাশ্চাত্যদেশের ইতিহাসবিদ ও ধর্মতাত্ত্বিক পণ্ডিতগণের গবেষণাপ্রসূত মতামতগুলিও উদ্ধৃত করেছেন। সঙ্গে সঙ্গে সংস্কৃতি ও কলা জগতের সাধকদের অধ্যাত্মচেতনার সাথে ধর্মধারণার একত্বের মীমাংসা উপস্থাপিত করেছেন।
সাহিত্য ও সংস্কৃতি জগতের জোতিষ্ক রোমা রোঁলা, আমাদের রবীন্দ্রনাথের পর পরই যিনি সাহিত্য নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন ১৯১৫ খ্রীষ্টাব্দে (প্রথম যুদ্ধের আরম্ভকালে, ১৯১৪ খ্রীষ্টাব্দে নোবেল পুরস্কার প্রদান স্থগিত ছিল), তিনি শ্রীরামকৃষ্ণ ও বিবেকানন্দের জীবনী (The Life of Ramkrishna Paramhansa and Life of Vivekananda and The Universal Gospel) রচনা করেন। শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনী রচনাটিতে তিনি লিখছেন,
"(---- After attaining supreme consciousness) the rest of his life had been spent in the serine fullness of his cosmic Joy, whose revelation Beethoven and Shiller have sung for the West. But he has realised it more fully than our tragic heroes. Joy appeared to Beethoven only as a gleam of the blue through the chaos of conflicting clouds, while the Paramhansa --- the Indian Swan --- rested his great white wings on the sapphire lake of eternity beyond the vail of tumultuous days."
পরম চৈতন্য লাভ বা ব্রহ্মত্ব লাভের পর বাকী জীবন তিনি (শ্রীরামকৃষ্ণ) প্রশান্তিময় স্বর্গীয় আনন্দে অতিবাহিত করেন। এই প্রকার স্বর্গীয় আনন্দের প্রতিভাস বিটোভেন ও শ্রিলার তাঁদের সংগীত মূর্ছনায় অভিব্যক্ত করে দিয়েছিলেন পাশ্চাত্যদেশের মর্মমূলে। কিন্তু ভারতের পরমহংসদেব সেই চিদানন্দ পরিপূর্ণভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। তেমন আনন্দোপলব্ধি বিটোভেনের হৃদয়ে সমাগত হয়েছিল ঠিকই কিন্তু পূর্ণরূপে নয়, এসেছিল ঝড়ে কম্পমান মেঘখণ্ডের ফাটল দিয়ে, যেমন নীল আকাশের শীর্ণ আলোকরেখা আসে, তেমনি ভাবে --- যখন পরমহংসদেব, ভারতের রাজহংস, তাঁর শ্বেতশুভ্র পাখার উড়ান থামিয়ে, দ্বন্দ্ব- তাড়িত ক্ষণজীবনের মোহাবরণ ছিন্ন করে, নীলকান্তমণির মত স্বচ্ছ গভীর, আদি-অন্তহীন ব্রহ্মানন্দময় আকাশ-সরোবরে বিশ্রামরত। (ভাবানুবাদ মৎকৃত)
রোমা রোঁলার এই অননুকরণীয় বর্ণনা পাশ্চাত্যদেশের ঋষিপ্রতীম বুধ-সম্প্রদায়ের নিকট সহজে বোধগম্য হলেও আমাদের মত সাধারণ মানুষের পক্ষে দুর্বোধ্য মনে হয়। এখানে বিটোভেন (Ludwig van Beethoven, 1770-1827), ও Schiller (Friedrich Shriller 1759- 1805), এই দুই বিশ্ববন্দিত সুরকার ও গীতিকার তথা সাহিত্যিক ও দার্শনিকের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু তাদের সাধনার সঙ্গে শ্রীরামকৃষ্ণের সাধনার তুলনা এলো কেন ? না, পরমহংসদেবের সাধন ও সিদ্ধির অমৃতস্বাদী ঐশ্বর্যের (ঈশ্বরপ্রদত্ত অমর্ত্য সম্পদ) কণামাত্র প্রসাদ পাশ্চাত্যবাসীকে বিতরণ করবার জন্য তিনি এই উপমার মাধ্যম গ্রহণ করেছেন। জীবনীকার বলতে চেয়েছেন মহান জার্মান দার্শনিক, কবি, নাট্যকার ও গীতীকার, শীলার রচিত গীত (lyrics) এবং বিশ্ববিশ্রুত সঙ্গীতকার বিটোভেন-সৃষ্ট সঙ্গীতের ভাব ও মূর্ছনায় মানুষের ত্রিতাপ- দুঃখে-জর্জরিত জীবাত্মা যে সামান্য পরমার্থের, পরমাত্মার সন্ধান পান, পরমহংসদেবের সাধনার পথে তা পরিপূর্ণভাবে লভ্য। এর অর্থ এই যে মানুষের মনুষত্বের সাধনার পথ বিভিন্ন, কিন্তু তার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য একই --- অখণ্ড চৈতন্যে সমাহিত হওয়া। তা হলেই এই যে জাগতিক দ্বন্দ্ব, সংঘাত ; দ্বেষ, বিদ্বেষ, হিংসা, যুদ্ধ --- সে সবের অকিঞ্চিৎকরতা, তুচ্ছতা, নিরর্থকতা মানুষের কাছে প্রতিপন্ন হবে, প্রতীয়মান হবে অমর্ত্য আনন্দের আলো। আপন চৈতন্যের আলোয় মানুষই জ্যোতির্ময় হয়ে উঠবে, আপনার অন্তরস্থিত দেবতাকে লাভ করে মানুষ দেবতায় রূপান্তরিত হবে ; সকল মানুষের মধ্যে, সকল জীবের মধ্যে আপনার দেবতার প্রতিরূপ অবলোকন করবে। "সমস্ত জীবে শিব জ্ঞান"হবে ; সত্য হয়ে উঠবে , "জীবে প্রেম করে যেই জন / সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।"
শ্রীরামকৃষ্ণের সাধনপন্থায় ঈশ্বরলাভ বা ঈশ্বরত্বলাভ এবং স্বামী বিবেকানন্দের কর্মমার্গের মধ্য দিয়ে ঈশ্বরলাভ বা ঐশ্বরিক শক্তিলাভের কথাই বার বার বলেছেন স্বামী রঙ্গনাথানন্দজী।
সাধনপন্থা বহুধা। সকল পথই একই লক্ষ্যে পৌঁছায়। সঙ্গীত, সাহিত্য, শিল্পকলার সৃজনে যে একনিষ্ঠতা, তন্ময়তা, তাও তো সাধনা। বাল্মীকি, ব্যাস, হোমার, দান্তে, সেক্সপিয়ের, রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ; লিওর্নাদো দ্য ভিঞ্চি, মাইকেল এঞ্জেলো, রাফায়েল, পিকাশো, রামকিঙ্কর প্রভৃতি শিল্পী ভাস্করদের চিত্র ও ভাস্কর্যের সৃজনও সাধনা (কোটিতে গুটি মাত্র উদাহরণ)। সন্তানপ্রসূতা জননী যেমন অপার বেদনার মধ্য দিয়ে সন্তানসৃষ্টির পরমানন্দ লাভ করেন, শিল্প-সাহিত্য-ভাস্কর্য- সঙ্গীতস্রষ্টাগণও অনুরূপভাবেই তাঁদের কর্মযোগ- সাধনপথের "অসীম বেদন, অসীম রোদনের" অন্তিমে তেমনই সৃষ্টির 'আনন্দকে' বরণ করেন।
সঙ্গীতস্রষ্টা বিটোভেনের সিম্ফনির (অপেরা) কথা উঠলেই তাঁর সিম্ফোনি ৫ ও সিম্ফোনি ৯ -এর সুর- ব্যঞ্জনায় অতিন্দ্রীয় জগতের ভাব অনুভূত হয়, যে ভাব মানুষকে অনন্তের সন্ধান দেয় ; হীনতা দীনতা আত্মসর্বস্বতা ও আত্মপরতার গণ্ডি থেকে মুক্ত করে মানব চেতনাকে বিশ্বচেতনার নিখিল ভূবনে আমন্ত্রণ জানায়।
এই সুরের সাধনপথের ইঙ্গিত আমরা বুঝতে পারি, উপলব্ধি করতে পারি কেননা আমাদের মহাকবি, (যিনি আবার ঐ সুমহান সাহিত্যিক ও দার্শনিক রোমা রোঁলার অভিন্নহৃদয় বন্ধু) তিনি তাঁর সুর ও বাণীর অচ্ছেদ্য বন্ধনের কথা বলার পরও দিনের শেষে সুরের সাধন-ধর্মের আবেদনের শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করে বলছেনঃ
"আমার সুরগুলি পায় চরণ, আমি পাইনে তোমারে..."
বলছেনঃ
"তোমার সুর শুনায়ে যে ঘুম ভাঙাও, সে ঘুম আমার রমনীয়..."
সুরের সাধনাও যে পরমাত্মার সাধনার পথ --- সেটি যে মানুষের সত্তাকে অতিমানবীয় সত্তার আলো দেখাতে পারে, সেকথা প্রতিপন্ন করার জন্যেই রোঁলা বিটোভেনের সিম্ফনির, বিশেষ করে পঞ্চম ও নবম সিম্ফনির উল্লেখ করেছেন। বহুবিধ বিদ্যার বিশারদ (polymath) এই প্রাতঃস্মরণীয় পণ্ডিত রোঁলা ছিলেন একজন সমকালের বিশ্বশ্রেষ্ঠ সঙ্গীততত্ত্ববিদও (musicologist) এবং তাঁর নোবেল পুরস্কার বিজয়ী গ্রন্থ 'Jean Christophe' -র প্রধান চরিত্র Jean Christophe Krafft -এর জীবন সংগ্রাম সুরসাধক Ludwig Van Beethoven-এর জীবন সংগ্রাম ও জীবন সাধনারই কল্পচিত্র।
এবার স্বামী বিবেকানন্দ প্রসঙ্গে রোমা রোঁলার ভাষ্যঃ
'Life of Vivekananda and the Universal Gospels' গ্রন্থটির মুখবন্ধে রোমা রোঁলা লিখছেন -----
"Battle and Life for him (Swamiji) were synonyms. And his days were numbered. Sixteen years passed between Ramkrishna's death and that of his great disciple. ...... years of conflagration. He was less than forty years of age when the athlete lay stretched upon the pyre. ..... But the flame of the pyre is still alight today. From his ashes like those of the Phoenix of old has sprung the conscience of India ----the magic bird ---- faith in her unity and in the great message, brooded over from Vedic times by the dreaming spirit of his race ---- the Message for which it must render account to the rest of the mankind."
সংগ্রাম ও জীবন তাঁর কাছে ছিল সমার্থক। কটা দিনই বা তিনি বেঁচে ছিলেন। তাঁর দেবতা শ্রীরামকৃষ্ণের মহাপ্রয়াণ ও তাঁর পরলোক গমনের মাঝখানের সময়ের মাত্র আঠারোটি বছর। জীবন চল্লিশ বছরের হয়নি তখনো যখন তার সুঠাম সুন্দর মল্লবীর-সদৃশ দেহ চিতামঞ্চে শায়িত হোল --- নিথর। কিন্তু সেই চিতাগ্নি শিখা আজও বহ্নিমান।
তার চিতার সেই ভষ্মরাশি থেকে, রূপকথার বিহঙ্গের মত ভারতভূমির সুদূর অতীতে-সাধিত চৈতন্যসত্তা জাগ্রত হয়েছে। এই সেই ভারতভূমি --- মায়ারূপী বিহঙ্গম ----যিনি বিশ্বাস রাখেন বিশ্বৈকানুভূতির উপর, যিনি বিশ্বাস রাখেন বেদ-বেদান্ত উচ্চারিত মহা বাণীর উপর---- এবং সেই বৈদিক সময়কাল থেকে যিনি বিশ্বাস রেখে চলেছেন এক মহান জাতির অতিলৌকিক আত্মশক্তির উপর। এই যে বাণী, ভারতাত্মার বাণী প্রচারিত করবার দায় তাঁর। (বিবেকানন্দের চিতাভস্ম থেকে উত্থিত শাশ্বত , সনাতন ভারতাত্মা, যাকে পাখীরূপে কল্পনা করা হয়েছে।
'blooded over' শব্দটিতে 'গভীর মনোনিবেশ সহকারে অতীতের স্মৃতি-রোমন্থন বোঝায়'।)
(ভাবানুবাদ মৎকৃত)
পুজ্যপাদ স্বামী রঙ্গনাথানন্দজীর উপনিষদের সন্দেশ (The Message of the Upanishads) গ্রন্থটি নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে রোমা রোঁলার রচিত দুটি জীবনী গ্রন্থের বিষয়বস্তুর অবতারণা করা হোল কেন ?
উত্তরে অনেক কথা বলার আছে যেগুলি আমাদের এই আলোচনাতে, যেটি প্রবন্ধ বা কথকথারূপে লিপিবদ্ধ হয়ে চলেছে তার পর্বে পর্বে স্বাভাবিকভাবেই এসে পড়বে, কেননা গ্রন্থকার উপনিষদগুলির, বিশেষত কঠ, কেন, বৃহদারণ্যক --- এই সকল প্রাচীনতম উপনিষদের অভ্যন্তরে প্রবেশ করবার আগে এই মানবজগতসংসারের অপরাপর ধর্মধারণা ও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মণীষীদের চিন্তার উপর ভারতবর্ষের বৈদান্তিক ধর্মবোধের প্রভাব বিষয়ে একটি উচ্চকোটির গবেষণামূলক বক্তব্য রেখেছেন গ্রন্থটির ভূমিকায়। কিন্তু যেহেতু ভূমিকা বা মুখবন্ধ তাই তাঁর বক্তব্য ইঙ্গিতে বা সূত্র আকারে লিপিবদ্ধ। আমরা সেই সূত্রগুলির ভাষ্য ও ব্যাখ্যা রচনা করছি মাত্র।
খুব ভালো
উত্তরমুছুনউঁচু মার্গের লেখা,,,,, সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে লেখনীকে নির্দেশ দিলে সুবিধা হয়।।তাপস নায়েক সোনামুখী বাজার
উত্তরমুছুন