রবিবার, ২৪ মার্চ, ২০২৪

বসন্ত পূর্ণিমা

বাসন্তী পূর্ণিমা 

(শ্রীগৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর জন্মতিথি)



দাঁড়ায়ে রয়েছি আমি অজয়ের পাড়ে। 
মিলালো দিনের আলো পশ্চিম দিগন্তরেখা পারে। 
পূর্বে চেয়ে দেখি সন্ন্যাসীর গৈরিক উত্তরীয় ঢাকা 
বিপুল বিরাট চাঁদ ধীর লয়ে দিগন্ত বলয়ে সমাসীন। 
নির্নিমেষ চেয়ে আছি আত্মমগ্ন স্বপ্নাচ্ছন্নতায় ; 
যেন আছি সুদূর শতাব্দীপারে, এমনি পূর্ণিমা সন্ধ্যা 
মায়ালোক মায়াপুরে। কলরব কোলাহল চতুর্দিকে। 

কে কোথা আছিস ওরে, আয় ছুটে আয় ত্বরা করে 
উঠেছে গৌরাঙ্গচন্দ্র পুন্যতোয়া ভাগীরথী তীরে। 
গয়াধাম তীর্থক্ষেত্র-প্রত্যাগত শ্রীশচীনন্দন সে নিমাই 
যেন আর নাই ! বিষ্ণুপদচিহ্ন বুকে এনেছে সে বয়ে। 
ওমা শচীদেবী, ছিন্ন করে দাও মাগো গৃহের বন্ধন। 
সাধ্বী বিষ্ণুপ্রিয়া, প্রেমময়ী, প্রেমের সাধনমন্ত্র দিয়ে 
দাও গো বিদায়। যাব আমি মহাঅভিসারে, ওই দূরে, 
যেথা হতে বিশ্বপ্লাবী সুরে আসে তাঁর বংশীধ্বনি। 
যেই সুরে মায়াপাশ যায় ছিন্ন হয়ে, জেগে ওঠে 
মহাপ্রেম কামনা-বাসনা-শূন্য নির্মল অন্তরে, 
ডাক তাঁর আসে নিরন্তর -- বৃন্দাবনচন্দ্র সে, 
অখিল-রসামৃত-মূর্তি, ওই দেখ ছেয়ে আছে জগৎ সংসারে। 

কৃষ্ণপ্রেমে ভাবোন্মত্ত, ভাবাবেশে আবিষ্ট নিমাই -- 
"অনুক্ষণ মাধব মাধব" আর্তনাদ ! বিস্মিত বিহ্বল 
পুরবাসী। নদীয়ার প্রাণধন গোরাচাঁদ হয়েছে সন্নাসী। 
অপূর্ব কনককান্তি, মুন্ডিত মস্তক, আজানুলম্বিত বাহু 
সমুত্থিত স্বর্গমুখে, নিরাভরণ বরদেহে গৈরিক বসন, 
নৃত্যের তরঙ্গরঙ্গে স্খলিত সে উত্তরীয় যেন বরমালা। 
শ্রীঅদ্বৈত, নদীয়ার আচার্যশ্রেষ্ঠ, সাক্ষাৎ শিবের অবতার 
দেখেছেন ধ্যানদৃষ্টি দিয়ে এসেছেন নররূপে বৈকুণ্ঠের পতি, 
রাধাভাবসুবলিততনু রাধাপ্রেম আস্বাদন লীলা ছলে 
জয়দেব-চণ্ডীদাস-রচিত বিলাস কুঞ্জে, পুত বঙ্গদেশে। 
সায়াহ্ন ডুবেছে রাত্রে, নামেনি আঁধার ; পরিবর্তে তার 
দ্যুলোক ভূলোক ধোওয়া জ্যোৎস্নার জোয়ার, 
শীতল সুস্নিগ্ধ আলো তমোনাশী পূর্ণমাসী তিথি, 
বসন্তের মলয় সমীর, অগুরু চন্দন মাখা আবির গুলাল, 
শ্রীখোলে শ্রীকরতালে হরিনাম সংকীর্তন, প্রেমানন্দ 
 ধ্বনি। নদীয়া দুলাল নাচে, নাচে তার সঙ্গী পরিকর -- 
নিত্যানন্দ গদাধর শ্রীবাস যবন হরি স্বরূপ দামোদর। 

প্রেমের মূরতি ধরাতলে, বিশ্বজনে প্রেম বিতরণ, 
মহানাম সংকীর্তনে প্রেমময় জীবের জীবন। 
অকস্মাৎ শুনি নদীপারে পল্লীপথে কীর্ত্তনের সুর -- 
ভেসে আসে দূর-বন-গন্ধ-বহ বাসন্তী বাতাসে। 
মনে হোল শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু নিত্য আছে জেগে 
যুগ হতে যুগান্তরে --- যমুনা পুলিনে, ভাগীরথী তটে, 
আমাদের অজয়ের ঘাটে আর ভক্তহৃদি ঘটে। 

"লোচন বলে ভাবিস কেন থাক আপন ঘর। 
হিয়ার মাঝে গোরা নাগর আটক ক'রে ধর।।" 

দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
দোল পূর্ণিমা ১৪৩০ 
কলকাতা। 





















২টি মন্তব্য:

Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...