শুক্রবার, ২১ মার্চ, ২০২৫

স্বামী রঙ্গনাথানন্দ ও বর্তমান ভারতবর্ষে তাঁর ধর্মধারণার অপরিহার্যতা 


                  এক 


পরম পূজনীয় স্বামী রঙ্গনাথানন্দ (১৯০৮ - ২০০৫), রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের বহু প্রকার দায়িত্ব পালন করার পর, অবশেষে ঐ মিশনের ত্রয়োদশ অধ্যক্ষরূপে তার কর্মজীবন সমাপ্ত করেন। এই কর্মসাধনের সঙ্গে সঙ্গে তার সাহিত্য সৃজনের সাধনাও ছিল অপ্রতিহত। ভারতীয়দের শাশ্বতী জীবনাচরণের বাহ্যিকতার অভ্যন্তরে অন্তঃসলিলা ফল্গুধারার মত অতি পবিত্র আধ্যাত্মিক জীবনবোধও সমান ছন্দে অনুশীলীত হয়ে চলেছে সুদূর অতীতের সেই তপোবন-সভ্যতার ব্রাহ্মমুহূর্তের সময়কাল থেকেই। জীবনবোধের এরূপ অনুশীলনের দলিল আমাদের শ্রুতি বা বেদ, ব্রাহ্মণ, উপনিষদ ; শ্রীমৎ ভাগবত, রামায়ণ, মহাভারত সহ বিভিন্ন পুরাণগুলি --- যে সকল সাধারণের নিকট দুরূহ, দুর্গম ও কখনো কখনো দুর্বোধ্য, সে সব মহাগ্রন্থরাজি যিনি প্রাঞ্জল ভাষায়, অনুশীলনীয় ও আচরণীয় পন্থায় আমাদের নিকটে উপস্থিত করেছেন, তিনি স্বামী বিবেকানন্দ, স্বামী ব্রহ্মানন্দ আদির মহান উত্তরাধিকারী ও উত্তরসূরী স্বামী রঙ্গনাথানন্দ। তিনি তাঁর জীবদ্দশায়, প্রাচ্যদেশের এই জীবনসাধনার ঐশ্বর্যসমন্বিত বাণী বাগ্মিতা ও লেখনীর মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছেন বিশ্বময়। তার গ্রন্থসমূহের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি,  যেমন--- 

Eternal value for changing society, Messages of Upanishads, A pilgrim looks at the World,  Practical Vedanta and the science of values, Essence of Indian culture, Swami vivekananda and Human Excellence science and religion, Introduction to the study of Gita, Messages of the Brihadaranyak Upanishad, The approach to truth in Vedanta, The Indian Vision of God as Mother. 

 
এমন কুড়িটি স্বল্প-বৃহৎ গ্রন্থের মধ্যে তিনি শুধুমাত্র ভারতীয় ধর্মধারণার ব্যাখ্যা করেছেন এমন নয়, সে সকল পুস্তকের পাতায় পাতায় আছে বিশ্বের সমস্ত ধর্মধারণার তুলনামুলক আলোচনা (discussions on Comparative Religion).
উপনিষদের  সন্দেশ (The messages of the Upanishads) গ্রন্থ হতে একটি বিশেষ অংশ উদ্ধার করছি এই কারণেই যে তারই মধ্যে আমরা আমাদের আলোচনার বিষয়টিও ওতপ্রোতভাবে দেখতে পাব। 

"ভারত আজ ইতিহাসের একটি সৃজনশীল যুগের দোরগোড়ায় এসে উপস্থিত হয়েছে  ---- বৈদান্তিক ভাব ও রামকৃষ্ণ -বিবেকানন্দের তেজের অভূতপূর্ব নূতন অভিব্যক্তিতে নবজাগরণের সূচনা। শ্রীরামকৃষ্ণের প্রশস্তিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের জন্মশতবার্ষিকী  অনুষ্ঠানে ১৯৩৭ খ্রীষ্টাব্দে তার অপূর্ব এই কবিতাটি পাঠ করেছিলেন ঃ 

  ''বহু সাধকের বহু সাধনার ধারা
  ধেয়ানে তোমার মিলিত হয়েছে তারা ;
তোমার জীবনে অসীমের লীলাপথে 
        নূতন তীর্থ রূপ নিল এ জগতে ;
দেশবিদেশের প্রণাম আনিল টানি,
       সেথায় আমার প্রণতি দিলাম আনি ----''

যাঁর সম্মন্ধে  কবি কাজী নজরুল ইসলাম গেয়েছেন ঃ
'মন্দিরে মসজিদে গীর্জায়
পূজিলে ব্রহ্মে সম শ্রদ্ধায়  ;
তব নাম মাখা প্রেম নিকেতনে
ভরিয়াছে তাই ত্রিসংসারে -----'

এবং স্বামী বিবেকানন্দ সম্মন্ধে ঋষিকবি রবীন্দ্রনাথের সেই অমোঘ উক্তিঃ

'আধুনিক কালে ভারতবর্ষে বিবেকানন্দই মহৎ বাণী প্রচার করেছেন, যেটি কোন আচারগত নয়। তিনি দেশের সকলকে ডেকে বলেছিলেন, তোমাদের সকলকলের মধ্যেই ব্রহ্মের শক্তি ; দরিদ্রের মধ্যে দেবতা তোমাদের সেবা চান। এই কথাটি যুবকদের চিত্তকে সমগ্রভাবে জাগিয়েছে। তাই এই বাণীর ফল --- দেশের সেবা বিচিত্রভাবে বিচিত্রত্যাগে ফলেছে। তাঁর বাণী মানুষকে যখনই সম্মান দিয়েছে, তখনই মানুষকে শক্তি দিয়েছে।' 


বিবেকানন্দ সম্মন্ধে কাজি নজরুল ইসলাম গাইলেনঃ 

 ''নব ভারতে আনিলে তুমি নব বেদ,
মুছে দিলে জাতি ধর্মের ভেদ  ;
জীবে ঈশ্বরে অভেদ আত্মা জানাইলে উচ্চারি----''
রোমা রোঁলা শ্রীরামকৃষ্ণ ও স্বামী বিবেকানন্দকে পিটার সেরাফিকাস্ ও জোভ দি থাণ্ডারার আখ্যা দেন, যাঁদের মঙ্গলময় প্রভাব এখনও সব ধর্মের আধ্যাত্মিক অনুসন্ধিৎসুরা অনুভব করছেন।" 


স্বামী রঙ্গনাথানন্দজী তার বিপুল রচনাসম্ভারে নিজের উপর দেবত্ব আরোপ করে নিজস্ব কোন মত প্রকাশ করেন নি, কোন নূতন পথের পথরেখাও অঙ্কন করেন নি। তিনি আমাদের এই সুপ্রাচীন ভারতভূমির চিরায়ত অধ্যাত্মচিন্তনের আলোচনার সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর মূল ধর্মাদর্শের শ্রুতি ও স্মৃতি-র গভীরে ডুব দিয়েছেন, বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ধর্মবীরদের, সাধকদের বাণীগুলি চয়ন ও সঞ্চয়ন করেছেন ; বেদ, উপনিষদ, পুরাণ কাহিনীর সারমর্ম এবং একই সাথে কোরাণ, বাইবেল, আবেস্তা প্রভৃতি ধর্মগ্রন্থের অন্তর্নিহিত ভাব ও ভাবনার মূলে প্রবেশ করে শ্রীরামকৃষ্ণের 'যত মত তত পথ' -- এই বাণীর সত্যকেই প্রতিষ্ঠা করেছেন। 


প্রতিটি ধর্মের শ্রুতি অংশে সর্বজনীন ধর্মবোধের কোন বিরোধ নেই ; বিরোধ স্মৃতি অংশে। এখানে শ্রুতি ও স্মৃতি-র বিষয়টি প্রাঞ্জল  হওয়া বাঞ্ছনীয়।
'শ্রুতি' শব্দটির বহু প্রকার ব্যাখ্যা আছে। তবে সাধারণভাবে শ্রুতি বলতে আমরা বুঝি বেদ। প্রাচীন ভারতীয় অধ্যাত্মচিন্তনের ধারা লিখিত আকারে থাকেনি। তা শ্রবণের মধ্য দিয়ে গুরু পরম্পরায় প্রচারিত ও প্রচলিত ছিল। সেই যে গুরু বা ঋষিদের মুখনিঃসৃত বাণী (messages) তাই শ্রুতি। এমনকি পরবর্তী সময়ে সেই বাণীগুলি যখন লিখিত আকারেও প্রকাশিত হোল তখনোও তা শ্রুতি নামেই অবিধেয় ও সম্বোধিত হোত এবং হয়েই চলেছে আজও। ভারতীয় বৈদান্তিকগণ মনে করেন শ্রুতি অপৌরষেয় ; অর্থাৎ দৈব-প্রেরিত, মানুষের দ্বারা রচিত বা সৃষ্ট নয়। 

অপরদিকে 'স্মৃতি', যা বেদেরই শাখা কিন্তু তা ধর্মাচরণের, বা আরও সহজ সরল ভাবে বলতে গেলে,  তা বেদোক্ত ধর্ম পালনের রীতি নীতি ও সংস্কার বোঝায়। যেমন স্মার্ত মনুর স্মৃতিশাস্ত্র (মনুস্মৃতি)। স্মার্ত রঘুনন্দন ভট্টাচার্য, স্মার্ত রাঘবানন্দ প্রভৃতির স্মৃতিগ্রন্থ। এই সকল স্মৃতিগ্রন্থে লিখিত বিধানগুলির আচরণ যদি পূর্বকালের মতই থাকে তবে তা সমাজের ক্রমবিবর্তনের পথে যে ক্রমোন্নতি সেই প্রবনতাকে রুদ্ধ করে রাখে।
অপরদিকে 'শ্রুতি' বা ঋষিমুখনিঃসৃত বা যুগশ্রেষ্ঠ পুরুষ (যাদের অবতার বা ঈশ্বরপুত্র বা ঈশ্বরের দূত বলা হয়ে থাকে) - দের উচ্চারিত বাণী প্রশ্নাতীত সত্য রূপে গ্রহনীয়।‌

স্বামী রঙ্গনাথানন্দজী এখানে শুধুমাত্র ভারতীয় সভ্যতার বেদোক্ত বাণী (শ্রুতি), এবং বেদোক্ত ধর্মাচরণের রীতি নীতি (স্মৃতি)-র কথাই বলেন নি, তিনি সমস্ত ধর্মের, যেমন পারসিক, ইহুদী, খ্রীষ্টান, ইসলাম -- ধর্মের স্মৃতি অংশটিকে যুগোপযুগী করার কথা বলেছেন।
তিনি খ্রীষ্ট ধর্মের আলোচনা করতে গিয়ে বলছেন, "পাশ্চাত্যে খ্রীষ্টধর্মকে এখন অভূতপূর্ব বিক্ষোভ ও প্রশ্ন বাণের সম্মুখীন হতে হচ্ছে।" তিনি বলতে চাইছেন মধ্যযুগে মূল (গোঁড়া ক্যাথলিক) খ্রীষ্টান ধর্মের স্মার্তগণ যে সকল আচরণবিধি পালন করতেন, বা পালন করতে‌ বাধ্য করাতেন এবং অ-খ্রীষ্টান সম্প্রদায়কে স্বধর্মে নিয়ে আসার জন্য যে সকল পন্থা অবলম্বন করতেন সেগুলির অধিকাংশই ছিল নিষ্ঠুর ও অমানবিক। 

কিন্তু ঈশার যে মূল বাণী (sermons), সেগুলির মধ্যে তো কোথাও নৃশংসতা ও অমানবিকতার লেশমাত্র নেই।
শুধু খ্রীষ্টান ধর্ম নয়, পারসিক, ইহুদী, ইসলাম--- এমনকি আমাদের 'হিন্দু' ধর্মের আলোচনা প্রসঙ্গেও তিনি এই কথা বলেছেন। আর একথা তো সত্য যে ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুত্বের স্বঘোষিত ধর্মগুরু এবং একশ্রেণীর রক্ষণশীল পুরোহিত সম্প্রদায় 'হিন্দু'ধর্মের নামে যে সমস্ত আচার- সংস্কারসর্বস্ব, বিবেকবর্জিত নিষ্ঠুর বিধিবিধান পালন করতে সমাজকে বাধ্য করেছিল তার পরিণামেই তো আমাদের দেশের অব্রাহ্মণ, দলিত, ব্রাত্য ও প্রান্তিক শ্রেণীর মানুষ দলে দলে ইসলামে ধর্মান্তরিত হয়েছে, খ্রীষ্টানধর্ম ও বৌদ্ধ ধর্মে আশ্রয় নিয়েছে। (বর্তমানেও আবার সেই উচ্চবর্ণীয় ব্রাহ্মণ্যবাদীদের পুনরভ্যুত্থানের ইঙ্গিত দৃশ্যমানভাবে প্রকট)।
জাতিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাকে হিন্দুর বৈদান্তিক ধর্মবোধ কখনো স্বীকার করে নি। এই সিদ্ধান্তে উপনিত হতে গিয়ে তিনি স্বামী বিবেকানন্দের সে ১৮৯৩ খ্রীষ্টাব্দে শিকাগো ধর্মসভায় প্রদত্ত ভাষণের কিয়দংশ উদ্ধার করেছেন, --- "একই আলোক ভিন্ন ভিন্ন রঙের কাচের মধ্যে দিয়ে আসছে। সকলের উপযোগী হবে বলে সামান্য বিভিন্নতা প্রয়োজন। কিন্তু সব কিছুর অন্তঃস্তলে সেই এক সত্যই বিরাজমান। শ্রীকৃষ্ণাবতারে ভগবান বলছেনঃ  

'সূত্র যেমন মণিগণের মধ্যে, আমিও সেরূপ সকল ধর্মের মধ্যে অনুস্যূত। যা কিছু অতিশয় পবিত্র ও প্রভাবশালী, মানব জাতির উন্নতিকারক ও পাবনকারী, জানবে সেখানে আমি আছি।'


যদি কখনও একটি সর্বজনীন ধর্মের উদ্ভব হয় তা কখনো কোন দেশে বা কালে সীমাবদ্ধ হবে না ; যে অসীম ভগবানের বিষয় ঐ ধর্ম প্রচার করবে, ঐ ধর্মকে তারই মত অসীম হতে হবে ; সেই ধর্মের সূর্য --- কৃষ্ণভক্ত, খ্রীষ্টভক্ত, সাধু অসাধু---- সলের উপর সমানভাবে নিজ কিরণ বর্ষণ করবে ; সেই ধর্ম ব্রাহ্মণ্যবাদী বা বৌদ্ধ, খ্রীষ্টান বা মুসলমান হবে না, বরং সব ধর্মের সমষ্টিরূপ হবে, অথচ উন্নতির সীমাহীন অবকাশ থাকবে ; নিজ উদারতায় সেই ধর্ম অসংখ্য হাতে সকল নরনারীকে আলিঙ্গন করবে,‌ স্থান দেবে প্রতিটি মানবকে ---পশুতুল্য হীন বর্বর থেকে সেই সব শ্রেষ্ঠ মানব পর্যন্ত --- যাঁরা হৃদয়বত্তায় ও জ্ঞানে প্রায়ই সকল মানব জাতির শীর্ষস্থানে অবস্থান করে' সমাজের মনে বিস্ময় ও  তাঁর মানব প্রকৃতি সম্মন্ধে সংশয় উৎপাদন করেন। সেই ধর্মের নীতিতে পীড়ন বা বিদ্বেষের কোন স্থান থাকবে না ; এতে প্রত্যেক নরনারীর দেবস্বভাব স্বীকৃতি পাবে ; এই ধর্মের সমস্ত শক্তি মনুষ্য জাতিকে দেবস্বভাব উপলব্ধি করতে সহায়তা করবে এবং সেই কাজেই সর্বদা নিযুক্ত থাকবে।"

                 





1 টি মন্তব্য:

Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...