সোমবার, ৬ মার্চ, ২০১৭

২১ সে ফেব্রুয়ারি

মায়ের কোল, মায়ের আঁচল, মায়ের ভালোবাসা 
মায়ের বুকের অমৃত পান, মায়ের মুখের ভাষা, 
মায়ের হাতের আদর সোহাগ, মায়ের স্নেহের ডাক 
আর যা কিছু সব নিয়ে নাও এইটুকু ধন থাক্। 
                       ‌‌ ‌          --দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় 



" ওরা চল্লিশ জন কিংবা আরও বেশি 
যারা প্রাণ দিয়েছে ওখানে, 
রমনার রোদ্রদগ্ধ কৃষ্ণচূড়া গাছের তলায়।" 
                       –মাহবুব -উল - আলম চৌধূরী। 

আজ ২১শে ফেব্রুয়ারী। আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস। ২১শে ফেব্রুয়ারী ‌দিনটির ইতিহাস, ঐতিহাসিক তাৎপর্য্য, মরণ-বরণ-করা‌ শহীদদের– রফিক, জব্বর, বরকত, সফিকুল ভাইদের– আত্মবলিদানের অমর কাহিনী লেখা হয় কাগজের পাতায় পাতায়, পঠিত হয় শত-সহস্র স্মরণ মঞ্চে এবং তাইই তো কাঙ্ক্ষিত, প্রত্যাশিত তাঁদের কাছে যাঁরা এই পরম সাধনার সম্পদটির উত্তরাধিকারী । সঙ্গে সঙ্গে আত্মসমীক্ষারও আজ প্রয়োজন‌, সত্যই কী আমরা ‌ আবেগের শোণিতাঞ্জলী-বিধৌত‌ এই  মহান উত্তরাধিকার বহন করার যোগ্যতা দেখাতে পেরেছি ?

মাতৃভাষার স্বীকৃতি, সম্মান এবং অধিকারের জন্য একটি জাতি বুকের রক্ত ঢেলেছিল এই দিন। 'আ মরি বাংলা ভাষা !' "বাংলা ভাষা, আমি, আমরা আজ তোমার জন্য মরণ বরণ করব - তবু তোমায় ছাড়বো না মা !" 


মানুষের সভ্যতার ইতিহাস রক্ত বমন, রক্ত -প্রস্রবণ আর রক্ত প্লাবনের ইতিহাস। এক কথায় যুদ্ধের গৌরব-গাথার আবরণে ঢাকা আত্মহননের ইতিবৃত্তান্ত। ধর্মপ্রচার, দেশদখল সম্পদ লুন্ঠন, ক্রীতদাস সৃষ্টি এবং ক্রীতদাস আহরণ - এই সকল উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার বাসনাতেই যুদ্ধ।  আর সেই যুদ্ধে লিপ্ত জাতি-গোষ্ঠী-সম্প্রদায়-য়ের  বাইরে অসংখ্য নর-নারী-শিশুর রক্তাক্ত দেহ স্তুপাকার হয়ে পঁচে গেছে, গলে গেছে, যারা বেঁচেছে তারা মরেছে মহামারীতে। সে মরণ আরও নারকীয়। তবু যুদ্ধ-ক্ষেত্র ধর্মক্ষেত্রঃ
"ধর্মক্ষেত্রে কুরুক্ষেত্রে সমবেতা যুযুৎসুব:।"
এর চেয়ে নির্লজ্জ্ আত্ম-প্রবঞ্চনা আর কি হতে পারে ?

কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রও যে ধর্মক্ষেত্র হয় - প্রাণের ধর্মক্ষেত্র,  জীবনের ধর্মক্ষেত্র তা দেখিয়ে দিয়েছিল এই বাংলাদেশ - এই বঙ্গবাসী ১৯৫২ সালের ২১শেফেব্রুয়ারী, ৮ই ফাল্গুন ১৩৫৮ বঙ্গাব্দ। 

চোখের সামনে মায়ের নিগ্রহ, মায়ের লাঞ্ছনা ? তার বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করে, বুকের রক্ত ঢেলে শত্রুর এগিয়ে আসার পথ পিচ্ছিল করে তুলব - এই সংকল্প - সাধনে যে যুদ্ধ, যে আত্মবলিদান তার ইতিহাস রচনা করেছে বাংলাদেশ। প্রকৃত বাঙালি সত্তার অধিকারী বাংলাদেশের মহান মানব গোষ্ঠী - তাঁদের আনত প্রণাম। প্রণাম জানাই আসামের, ঝাড়খণ্ডের বাঙলা ভাষা সংরক্ষণের জন্য মরণপণ যোদ্ধাদের চরণপ্রান্তে।

মাতৃবক্ষ -সুধা পান করার সঙ্গে সঙ্গে মাতৃ-হৃদয়-নিঃসৃত কোমল ভাব-রস আমাদের অন্তরে প্রবেশ করে।  আমাদের স্নায়ুতন্ত্রে সঞ্চারিত হয়, আমাদের হৃদয় , আমাদের চেতনা নিসিক্ত হয়।  মাতৃ-চিত্তের স্নেহ,  বাৎসল্য, প্রেম, প্রীতি আমাদের জৈবিক পশুত্বকে নাশ করে, জীবনাচরণের মধ্যে নিয়ে আসে মনুষত্বের ধর্ম - মানবধর্ম।

সর্বশক্তিমান কে ? কোথায় থাকেন তিনি ? কেউ কি জানে ?

কিন্তু সর্বশক্তিপ্রদায়িনী মা, তিনি রয়েছেন আমার জীবনের সৃষ্টি থেকে বিলয় পর্যন্ত অচ্ছেদ্য, অবিচ্ছেদ্য, অবিচ্ছিন্ন –শরীরে এবং সংস্কারে।  সেই মায়ের দেওয়া ভাষা যার প্রথম সুর, প্রথম স্বর, প্রথম ছন্দের দোলায় আমার সৃষ্টি, যার উষ্ণতায় আমার চেতনার জাগরণ, যে  ভাষার বাণী-বন্যায় আমার অস্তিত্বের প্রবাহ, তাকে ত্যাগ করি কোন মূল্যে ? বরং বরণ করি, ধারণ‌ করি , লালন করি প্রাণের বিনিময়ে !

আজ ২১সে ফেব্রুয়ারীর ঐতিহাসিক শুভলগ্নে মাকে স্মরণ করবার, প্রণাম করবার পবিত্র মুহূর্তে বাংলা ভাষার জয়গান গেয়ে যাই।

আজ বাংলা ভাষার নুতন আশার দিন। এ আশা ব্যাপ্ত হওয়ার, বিস্তৃত হওয়ার "দুর্মর আশা "। কালের বিধান হয়তো এমনই ছিল যে, "আমরা দেখব এবার জগৎটাকে" - বলে বেরিয়ে পড়েছি।  এই পৃথিবীর কোণায় কোণায় আজ বাঙালি ঘর গড়েছে, ঘর বেঁধেছে। কত ভাব, কত ভাষা, কতনা সংস্কার সংস্কৃতির সঙ্গে তার পরিচয় ঘটেছে।

কিন্তু তবুও, এই ধরিত্রী-ধাত্রীর বিপুল অঞ্চল তলে যখন যেখানেই থাকি, দিনের শেষে, সমস্ত কর্ম কোলাহলের অন্তোধ্যায়ে যখন আত্মমগ্ন হই তখন সেই তন্দ্রালসা সন্ধ্যায় জন্ম -জন্মান্তরের চিরসান্ত্বনার ডাক আসে ••••, "আয় বাবা, ঘরে আয়।"
_______________________________________

মায়ের ডাক 

      দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় 


"আয় বাবা, ঘরে আয়, 
এই তো রয়েছি বসে আঙিনায়। 
চাঁদের চন্দনে লেপা, শীতল পাটিতে ঢাকা, 
খড়িমাটি আলপনা আঁকা এই ঘরে। 
থেকে যা না দুটো দিন, কয়ে যা না কথা - 
শরমের, মরমের - বল্ প্রাণ ভরে।" 

"-- আমি আসছি, আমি আস্যা পড়সি মা।" 

সবার মা তো আমারো মা 
যখন সেথায় আছি ; 

কিন্তু যখন আসি আমার 
মায়ের কাছাকাছি - 

তখন 'মা' 'আম্মা' শব্দগুলান 
ছটফটিয়ে আসে। 
খাঁচার ভিতর পাখী যেমন 
বাঁচে বনের বাসে। 

তিস্তা গঙ্গা পদ্মাপাড়ের 
লক্ষ হাজার মা - 
ডাকতে থাকে "আয়, বাবা, আয় 
মুড়ি খাইয়া যা। 

শালিধানের চিড়া দিমু 
বিন্নিধানের খই, 
মিঠা নারকেল, গুড়ের নাড়ু, 
ঘন দুধের দই। 

হাঁকায়ে কই, "যাইতাসি মা 
কন্ঠ ভরা স্বরে - 
বন্ধুরা সব সঙ্গে আছে 
রাইখ্যো থালা ভরে। 

রবিবাবু, দুখু মিঞা, 
জসীম ভাইরে কই - 
ঘরে আমার মস্ত উঠান 
মায়াতে থৈ থৈ। 

মা, ঠাম্মা, বোনের মায়া, 
মায়া বৌয়ের কথায়। 
সারা পথের ক্লান্তি আমার 
এক পলকে ভুলায়।" 



দুলাল চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় 
২১শএ ফেব্রুয়ারী, ২০২৫ 
ব্যাঙ্গালোর/শিলিগুড়ি। 

(কবিতাটি পরিমার্জিতরূপে পুনঃপ্রকাশিত)।
______________________________________

৩টি মন্তব্য:

  1. ২১শে ফেব্রুয়ারী বাংলা ভাষার জন্য শহীদের আত্মদান বের্থ হয় _নি বাংদেশের জন্ম হয়েছে ওপারে যে ভাষা কথা বলে এপারে তামরা গান কবিতা ও কথা বলি | আপনার রচনা অতি সুন্দর তাই আপনাকে ধন্যবাদ

    উত্তরমুছুন

Recently published

অমূল্য

He ( Tagore) who sees all things in his own self and his own self in all things, he does not remain unrevealed.                     ...